ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (১৪পর্ব): শহীদ মোস্তফা চামরানের বাহিনী গঠন
আজকের আসরে আমরা শহীদ মোস্তফা চামরানের পক্ষ থেকে অনিয়মিত যুদ্ধবাহিনী গঠন এবং ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় খুজিস্তান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহরে আহওয়াজে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ শুরু সম্পর্কে আলোচনা করব।
আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের প্রথম বছর ছিল ইরানের জন্য সবচেয়ে কঠিন। ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান যখন তিলে তিলে একটি নয়া ইসলামি শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলছিল তখন একদিকে দেশের অভ্যন্তরে বিপ্লবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তির শত্রুতা তেহরানের জন্য চরম প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই দুই অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকায় ইরাকের আগ্রাসন প্রতিহত করার মতো প্রস্তুতি তেহরানের ছিল না। যদি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর পাশাপাশি গণ মানুষের প্রতিরোধ গড়ে না উঠত তাহলে ইরাকি বাহিনী অনেক দ্রুত ইরানের আরো বহু এলাকা দখল করে ফেলত।
এ সময় শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে অনিয়মিত যুদ্ধকৌশলের আশ্রয় নেয় ইরান। অতিমাত্রায় সুসজ্জিত সাদ্দাম বাহিনীর বিপরীতে ইরানের সেনাবাহিনীতে সংহতির অভাব এদেশের একমাত্র দুর্বলতা ছিল না। ইরাকের সঙ্গে এক হাজার ৪৫৮ কিলোমিটার অভিন্ন সীমান্তে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ মোকাবিলার উপায় নিয়ে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে মতপার্থক্য ছিল আরেকটি বড় দুর্বলতা। এই দুই দুর্বলতার কারণে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সমরপ্রস্তুতির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। দেশের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বে এই মতপার্থক্য সৃষ্টির পেছনে ইরানের প্রথম প্রেসিডেন্ট বনি সদর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইসলামি বিপ্লবের বিরুদ্ধে গিয়ে মার্কিন ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়েন। এরকম পরিস্থিতিতে নিজ উদ্যোগে কিছু বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব গণবাহিনী গঠনে এগিয়ে আসেন। এরকম একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন ড. মোস্তফা চামরান। তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে আহওয়াজ শহর রক্ষা করতে গিয়ে অনিয়মিত যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করেন।

বিপ্লবী যোদ্ধার চেয়ে মোস্তফা চামরানের বড় পরিচয় ছিল- তিনি ছিলেন একজন ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। স্কুল জীবন থেকে তিনি কোনো ক্লাসে দ্বিতীয় হননি এবং ইসলামি বিপ্লবের আগেই এই মেধা তাকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পড়াশুনা করতে আমেরিকা পর্যন্ত নিয়ে যায়। ১৯৫০ এর দশকের শেষের দিকে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং টেক্সাস এএন্ডএম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ১৯৬৩ সালে বার্কলের স্বনামধন্য ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্লাজমা ফিজিক্সে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। প্লাজমা ফিজিক্স তৎকালীন সময়ে পাশ্চাত্যের সর্বাধুনিক গবেষণার বিষয় হিসেবে পরিগণিত হতো।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এরকম বিস্ময়কর সাফল্য অর্জনের একই সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের সঙ্গেও মোস্তফা চামরানের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। কিশোর বয়স থেকেই তেহরানের ‘হেদায়েত’ মসজিদে মরহুম আয়াতুল্লাহ তালেকানির তাফসিরে কোরআনের ক্লাসে অংশ নিতেন। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টুডেন্টস আঞ্জুমানে ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে গিয়েও তার রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ হয়নি। তিনি সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন ইরানি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, ইরানি স্টুডেন্টস ইসলামি অ্যাসোসিয়েশন এবং মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র সংগঠন। ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি নাসার বেল ল্যাবরেটরিজে জেট প্রোপালশন গবেষণা কর্মী হিসেবে নিয়োগ পান। এ সময় আমেরিকার বহু বিশ্ববিদ্যালয় তাকে নিয়োগের সময়ই ফুল প্রফেসর হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি সেসব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে নাসার গবেষণা কাজে নিয়োজিত থাকাকেই প্রাধান্য দেন।
গবেষণার পাশাপাশি ইরানের স্বৈরাচারী শাহ সরকার বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন ড. চামরান। আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য উন্নত জীবন ও ঈর্ষণীয় গবেষণা ফেলে রেখে তিনি ১৯৬৩ সালে আমেরিকা ছেড়ে মিশরে চলে আসেন। মিশরে তখন আরব জাতীয়তাবাদী নেতা জামাল আব্দুন নাসের ক্ষমতায়। ড. মোস্তফা চামরান সে সময় মিশরে টানা দুই বছর গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি লেবাননের শিয়া মুসলমান ও ইমাম মুসা সাদরকে সহযোগিতা করতে লেবাননে যান। সেখানেও তিনি ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রথমে ‘বঞ্চিতদের আন্দোলন’ এবং পরে ‘আমাল আন্দোলন’ নামের প্রতিরোধ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
ড. চামরানের জীবনের তৃতীয় অধ্যায় শুরু হয় ইরানের ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর। ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের ১০ দিন পর টানা ২১ বছরের প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে ইরানে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরে তিনি ইসলামি বিপ্লবের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন এবং এতদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগাতে শুরু করেন। শহীদ চামরান ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র প্রথম দলগুলোকে প্রশিক্ষণ ও সুসজ্জিত বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি কুর্দিস্তানের বিদ্রোহ দমনে বিশেষ করে ‘পাভে’ শহর প্রতিরোধের যুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন।
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশের একটি শহর হচ্ছে ‘পাভে’। ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর এই শহর বিপ্লব বিরোধীদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়। এক পর্যায়ে ওই শহরে বিপ্লবী সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিপ্লব বিরোধীদের তুমুল লড়াই হয়। কুর্দি বিদ্রোহীরা পাভে শহর অবরোধ করে ফেলে এবং শহরের মধ্যে ঢুকে পড়তে উদ্যত হয়। এ সময় ইমাম খোমেনী (রহ.) ওই শহরের ওপর কুর্দিদের অবরোধ ভেঙে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকদের উদ্ধার করার দায়িত্ব দেন ড. মোস্তফা চামরানকে। তিনি সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন এবং পাভে শহরের ওপর আরোপিত অবরোধ ভেঙে অবরুদ্ধ মানুষদের মুক্ত করতে সক্ষম হন।
পাভে’র বিদ্রোহ দমনের পর ইমাম খোমেনী (রহ.) মোস্তফা চামরানকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। এই দায়িত্ব পালনেও উল্লেখযোগ্য সাফল্যের পরিচয় দেন ড. চামরান। তিনি সশস্ত্র বাহিনীতে কিছু মৌলিক পরিবর্তন এনে এই বাহিনীকে সুসংগঠিত করেন। ড. চামরান কখনো টাকা-পয়সা, ক্ষমতা বা জনপ্রিয়তা লাভের চেষ্টা করেননি। এ কারণেই তিনি যে কাজে হাত দিয়েছেন তাতেই সফল হয়েছেন। পাভের ঘটনার পর ইরাকি বাহিনী ইরানে আগ্রাসন চালালে ড. চামরান ইরানের গণবাহিনীকে আগ্রাসী সেনাদের বিরুদ্ধে অনিয়মিত যুদ্ধে দক্ষ করে গড়ে তোলেন। ফলে তার নেতৃত্বে আহওয়াজ শহরে ইরাকি বাহিনীকে কার্যকরভাবে রুখে দেয়া সম্ভব হয়। কোনো কোনো ফ্রন্টে তার নেতৃত্বাধীন ইরানি যোদ্ধারা ইরাকি বাহিনীকে পিছু হটতেও বাধ্য করেন। এই যুদ্ধে আরেকজন বিশিষ্ট যোদ্ধা মোস্তফা চামরানকে সহযোগিতা করেন এবং তিনি হলেন আজকের ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী। #
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ১৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।