মার্চ ১০, ২০২০ ১১:৫৮ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ১০২ থেকে ১০৫ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ১০২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ (102)

“অতঃপর যখন (ইসমাইল) পিতার সাথে (তার কাজে সাহায্য) করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বলল: পুত্র আমার! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি (ভেবে) দেখ।  সে বলল: পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন।” (৩৭:১০২)

গত আসরে আমরা বলেছি, হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। এরপর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: মহান আল্লাহ তাঁকে যে সন্তান দান করেন সে যখন কিশোর বয়সে উপনীত হয় তখন আল্লাহ তায়ালা হযরত ইব্রাহিমকে স্বপ্নে সেই সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানি করার আদেশ দেন। আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) এ আদেশ বাস্তবায়নের আগে সন্তানের অভিমত জেনে নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন। এ কারণে তিনি পুত্র ইসমাইলকে প্রশ্ন করেন: মহান আল্লাহ আমাকে এরকম একটি আদেশ করেছেন। এখন তুমি কি এই কঠিন কাজটি করার জন্য প্রস্তুত রয়েছ? পিতার হাতে পুত্রকে জবাই করার এই ঐশী আদেশের ব্যাপারে তোমার অভিমত কি?

যেকোনো সাধারণ মানুষ আল্লাহ তায়ালার এই আদেশ শোনার পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন করত। যেমন, হে আল্লাহ! তুমি এ কি জিনিস আমার কাছে চাইলে? তোমার যদি মনে এই ছিল তাহলে আমাকে এমন সন্তান না দিলেই তো পারতে! আর যদি আমার সন্তানকে তোমার রাস্তায় কুরবানি দিতেই হয় তাহলে আমার নিজের হাতে কেন? অন্য কাউকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নাও। নবী না হয়ে অন্য কেউ হলে স্থান-কাল-পাত্রভেদে সবাই এই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করত। কিন্তু নবী-রাসূলগণ আল্লাহর আদেশ-নিষেধের কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনকারী হয়ে থাকেন। তারা মনে করেন, মহাজ্ঞানী ও মহাপ্রজ্ঞাবান আল্লাহ তায়ালা যে নির্দেশই দেন না কেন তা তাঁর অসীম জ্ঞান থেকে উৎসারিত। কাজেই নিজের সীমিত জ্ঞান দিয়ে এই নির্দেশের রহস্য অনুধাবন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ অবস্থায় মহান আল্লাহর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা আমার দায়িত্ব।

কিশোর ইসমাইলও আল্লাহ তায়ালার একজন নবী। তিনি পিতার প্রশ্নের জবাবে নবীসুলভ উত্তরই প্রদান করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা যে আদেশ করেছেন তা আপনি বিনা বাক্যব্যয়ে পালন করুন। আল্লাহর আদেশের সামনে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা এবং মানবীয় দুর্বলতা মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন। এ কাজ আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালার আদেশ শিরোধার্য মেনে তা পালন করতে গিয়ে যত কষ্টই হোক আমি তাতে ধৈর্যধারণ করব।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. নবীদের স্বপ্ন তাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার ওহীর সমতুল্য। তারা ঐশী নির্দেশ মনে করে তা বাস্তবায়ন করেন।  কিন্তু অন্য কারো স্বপ্নের ক্ষেত্রে এমন নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কাজেই সাধারণ মানুষ স্বপ্নে কোনো কিছু দেখে নিজের বা অন্যের জন্য কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারবে না।

২. সন্তানের প্রতি ভালোবাসার টানে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশের উল্টো আচরণ করা যাবে না।

৩. আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন অনেক সময় কঠিন এবং তা করতে হলে সবর বা ধৈর্য ধরতে হয়। কঠিন হওয়ার কারণে আল্লাহর আদেশ বা নিষেধ পালন করা থেকে বিরত থাকা যাবে না।

সূরা সাফফাতের ১০৩ থেকে ১০৫ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেছেন:

 فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ (103) وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ (104) قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (105)

“যখন পিতা-পুত্র উভয়েই (আল্লাহর আদেশের সামনে) আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম (যবেহ করার জন্য) সন্তানের কপাল মাটিতে চেপে ধরল।” (৩৭:১০৩)

“তখন আমি তাকে ডেকে বললাম: হে ইব্রাহীম!” (১০৪)

“সত্যিই তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।” (৩৭:১০৫)

ইসমাইল কুরবানি হওয়ার জন্য নিজের প্রস্তুতি ঘোষণা করেন যা ছিল আল্লাহর আদেশের সামনে পিতা ও পুত্রের পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনের উদাহরণ। এ অবস্থায় হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ পুত্র ইসমাইলকে মাটিতে শুইয়ে দেন এবং ছুরি হাতে নিয়ে তাকে জবাই করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।  এমন সময় আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে গায়েবি আওয়াজ আসে যে, হে ইব্রাহিম! তুমি তোমার সন্তানকে জবাই করবে আমি তা চাইনি বরং আমি চেয়েছিলাম তুমি সন্তানের প্রতি নিজের ভালোবাসাকে জবাই করে দেবে। এই কঠিন পরীক্ষায় তুমি সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছ। তোমাকে স্বপ্নে যে আদেশ করা হয়েছে বিনা বাক্যব্যয়ে তা পালন করেছ এবং প্রমাণ করেছ, আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে তোমার কোনো দ্বিধা নেই এবং তা পালনের সকল আয়োজনও সম্পন্ন করেছ।

হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ সন্তান ইসমাইলকে জবাই করতে পারেননি ঠিকই কিন্তু তিনি এ কাজ করার জন্য মনেপ্রাণে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তা করতে উদ্যতও হয়েছিলেন। আল্লাহর আদেশ পালনের ক্ষেত্রে তাঁর মনের এই নিয়ত বা একনিষ্ঠতাই আল্লাহ চেয়েছিলেন এবং সেটি প্রদর্শন করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে থামতে বলা হয়। মহান আল্লাহ হযরত ইব্রাহিমকে জানিয়ে দেন, তিনি পরীক্ষায় সফল হয়েছেন; কাজেই ছেলের মাথা কাটার আর প্রয়োজন নেই।

ইসলামে কোনো কিছু করার আগে তার নিয়ত বা ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ঈমানদার মুসলমানের জন্য সৎকর্মকে তার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নবী-রাসূলদের কামালিয়াত বা পরিপূর্ণতার অন্যতম নিদর্শন ছিল আল্লাহর আদেশের প্রতি আত্মসমর্পন। আল্লাহর কাছে সেই আমল পছন্দনীয় যা পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনের মাধ্যমে সন্তুষ্টচিত্তে করা হয়।

২. আত্মিক দিক দিয়ে পরিপূর্ণতা অর্জনের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। কখনো কখনো ইসমাইলের মতো একজন কিশোর পরিপূর্ণতায় পৌঁছে গিয়ে পিতা ইব্রাহিমের মতো একজন নবীর সমান আনুগত্য প্রদর্শন করে দেখাতে পারেন।#