ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (১৮ পর্ব): হোভেইজে শহরের যুদ্ধ্ ও এর প্রভাব
হোভেইজে শহর রক্ষার যুদ্ধ আট বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। গত আসরে আমরা যেমনটি বলেছিলাম শহীদ আলাম আল-হুদা ও তার ১২০ জন সঙ্গীর শাহাদাতের মাধ্যমে হোভেইজে শহর মুক্ত করার অভিযান ব্যর্থ হয় এবং এটির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ইরাকি বাহিনীর হাতে চলে যায়।
কিন্তু এই পরাজয় ইরানি যোদ্ধাদের মধ্যে সাদ্দামের লেলিয়ে দেয়া বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ করার আক্রোশ বাড়িয়ে দেয়। হোভেইজের যুদ্ধ হয়েছিল মূলত ইরাক ও ইরানি সাঁজোয়া বাহিনীর মধ্যে এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে মিশরের সেনাবাহিনীর বিখ্যাত অক্টোবরের যুদ্ধের পর এটি ছিল ট্যাংকের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
ইরাকি সেনাদের হাতে হোভেইজে শহরের পতন এবং ওই বাহিনীর সুসাংগের্দ শহর দখলের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর যুদ্ধক্ষেত্রে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে। দু’পক্ষের মধ্যেই ছিল এক ধরনের কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। কেউই যেন বুঝতে পারছিল না এখন কি করতে হবে। হোভেইজের ট্যাংকের যুদ্ধে ইরানের পরাজয় হয়েছিল মূলত বহু বছরের পুরনো ট্যাংক দিয়ে ইরাকি বাহিনীর অত্যাধুনিক ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের সামনে দাঁড়াতে না পারার কারণে। ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে তেহরানের পক্ষে এসব যুদ্ধাস্ত্র কেনা সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে ইরাকের ওপর কোনো অবরোধ তো ছিলই না উল্টো সমরাস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের অস্ত্রের ভাণ্ডার সাদ্দামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।
এ অবস্থায় ওই একই ধরনের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তির অর্থ ছিল আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীকে একের পর এক যুদ্ধে বিজয়ের সুযোগ করে দেয়া। অবশ্য হোভেইজের যুদ্ধ ইরানকে এ ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে এবং ইরানি কর্মকর্তারা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে পান। এতদিন ইরানি যোদ্ধাদের মধ্যে শৃঙ্খলার যে অভাব ছিল তা কাটিয়ে সকল বেসামরিক যোদ্ধাকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র অধীনে নিয়ে আসা হয। তাদেরকে প্রয়োজনীয় সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং এতদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া হয়। ঈমানদার ও স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধাদের এক বিশাল বাহিনী গড়ে ওঠে এবং এই বাহিনী দিয়ে যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণ করা হয়।

এর ফল পাওয়া যায় দু’মাস পর সুসাংগের্দ এলাকায় পরিচালিত সীমিত একটি অভিযানে। ওই অভিযানে ইরানি যোদ্ধাদের বিজয় তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দেয় যে, সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক সীমাবদ্ধতা নিয়েও আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়া সম্ভব। ইরানি নেতৃবৃন্দ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, প্রচলিত যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে এসে একমাত্র বিপ্লবী পন্থায় যুদ্ধ করে ইরাকি বাহিনীকে পর্যদুস্ত করতে হবে। এর ফলে ইরাক-ইরান যুদ্ধে এক নয়া অধ্যায়ের সূচনা হয়। গণপ্রতিরোধ বাহিনী এবং আইআরজিসির যোদ্ধারা বিপ্লবী চেতনাকে বুকে ধারণ করে অসীম সাহস আর অকুতোভয় মনোবল নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
এ সময় ইসলামি বিপ্লবের পর গঠিত আইআরজিসির ব্যাপ্তি আরো বাড়ানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র সাবেক স্বৈরশাসক শাহ সরকারের বিরুদ্ধে বিপ্লবের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন তারা দলে দলে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে যোগদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মেধাবি সৈনিক ছিলেন বলে তারা অল্পদিনের মধ্যে যুদ্ধের সব কলাকৌশল রপ্ত করে ছোট ছোট সেনাদলের কমান্ডার হয়ে যান। অথচ এরকম যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই সাধারণ যোদ্ধাদের পক্ষে সেনা অফিসার হওয়া সম্ভব ছিল না। এখানে বিপ্লবী চেতনা ও দেশরক্ষার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এভাবে হোভেইজের যুদ্ধ ইরানের সেনাবাহিনী, আইআরজিসি ও গণবাহিনীকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
এরপর আইআরজিসি আরো বড় ধরনের অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেয়। প্রথমে তারা সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে এবং পরে এককভাবে আগ্রাসী বাহিনীকে রুখে দেয়ার পরিকল্পনা তৈরি ও তা বাস্তবায়ন করে। হোভেইজের যুদ্ধের আরেকটি ফল ছিল সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি’র মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া সৃষ্টি। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী অনুধাবন করতে পেরেছিল যে, আগে থেকে সমন্বয় না থাকলে এবং দুই বাহিনীকে সুসংগঠিত না করতে পারলে যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে আইআরজিসি’র শীর্ষ নেতৃত্ব এই বাহিনীর জন্য আলাদাভাবে প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহে মনযোগী হন। সেইসঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি’র দায়িত্ব আলাদাভাবে ভাগ করে দেয়া হয়। হোভেইজে’র যুদ্ধে দু’পক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ইরানি যোদ্ধাদের যে চরম ক্ষতি হয়েছিল, এই পদ্ধতিতে পরবর্তীতে তার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়।
হোভেইজে অভিযানের পর ইরানের সমরসজ্জায় যেমন পরিবর্তন আসে তেমনি আগ্রাসী বাহিনীও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিজের অবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়। হোভেইজে যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরাকি বাহিনী পরাজিত হয় এবং তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু পরের দিন তারা পাল্টা হামলা চালিয়ে ইরানি যোদ্ধাদের পিছু হটিয়ে দেয়। তবে প্রথম দিন ইরান যতটুকু অগ্রসর হয়েছিল দ্বিতীয় দিনে ততটুকু পিছু হটে ইরানি যোদ্ধারা থেমে যান। এ অবস্থায় উভয় পক্ষ যার যার অবস্থানে অটল থাকে। বাস্তবতা হচ্ছে, হোভেইজে যুদ্ধের পর ইরাকি বাহিনীরই আর সামনে অগ্রসর হওয়ার মতো শক্তি ছিল না। তারা যদিও ইরানি অবস্থানে হামলা চালানোর কাজ শতভাগ বন্ধ রাখেনি তারপরও তারা যে ছিটেফোঁটা হামলা চালাত তা ছিল প্রদর্শনমূলক; ইরানি যোদ্ধাদের হাত থেকে নতুন এলাকা দখল করার মতো শক্তি তাতে ছিল না।
এ কারণে সাদ্দামের নেতৃত্বাধীন ইরাক সরকার তার দখলীকৃত এলাকাগুলো নিজের দখলে রেখেই ইরানের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করার পরিকল্পনা করে। সেইসঙ্গে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ করার জন্যও প্রস্তুতি নিতে থাকে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, হোভেইজে ফ্রন্টের যুদ্ধ ইরানের সামরিক বাহিনী, এদেশের রাজনৈতিক শক্তির বিন্যাস ও আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর নীতি নির্ধারণের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। ট্যাংক ও সাঁজোয়া বাহিনীর বিপরীতে ইরান নিজের অক্ষমতা অনুধাবন করেছিল, গণবাহিনীর ভূমিকা শক্তিশালী হয়েছিল এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী অধিক সংখ্যক জওয়ান নিয়োগ দিয়ে ও নিজের সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা মিটিয়ে যুদ্ধের ময়দানে আরো বড় দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিয়েছিল।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ২৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।