ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (২১ পর্ব): আবাদান শহর মুক্ত করার অভিযান
গত আসরগুলোতে আমরা বলেছি, ১৯৮০’র দশকে আগ্রাসী সাদ্দাম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পাশাপাশি ইরানের ইসলামি সরকারকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে ক্ষতিকর উপাদানগুলো অপসারণের কাজও করতে হয়েছিল।
ইসলামি বিপ্লবের শত্রুদের সঙ্গে ইরানের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বনি সদরের সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়লে ইসলামি ইরানের স্থপতি ইমাম খোমেনী (রহ.)’র সামনে বনি সদরকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ক্ষমতাচ্যুতির পর বিপ্লব বিরোধীদের সঙ্গে বনি সদরের সম্পর্কের বিষয়টি আরো বেশি প্রকাশ হয়ে পড়ে। তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর ইরানে একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণে শীর্ষস্থানীয় বহু নেতা ও কর্মকর্তা শাহাদাতবরণ করেন। শহীদ এসব নেতার মধ্যে শীর্ষে ছিলেন ইরানের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ড. বেহেশতি, ইরানের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ আলী রাজায়ি ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ বাহোনার।
বিপ্লবের শত্রুদের ধারণা ছিল, এসব হত্যাকাণ্ড চালিয়ে তারা ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে ফল হয় উল্টো এবং এসব হত্যাকাণ্ডের ফলে সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। জনগণের মধ্যে বিপ্লব ও দেশরক্ষার চেতনা এতটা শক্তিশালী হয় যে, তারা যুদ্ধ করার জন্য দ্বিগুণ উৎসাহে সীমান্তের ফ্রন্টগুলোর দিকে ছুটে যেতে থাকে। বনি সদর সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক থাকার সময় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’কে প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম দেয়া হয়নি। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এই অবস্থার অবসান ঘটে এবং আইআরজিসি পূর্ণ শক্তি ও উদ্যোমে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি’র মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী হয় এবং দুই বাহিনী পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে আবাদান শহর অবরোধ মুক্ত করার জন্য ‘সামেনুল আয়েম্মে’ নামক অভিযান চালায়। ১৯৮১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ভোররাত ১টায় এ অভিযান শুরু করা হয় এবং মাত্র দুই দিনের মধ্যে সফলতার সঙ্গে অভিযানের সমাপ্তি ঘটে। আবাদান শহরকে অবরোধমুক্ত করা হয়। অভিযানের কোনো কোনো অংশে ইরাকি বাহিনী সামান্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেও শেষ পর্যন্ত চরম ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিমত্তা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তাদেরকে দুর্বল ভাবার কারণেই সাদ্দামের লেলিয়ে দেয়া ইরাকি বাহিনী এই অভিযানে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। ‘সামেনুল আয়েম্মে’ অভিযানে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ‘কারুন’ নদীর পূর্ব তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলমুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ইরাকি বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া হাজার হাজার ইরানি যোদ্ধা মুক্ত হয়ে মূল বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন।
আবাদান অবরোধমুক্ত করার অভিযানে যেসব সাফল্য অর্জিত হয় সেগুলোর কয়েকটি হচ্ছে- আবাদান শহর’সহ ১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ইরাকিদের দখলমুক্ত করা, এক হাজার ৮০০ শত্রুসেনাকে বন্দি করা, প্রায় দুই হাজার ইরাকি সেনাকে হতাহত করা, ইরাকিদের ৯০টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা, ইরাকিদের ফেলে যাওয়া ১০০টি ট্যাংক ও ৬০টি সাঁজোয়া যান অক্ষত অবস্থায় হস্তগত করা এবং ইরাকিদের তিনটি জঙ্গিবিমান ও একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করা। এই অভিযানে ইরাকি বাহিনীর পরাজয় দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দামকে এত বেশি ক্ষুব্ধ করেছিল যে, সাতজন ইরাকি সেনা কমান্ডারকে তার নির্দেশে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়।
আবাদান অবরোধমুক্ত করার অভিযানটি ছিল ইরাকিদের বিরুদ্ধে চালানো চারটি বড় অভিযানের একটি এবং এটিকে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার অভিযান হিসেবে অভিহিত করা হয়। আইআরজিসি’র তৎকালীন প্রধান কমান্ডার মোহসেন রেজায়ি এ সম্পর্কে বলেন, “ওই অভিযান আমাদেরর মধ্যে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে সার্বিক যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার প্রবল আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দেয় এবং ওই অভিযানের পর আমরা যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করি। ” অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবাদান মুক্ত করার অভিযান সফল হওয়ার প্রভাব পড়ে। অভ্যন্তরীণ অঙ্গনে এটি ছিল সবচেয়ে বড় সফল অভিযান যার ফলে ইরানি যোদ্ধাদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে ওঠে। তারা আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা লাভ করে। ইরানের রাজনীতিবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য কমে যায় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতা শক্তিশালী হয়।
ওই অভিযানের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণ বিপুল ভোটে আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীকে ইরানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করে। প্রথম প্রেসিডেন্ট বনি সদর পালিয়ে যাওয়ার পর মোহাম্মাদ আলী রাজায়ি ইরানের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু বোমা হামলায় তিনি শহীদ হওয়ার পর ইসলামি বিপ্লবের দুই বছরের মাথায় ইরানে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশের ভেতরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইরানের ইসলামি সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করার কাজে মনযোগী হয়। অন্যদিকে ইরাকের আগ্রাসী সরকারকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া এবং ইসলামি বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কয়েকটি আরব দেশ মিলে পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা পিজিসিসি গঠন করে। সেইসঙ্গে ইরানের ইসলামি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মধ্যপ্রাচ্যের পদলেহী আরব দেশগুলোর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে আমেরিকার সামরিক তৎপরতা বেড়ে যায়।
আমেরিকা পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পাশাপাশি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করে। মার্কিন সরকার ইরানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে অহেতুক ইরান সম্পর্কে ভীতি সৃষ্টি করার কাজে হাত দেয়। আবাদান অভিযানে চরম ব্যর্থতার পর ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম জর্দানের রাজধানী আম্মানে অনুষ্ঠিত আরব শীর্ষ সম্মেলনে দাবি করেন, তিনি ইরান দখল করার উদ্দেশ্যে দেশটিতে আগ্রাসন চালাননি বরং তিনি তার দেশের সীমান্তবর্তী শহরগুলোকে ইরানের হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছেন! অথচ তার কিছুদিন আগে ২২ সেপ্টেম্বর সাদ্দাম দম্ভোক্তি করেছিলেন, তিনি আগ্রাসন শুরু করার তিনদিনের মধ্যে খুজিস্তান প্রদেশ দখল করে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবেন।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ১৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।