ইরানি মনীষী মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি
আজ আমরা হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, আলেম, চিন্তাবিদ, বক্তা ও লেখক মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি সম্পর্কে আলোচনা করব।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির মূল নাম কামাল উদ্দিন হোসাইন বিন আলী সাবজাওয়ারি। তৈমুরি যুগের শেষের দিকের নিরলস লেখক, কবি ও ধর্মীয় নানা বিষয়ে পণ্ডিত এই ব্যক্তিত্ব ছিলেন পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যাকারী বা মুফাসসির। এ ছাড়াও তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী বক্তা, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ। কাশেফি ছিল কবিতা লেখার ক্ষেত্রে তাঁর ছদ্মনাম। কিন্তু একজন প্রখ্যাত বক্তা ও নসিহতকারী হওয়াতে তিনি ওয়ায়েজ হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন। ধারণা করা হয় হিজরি ৮৩৫ থেকে ৮৪০ সনের মধ্যে কোনো এক বছরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন সাবজাওয়ার শহরে। সে যুগে সাবজাওয়ার ছিল ইসলাম ও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এই অঞ্চলে ছিল অনেক সুদৃশ্য মসজিদ ও মাদ্রাসা। এ অঞ্চলের আলেম-সমাজ সুদূর অতীত থেকেই ছিলেন শরীয়তপন্থী এবং ওয়াজ-নসিহতের ক্ষেত্রে খ্যাতিমান।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি ছিলেন সুলতান হোসাইন বয়কারো ও তার খ্যাতিমান মন্ত্রী আমির আলীশির নাওয়ায়ির সমসাময়িক। তিনি যৌবনে ধর্মীয় নানা বিদ্যা, গণিত ও সুলেখন শিল্পে দক্ষতা অর্জন করেন এবং এরপর এরফান বা মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনে মনোনিবেশ করেন। হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি হাদিস, তাফসির, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যাসহ তার যুগে প্রচলিত সব বিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তিনি বহু বছর ধরে সাবজাওয়ার, নিশাপুর, মাশহাদ ও বিশেষ করে হেরাত শহরে ধর্ম এবং নৈতিকতার বিষয়ে ওয়াজ-নসিহত করেছিলেন। তার ওয়াজের ভাষা ছিল মধুর ও আকর্ষণীয়। অত্যন্ত মানানসই বাক্য ও শব্দ ব্যবহার করতেন হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি। পবিত্র কুরআনের জটিল অর্থবোধক নানা বাক্য ও মহানবীর হাদিসের মর্মার্থ সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা ছিল তার ওয়াজ-নসিহতের আরেকটি বড় আকর্ষণ।
হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি সাবজাওয়ারের উঁচু স্তরের আলেমদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের পর স্বপ্নে-পাওয়া নির্দেশনার আলোকে নিশাপুর ও মাশহাদে যান মাওলানা সা'দ উদ্দিন কাশগরির সাক্ষাত লাভের আশায়। কিন্তু এ অঞ্চলে এসে তিনি জানতে পারেন যে এই মহান ব্যক্তিত্ব ইন্তেকাল করেছেন। তাই কাশেফি এই মহান ব্যক্তিত্বের মাজার জিয়ারতের জন্য হেরাতে আসেন। মাওলানা সা'দ উদ্দিন কাশগরির মাজারে এসে তিনি প্রখ্যাত কবি জামির সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি কাশেফিকে নকশবন্দিয়া তরিকা নামের সুফি মতবাদের দীক্ষা দেন এবং তাকে এই মতবাদের অনুসারী করেন।
হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি ধর্মীয় জ্ঞান রপ্ত করার পর জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছেন ওয়াজ-নসিহত বা ধর্ম প্রচারের কাজে। তাকে মনে করা হত সে যুগের শ্রেষ্ঠ বক্তা। তার বক্তৃতা বা ওয়াজ-নসিহতের সভায় বিপুল মানুষের সমাবেশ ঘটত। তার আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি ও মিষ্টি সুর দর্শক-শ্রোতাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করত। বিশেষ করে হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি যখন কুরআনের আয়াত ও হাদিসকে মানানসই বাগধারা ও শব্দ দিয়ে মিষ্টি সুরে বর্ণনা করতেন তখন তা উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করত।
৮৭৩ হিজরিতে সুলতান হুসাইন মির্যা বয়কারো যখন হেরাতের শাসক হন তখন কাশেফির জনপ্রিয়তা ও সম্মান অনেক বেড়ে যায়। এই সুলতানের সুযোগ্য মন্ত্রী আমির আলীশিরনাওয়ায়ি বরাবরের মতই গুনিদের প্রতিভার বিকাশে উৎসাহ যোগাতেন ও তাদেরকে সব ধরনের সহায়তা দিতেন। তিনি হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফিকে ফার্সি ভাষায় বই লিখতে উৎসাহ দেন। ফলে কাশেফির বেশিরভাগ বইই লেখা হয়েছে সুলতান বয়কারো ও আলীশিরনাওয়ায়িকে উৎসর্গ করে। সে যুগের ধর্ম বিষয়ের বক্তাদের খুব সম্মান করা হত এবং তারা গড়ে উঠতেন মুহাদ্দিস ও আলেমদের মধ্য থেকে। এরই আলোকে হেরাতে বড় মুহাদ্দিস ও আলেম হিসেবে বিশিষ্ট বা অনন্য বক্তা হওয়ার সম্মান পান কাশেফি। তার বক্তৃতা বা ওয়াজ-নসিহতের আসরে যোগ দিতেন সুলতান বয়কারো এবং তার দরবারের ব্যক্তিবর্গ।
আলীশিরনাওয়ায়ি তার মাজালিসুন্নাফায়িস শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, 'মানবজাতির মধ্যে হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির মত বক্তা কখনও ছিল না ও এখনও নেই। তার ওয়াজের মজলিশে এত বেশি মানুষের সমাবেশ ঘটত যে ভিড়ের চাপে মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হত। বিশুদ্ধ ভাষা ও সুমিষ্ট সুর ছিল এত ব্যাপক আকর্ষণের অন্যতম রহস্য। আসলে তার কণ্ঠে যেন হযরত দাউদ নবীর সুমিষ্ট সুরের ছাপ ছিল। মুসলমানদের মধ্যে অন্য কোনো ব্যক্তি এক্ষেত্রে তার মত নন। তার ওয়াজের মজলিশেই কেউ কেউ তার ভাষণকে কবিতার মত ছন্দবদ্ধ করে তা মানুষকে শোনাতেন। '
হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি ছিলেন একজন বড় জ্যোতির্বিদ। খ'ন্দ মির তাকে সে যুগের শ্রেষ্ঠ বা অনন্য জ্যোতির্বিদ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে অন্যান্য জ্ঞানেও তিনি ছিলেন একই রকম উচ্চ পর্যায়ের। 'আসারে সাব্আ' জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে কাশেফির একটি বইয়ের নাম। পবিত্র কুরআনের তাফসিরেও তিনি ছিলেন সুদক্ষ। এ ছাড়াও সাহিত্য ও ইতিহাস বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল প্রশংসনীয়।
বেশিরভাগ লেখক ও ইতিহাসবিদের মতে কাশেফি মারা যান ৯১০ হিজরিতে। হেরাতের তার মৃত্যু ঘটেছিল। তার ছেলে ফখরুদ্দিন সাফি আলীও বিখ্যাত ওয়ায়েজ বা ধর্ম-প্রচার বিষয়ে বক্তা হয়েছিলেন। সাফি আলীরও কয়েকটি বই রয়েছে। তিনিও ছিলেন নকশবন্দিয়া তরিকার অনুসারী। সাফি আলী মারা যান ৯৩৯ হিজরিতে।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৩০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।