কুরআনের আলো
সূরা আস-সাফফাত: আয়াত ১৩৩-১৩৮ (পর্ব-১৬)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ১৩৩ থেকে ১৩৮ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ১৩৩ থেকে ১৩৬ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَإِنَّ لُوطًا لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ (133) إِذْ نَجَّيْنَاهُ وَأَهْلَهُ أَجْمَعِينَ (134) إِلَّا عَجُوزًا فِي الْغَابِرِينَ (135) ثُمَّ دَمَّرْنَا الْآَخَرِينَ (136)
“এবং নিশ্চয় লুত ছিলেন আমার রাসূলগণের একজন।” (৩৭:১৩৩)
“যখন আমি তাকে ও তার পরিবারের সবাইকে উদ্ধার করেছিলাম।” (৩৭:১৩৪)
“কিন্তু এক বৃদ্ধাকে ছাড়া; সে অন্যদের সঙ্গে (শহরে) থেকে গিয়েছিল।” (৩৭:১৩৫)
“অতঃপর অবশিষ্টদেরকে আমি সমূলে উৎপাটিত করেছিলাম।” (৩৭:১৩৬)
আগের আসরগুলোতে কয়েকজন নবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা করা পর এই চার আয়াতে হযরত লুত (আ.) ও তার জাতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। হিজাজ অঞ্চলের উত্তরে এবং মক্কা থেকে শাম বা বর্তমান সিরিয়া যাওয়ার পথে লুত জাতি বসবাস করত। প্রতিদিন বিভিন্ন অঞ্চলের বাণিজ্যিক কাফেলা এই জাতির বসবাসস্থলের পাশ দিয়ে যাতায়াত করত। হযরত লুত (আ.) হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র সমসাময়িক যুগে নিজ জাতিকে হেদায়েতের দায়িত্ব পেয়েছিলেন এবং তিনি হযরত ইব্রাহিমের শরিয়ত প্রচার করেছেন।
এই চার আয়াতে লুত জাতির পরিণতির অংশটুকু বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, আল্লাহর আজাব নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর যারা হযরত লুতের প্রতি ঈমান এনে তাঁর পরিবারভুক্ত হয়েছিল তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা আজাবের খবর আগেভাগে জানিয়ে দেন। তারা আল্লাহর নির্দেশে শহর ত্যাগ করেন এবং প্রাণে রক্ষা পান। কিন্তু চরম পাপাচারে লিপ্ত বাকি অধিবাসীরা আসন্ন ভয়াবহ আজাব সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। তারা তাদের ঘরবাড়িতে অবস্থানরত অবস্থায় আল্লাহর আজাব দেখতে পায়। আসমান ও জমিন থেকে আজাব আসতে থাকে এবং তাদের ঘরবাড়ি তাদের মাথার ওপর ভেঙে পড়ে এবং সবাই ধ্বংস হয়ে যায়।
এখানে যে বৃদ্ধার কথা বলা হচ্ছে সে ছিল হযরত লুত (আ.)’র স্ত্রী। সে পাপাচারে লিপ্ত জাতিকে সন্তুষ্টচিত্তে সহযোগিতা করার কারণে আজাবের মুখে পতিত হয়। আল্লাহর নবীর সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন তাকে আজাব থেকে রক্ষা করতে পারেনি। কারণ, আল্লাহর রহমত লাভ বা আজাব ভোগ করার শর্ত হচ্ছে ঈমান ও নেক আমল। এই শর্ত মেনে না চললে নবী-রাসূলদের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধনও কোনো কাজে আসবে না।
এই চার আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- পবিত্র কুরআনে অতীত জাতিগুলোর পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে এজন্য যে, শেষ নবীর উম্মত যেন এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
২- নবী-রাসূলদের স্ত্রী বা সন্তান হলেই যে কেউ আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে এমন নয়। আল্লাহর রহমত লাভের জন্য তাদেরকেও ঈমানদার ও সৎকর্মশীল হতে হবে।
৩- নবীদের অনুসারী ঈমানদার ব্যক্তিরা অন্য কোনো জাতির মানুষ হলেও তারা নবীদের পরিবারভুক্ত হিসেবে বিবেচিত হন। অন্যদিকে, নবীদের স্ত্রী ও সন্তানরা যদি তাদের প্রতি ঈমান না আনেন তাহলে তারা নবীদের পরিবারের সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন না।
সূরা সাফফাতের ১৩৭ ও ১৩৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
وَإِنَّكُمْ لَتَمُرُّونَ عَلَيْهِمْ مُصْبِحِينَ (137) وَبِاللَّيْلِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ (138)
“তোমরা ভোর বেলায় তাদের ধ্বংস স্তুপের পাশ দিয়ে গমন কর।” (৩৭:১৩৭)
“এবং সন্ধ্যায়ও, তারপরেও কি তোমরা চিন্তা করো না?” (৩৭:১৩৮)
আগের আয়াতের আলোচনায় আমরা বলেছি, মক্কা থেকে সিরিয়া যাওয়ার পথে ছিল লুত জাতির বসবাস। এই জাতি আল্লাহর আজাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর ওই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষেরা লুত জাতির মানুষের কঠিন পরিণতি দেখতে পেত। বিশেষ করে মক্কার কাফেররা সিরিয়ায় ব্যবসা করতে যাওয়ার পথে লুত জাতির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেত। লুত জাতির বেশিরভাগ মানুষ সমকামিতায় লিপ্ত হয়েছিল। অল্প কিছু মানুষ যারা এই পাপাচারে লিপ্ত হয়নি তারা এই অন্যায়ের বিরোধিতা না করে নীরবতা অবলম্বন করেছিল। ফলে এই উভয় রকমের মানুষ আল্লাহর নির্দেশে ধ্বংস হয়ে যায়।
হযরত লুত (আ.) এই মহা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তাদেরকে পুরুষ ও নারীদের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু পাপাচারে অন্ধ জাতি এই উপদেশবাণীতে কান না দিয়ে আল্লাহর নবীকে পর্যন্ত হুমকি দেয়। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, হযরত লুত (আ.) এই ঘটনার কয়েক হাজার বছর পর আজও উন্নতি ও সভ্যতার শিখরে থাকা দেশ ও জাতিগুলো সেই জঘন্য পাপাচারে লিপ্ত রয়েছে। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এই প্রকৃতি বিরোধী অনাচার তারা গোপনে বা লুকিয়ে করছে না বরং ঢাক-ঢোল পিটিয়ে এই অপকর্মকে তারা আইনি বৈধতা দিয়েছে। উন্নত বিশ্বের দাবিদার দেশগুলোতে একের পর এক গণভোটে সমকামিতা বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ এসব দেশের বেশিরভাগ মানুষ জেনেবুঝে এই জঘন্য পাপাচারকে বৈধ কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং এটাকে মানবাধিকার বলে মনে করছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, সেই কাজকেই প্রকৃত মানবাধিকার বলা যায় যেটা প্রাকৃতিক গঠন অনুযায়ী মানুষের শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেহতত্ত্ব অনুযায়ী, নারী ও পুরুষের যৌন অঙ্গগুলোকে বিপরীত লিঙ্গের মানুষের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই সমলিঙ্গের যৌন অঙ্গ পরস্পরের ব্যবহার উপযোগী করা হয়নি। কাজেই সেটি করা হলে তা হবে প্রকৃতি বিরোধী কাজ এবং তা কখনো মানবাধিকারের সংজ্ঞার মধ্যে ফেলা সম্ভব নয়।
কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, অনেকে সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। তাহলে প্রকৃতি অনুযায়ী চলতে গিয়ে গিয়ে তাদেরকে এই চাহিদা থেকে বঞ্চিত রাখতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কথা জানার পরও বহু মানুষের ধুমপান করতে ইচ্ছা হয় এবং করে। তাহলে তাদের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে কি আমরা ধুমপানকে বৈধতা দেব? তাহলে দেখা যাচ্ছে, কিছু মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে আইন প্রণিত হয় না বরং সমাজে প্রকৃতি বিরোধী ও অন্যায় আচরণ প্রতিহত করাই হচ্ছে আইন প্রণয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য।
উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে কিছু কুরুচিসম্পন্ন মানুষ পশুদের সঙ্গে উপগত হতে চায়। এখন কি আইন করে তাদের এই চাহিদাকে বৈধতা দিতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে পাশ্চাত্যের কথিত সভ্যতার ধ্বজাধারীরাও এখন পর্যন্ত নেতিবাচক জবাব দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে তাদের অভিমত কি হবে তা এখন বলা সম্ভব নয়।
যাই হোক, দেখা যাচ্ছে, মানব জাতি বর্তমানে খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, যানবাহন ও বিনোদন উপকরণের দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অগ্রগতি অর্জন করা সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে মানবীয় আচরণের দিক দিয়ে তেমন কোনো উন্নতি করতে পারেনি বরং অনেক ক্ষেত্রে অধোপতিত হয়েছে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:
১- পৃথিবীর বুকে ভ্রমণ করে আজও অতীত জাতিগুলোর পরিণতি থেকে মানুষ শিক্ষা নিতে পারে।
২- শিক্ষা গ্রহণের মতো উপকরণ আমাদের আশপাশেই ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ মানুষ তা দেখেও না দেখার ভান করি এবং শিক্ষা গ্রহণ থেকে বিরত থাকি। #