'করোনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি অত্যন্ত ঝুঁকিতে, কাটিয়ে ওঠা কঠিন'
করোনা পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা খুবই কঠিন হবে। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ।
তিনি বলেন, সরকার যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে তা দিয়ে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয় না। আমাদেরকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বড় রকমের ধাক্কা সামলাতে হবে। বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, করোনার ফলে সৃষ্ট বিপদ বা বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সবশ্রেণি পেশার বিশিষ্ট জনদের সাথে মতবিনিময় করা উচিত।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবুদর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সংখ্যা ৩১ হাজার যখন ছাড়িয়ে গেছে। সরকার বেশ কয়েকদিন আগে শপিংমল, গার্মেন্টসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই খুলে দিয়েছে। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথা হচ্ছে। আপনি কীভাবে দেখছেন বিষয়টিকে?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, শপিংমল,গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার ব্যাপারে পক্ষে বিপক্ষে তো কথা আছেই। ব্যক্তিগতভাবে আমি মিডিয়াতে বলেছি, বিষয়টি নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা দোকানের মালিকদের সাথে এবং সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তাদের সাথে ভালোভাবে আলাপ-আলোচনা করে এবং আরও ভাবনা চিন্তা করে এই খোলাটা উচিত ছিল। এমনিতেই বাংলাদেশে লকডাউন সেভাবে পালিত হচ্ছে না। রাস্তাঘাটে গাড়ি চলছে, মানুষ চলাফেরা করছে। তারপরও লকডাউনে একটু বাধা ছিল কিন্তু এখন খুলে দেয়ার ফলে এতবেশি জনবহুল দেশের মানুষের স্রোতকে ঠেকানো সরকারের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হবে।
করোনাভাইরাস যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি ছড়িয়ে পড়বে তখন সেটাকে সামাল দেয়া আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের পক্ষে একেবারেই সম্ভব না। কাজেই আমার মনে হয় আরও চিন্তা ভাবনা করে বিষয়টি করা উচিত ছিল। যেটি করা হয়েছে সেটি খুব ভালো হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।
রেডিও তেহরান: জ্বি, আপনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রসঙ্গটি আনলেন। তো করোনা পরিস্থিতিতে চিকিৎসা নিয়ে নানা অভিযোগের কথা মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকরাও আক্রান্ত হচ্ছেন করোনায়। রোগি ভর্তি নিয়ে সংকটের কথাও শোনা যাচ্ছে। তো এ সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পক্ষে এখানে সাধারণ যেসব অসুখ-বিসুখ যেমন ধরুন-প্রতিবছর ডেঙ্গুসহ আরও কিছু মৌসুমী রোগ হয় –সেসব রোগীদের সামাল দিতেই আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলোকে হিমশিম খেতে হয়। এছাড়া আমাদের স্বাস্থ্যসেবা যথেস্ট উন্নত নয় একথা আমরা সবাই জানি। এ ব্যাপারে বোধহয় কারও দ্বিমত নেই। আর তারমধ্যে করোনাভাইরাসের মত মহামারির সময় আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এ ভাইরাসটিকে সামাল দিতে পারবেন কী? তারপর আমাদের ডাক্তাররা যারা সেবা কাজের সাথে জড়িত তাদের সুরক্ষার জন্য পিপিইসহ আর যেসব জিনিষপত্র প্রয়োজন তা নিয়ে সংকটের কথা শোনা যায়। ডাক্তাররাও তো মানুষ। করোনার শুরুর দিকে আমিও লিখেছিলাম- প্রথমে ডাক্তারদের নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করা যায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। শুধু ডাক্তার নয় আমি পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কথা বলেছি। যারা রাস্তাঘাটে এবং হাসপাতালে কাজ করছেন তাদের বিষয়ে যথাযথ দৃষ্টি না দেয়ায় এখন অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে বহুসংখ্যক ডাক্তার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারাও গেছেন। আর ডাক্তাররা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ফলে সুস্থ ডাক্তারদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ অবস্থায় তাদের কাছ থেকে নিবেদিত সেবা পাওয়া যাবে সে ভরসাও খুব কম। এর ভেতরেও চিকিৎসকরা কাজ করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে তাদের সঙ্গতি কম। করোনা পরীক্ষার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলেছে, টেস্ট টেস্ট অ্যান্ড টেস্ট। যতবেশি টেস্ট করা যাবে এবং যতবেশি শনাক্ত হবে ততই চিকিৎসকরা করা সম্ভব হবে। সেই টেস্ট করাটাই তো আমাদের জন্য সমস্যা হয়ে যাচ্ছে।
রেডিও তেহরান: জনাব আবুল মকসুদ, করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে সরকারের নেয়া পদক্ষেপকে আপনি কীভাবে দেখছেন? বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের ক্ষেত্রে এ প্যাকেজ কিরকম হয়েছে?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: আমি দরিদ্র মানুষের অবস্থার কথাটাই আগে বলতে চাই। দরিদ্র মানুষের মধ্যেও শ্রেণি আছে। এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা ভিক্ষা করেই খায়। তারা রিলিফ নিয়েই জীবন যাপন করে। তাদের কথা আমি বলছি না। তার বাইরের যে শ্রেণিটা- যারা ভিক্ষা করে না কিংবা মোটের ওপর অস্বচ্ছল তাও না। তাদের জন্য সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা এবং যাদের মাধ্যমে ঐ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হচ্ছে অর্থাৎ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমি বলতে চাইছি, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় যারা আছেন তারা যে সবাই খুব নিবেদিত প্রাণ, নিঃস্বার্থ, পরোপকারী এবং সৎ মানুষ তেমনটি নয়। এসবের খুবই অভাব আছে। সেদিক বিবেচনায় ত্রাণের জন্য যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সেটি পর্যাপ্ত নয় বলে আমি মনে করি।
প্রতিনিয়ত নতুন নতুন দরিদ্র মানুষ তৈরি হচ্ছে। গত দুই মাসে বহুসংখ্যক নতুন দরিদ্র মানুষ তৈরি হয়েছে। আগামী কয়েকমাসে সে সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। আর সাহায্য নির্ভরতা ছাড়া এইসব দরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে বিশ্ব মহামারি করোনা সংকটকালের জন্য সমস্ত শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, কিভাবে সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করা যায় সেগুলো ঠিক করা দরকার ছিল। মোটের ওপর অভাবগ্রস্ত ঐসব মানুষদেরকে অনেক দিন ত্রাণের ব্যবস্থা করতে হবে। এক বা দুই মাসের মধ্যে এটার অবসান ঘটবে তেমনটি নয়। কিন্তু সরকার টাকা ও চাল-ডালসহ যেসব ত্রাণের বরাদ্দ করেছে এবং দিচ্ছে সেগুলো যথাযথভাবে, সুষ্ঠুভাবে প্রত্যাশী মানুষের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল! অথচ সেই পদ্ধতিটা সরকার এখনও ঠিক করতে পারে নি।
রেডিও তেহরান: জ্বি, করোনার প্রভাবে বাংলাদেশ আর্থিক দিক দিয়ে কতটা ক্ষতির মুখে পড়েছে? এই ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে উঠতে পারে?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, এটি অর্থনীতির প্রশ্ন। আমি নিজে অর্থনীতিবিদ না হলেও বন্ধু-বান্ধব অনেকেই অর্থনীতিবিদ। তাঁদের সঙ্গে প্রতিদিনই এ বিষয়ে কথাবার্তা হয়। করোনা পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে পরিস্থিতি তা কাটিয়ে ওঠা খুবই কঠিন হবে। দেখা যায় দেশের অর্থনীতি নিয়েই সরকারসহ প্রায় সবাই বেশি আলোচনা করছে পত্র-পত্রিকা বা মিডিয়াতে। যতোটা আলোচনা হয় সমস্যার সমাধানে পথ ততটা বেরিয়ে আসে না।
ব্যাংকের যারা মালিক বা কর্তা এরইমধ্যে তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছে। আর সরকার যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে তা দিয়ে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয় না। আমাদেরকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বড় রকমের ধাক্কা সামলাতে হবে। তবে কেউ কেউ বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি কম হবে। তাদের সাথে আমি একমত নই।
বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের ওপর ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ মানুষ নির্ভরশীল। এই মানুষ তাদের বেতন ভাতা নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। গার্মেন্টগুলো বন্ধ রাখা হয়েছিল করোনার প্রথম দিকে। এখন খুলে দেয়া হয়েছে। তো এই খুলে দেয়ার ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে তেমনটি বলা যায় না।
কাজেই বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। খুবই দক্ষতার সাথে এ বিষয়টিকে যদি হ্যান্ডেল করা না যায় তাহলে আমার মনে হয় যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়বে। ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ লক্ষ লোক অবশ্যই কর্মহীন হয়ে পড়বে। আর এই মানুষগুলো নতুন করে গরিব হবে। দুবেলা দুমুঠো তাদের ভাত জুটবে না।এইসব মানুষের জন্য সরকার কী করবে! এই সব মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যেসব অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়ার কথা শুনছি আমরা তাতে তারা কতটা লাভবান হবে তা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। আর শুধু গার্মেন্টস সেক্টর নয়, এরবাইরে পরিবহনসহ আরও অন্যান্য খাত রয়েছে যেখানে লোক ছাটাই হতে পারে। আমার মনেহয় যে অত্যন্ত বিচক্ষণার সাথে অর্থনীতিবিদ, সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদসহ সমাজের অন্যান্য শ্রেণি-পেশার বিজ্ঞজনদের নিয়ে বসে আলাপ-আলোচনা করা দরকার। কিভাবে এই বিপদ বা বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাওয়া যায় সেজন্য মতবিনিময় করা উচিত। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না। ফলে যেটা সমাজে অভাব-অনটন, অস্থিরতা, অশান্ত পরিস্থিতিসহ নানা সংকট দেখা দিতে পারে। কারণ অভাবি মানুষ যা খুশি তাই করতে পারে।
রেডিও তেহরান: জ্বি জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ, আপনি করোনা মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলছিলেন। আপনি বলছিলেন-করোনার মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তো সবশেষে আপনি করোনা মোকাবেলায় কি পরামর্শ দেবেন?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, এমনিতেই আমাদের দেশের যে রাজনৈতিক বিভেদ রয়েছে তাতে আমাদেরকে অনেক পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে রাজনৈতিক বিভেদ, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, তর্ক-বিতর্কের উর্ধ্বে উঠে সরকারের দিক থেকে এগিয়ে আসতে হবে। একইসাথে আমাদের দেশে প্রায় ৩০/৪০ টির মতো বিরোধীদল আছে তাদেরও ভূমিকা আছে। তাদেরকেও এগিয়ে এসে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। তাছাড়া আমাদের দেশে যে হাজার হাজার এনজিও আছে তারা বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে ব্যবসা করে বিপুল টাকার মালিক হয়েছে। এনজিওগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ দুই থেকে তিন কোটি লোক যদি অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাঁদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এবং সামাজিক অস্থিরাত যাতে সৃষ্টি না হয় সেজন্য সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সবাই মিলে চেষ্টা করা হলে যতোটা আমরা ভয়াবহ আমরা বলছি ততটা ভয়াবহ হবে না। মোটের ওপর আমরা হয়তো টিকে থাকতে পারব।
রেডিও তেহরান: তো জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ, করোনার কি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর সে সম্পর্কে রেডিও তেহরানকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে আবারও অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৪