আগস্ট ০১, ২০২০ ১৭:২৫ Asia/Dhaka

গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি দশম-একাদশ শতকের তথা খ্রিস্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি ও লেখক তাকিউদ্দিন আওহাদি বালিয়ানির অবদান সম্পর্কে কথা বলব।

গত পর্বের আলোচনায় আমরা আওহাদি বালিয়ানির ‘আরাফাতুল আশেকিন ওয়া ওরাসাতুল আরেফিন' শীর্ষক বইটি রচনার পটভূমি ও  ইরানি বা ফার্সিভাষী কবিদের জীবনী সংক্রান্ত এই অমূল্য বইয়ের নানা দিক নিয়ে কথা বলছিলাম। আজ এ বইটির আরও কিছু দিক সম্পর্কে আলোকপাত করব। 

আওহাদি ‘আরাফাতুল আশেকিন ওয়া ওরাসাতুল আরেফিন' শীর্ষক বিশাল বইটি লিখেছেন বিচিত্র ভঙ্গিতে। কবিদের কবিতা ও জীবনের বর্ণনায় আওহাদির ভাষাও কখনও হয়ে উঠেছে পদ্যময় ও কখনও বেশ জটিল ও কৃত্রিম। কোনো কোনো কবির কবিতার বাচনভঙ্গি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞচিত মন্তব্য করেছেন তিনি।অনেকেই কবি নাসিরি ও ইসমাত বোখারির গজলকে মিলিয়ে ফেলেছেন বলে আওহাদি এ বইয়ে মন্তব্য করেছেন।  তিনি লিখেছেন: এসব গজলের বেশিরভাগই আসলে কবি ইসমাতের লেখা। কারণ এগুলোর বাচনভঙ্গি, বক্তব্যের বৈশিষ্ট্য ও আধ্যাত্মিক বা সুফিবাদী সুর ইসমাতের গজলগুলোর সঙ্গেই বেশি মিলে যায়।  মনে হয় যেন কবি ইসমাতই দুই ভিন্ন ছদ্মনামে এসব রচনা করেছেন!  কবি নাজারি হারুভির নামে প্রচলিত কতগুলো গজল সম্পর্কে আওহাদি লিখেছেন,কেউ কেউ বলেন এই গজলগুলো নাজারি হারুভির, কেউবা বলেন অন্য কারো। কিন্তু স্টাইল ও কাঠামোই জোর গলায় বলছে এসবের লেখক কে।

তাকিউদ্দিন আওহাদি কবিদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে যথাসম্ভব নিরপেক্ষ থাকতে এবং প্রত্যেক কবির নানা কবিতা থেকে বিখ্যাত কবিতা তুলে ধরতে চেয়েছেন। কবিদের লেখার মান সম্পর্কে তিনি অপমানজনক বা আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেননি, তবে সুস্পষ্ট মত দিতেও দ্বিধা বোধ করেননি। যেমন, মাওলানা আলী মোগ’নি সম্পর্কে আওহাদি লিখেছেন, ‘কবিতায় তার দক্ষতা রয়েছে, বিশেষ করে কাসিদা রচনায়। তবে তিনি অপ্রচলিত ও অপ্রয়োজনীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন।’ মাওলানা আম্‌র্‌ কেরমানি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, তার কবিতার পুরোটাই যথাযথ, প্রাঞ্জল ও সরল।

আওহাদির ‘আরাফাতুল আশেকিন ওয়া ওরাসাতুল আরেফিন' শীর্ষক বইটি কেবলই সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-ভাণ্ডার নয়। বইটি সাফাভি যুগের সামাজিক পরিস্থিতি, চাল-চলন, প্রথা, সংস্কৃতি ও শিল্প সম্পর্কেও বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। সাফাভি যুগের ইস্পাহানের নানা অঞ্চল ও মহল্লা এবং সেখানকার কবিদের সম্পর্কে যেসব তথ্য ও চিত্র এ বইয়ে তুলে ধরেছেন আওহাদি তা অন্যান্য সূত্রে খুব কমই দেখা যায় বা একেবারেই দেখা যায়নি। তাই বেশিরভাগ গবেষকই মনে করেন সাফাভি যুগের সাহিত্য ও সামাজিক বিষয়ে গবেষণা আওহাদির এই গুরুত্বপূর্ণ বইটি পড়া ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। 

আওহাদি ‘আরাফাতুল আশেকিন ওয়া ওরাসাতুল আরেফিন' নামের বইটিতে  অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা ও ইঙ্গিত দিয়েছেন। যেমন, নাকতুইয়ান সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাফাভি সম্রাট শাহ আব্বাসের যুদ্ধগুলোর বর্ণনা রয়েছে তার এ বইয়ে। শাহ-আব্বাস এই সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

ইস্পাহানের সঙ্গে আওহাদির সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে ডক্টর শাফিইয়ুনের বক্তব্য মনে রাখা দরকার। তিনি বলেছেন, ‘খোরাসান ও এমনকি বৃহত্তর ইরাকের  অনেক অঞ্চলের তুলনায় ইস্পাহান অনেক দেরিতে ফার্সি সাহিত্যের বিশেষ করে কবিতার কেন্দ্রস্থল বা লালনভূমি হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের মোগল যুগের সমসাময়িক সাফাভি যুগে ও তারও এক শতক পরে ইস্পাহানই ছিল ফার্সি কাব্য ও কবিতার প্রধান কেন্দ্র। এখানেই গড়ে উঠেছিল ফার্সি সাহিত্যের অনেক ধারা এবং এসব ধারার নেতৃত্ব দিয়েছে ইস্পাহান।

ডক্টর শাফিইয়ুন আরও মনে করেন, সাফাভি যুগের ইস্পাহান ঘরানার কবিতা-সাহিত্য ধারার সাহিত্য-মানের গুরুত্বের কথা বাদ দিলেও মোগল-পূর্ব যুগগুলোর তুলনায় জোর-গলায় এটা বলা যায় যে ফার্সি কবিতা অন্য কোনো যুগেই এত ব্যাপক মাত্রায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েনি। এ ব্যাপারে অনেক সাক্ষ্য-প্রমাণ তুলে ধরা যায় সাহিত্য বিষয়ক জীবনী ও ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলো থেকে। তার মতে এ বিষয়ে লেখা সুবিন্যস্ত  ও সুপরিকল্পিত প্রথম গবেষণামূলক প্রামাণ্য গ্রন্থ হল আওহাদির ‘আরাফাতুল আশেকিন ওয়া ওরাসাতুল আরেফিন'শীর্ষক বইটি।

আওহাদি নানা সূত্র ও তার বইয়ে স্থান-পাওয়া কবিদের কবিতার আলোকে বিশ্বাস করতেন যে এই কবিদের অনেকেই ছিলেন মধ্যম-সারির খ্যাতিমান কবি হওয়ার মত যোগ্যতাসম্পন্ন। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া কবিতাগুলোতে সেই যোগ্যতা ফুটে উঠেনি। আওহাদির আগে অন্য কেউ ইরানি কবিদেরকে প্রথম, মধ্যম ও তৃতীয় সারির কবির শ্রেণী-বিভাগে শ্রেণীবদ্ধ করেননি বলে ডক্টর শাফিইয়ুন মনে করেন।  

আওহাদির ‘আরাফাতুল আশেকিন ওয়া ওরাসাতুল আরেফিন' শীর্ষক বইটি বিশদ বর্ণনা ও পরিপূর্ণতার দিক থেকে বইটি লেখার সময় পর্যন্ত ছিল অসাধারণ এক বই। জীবনী-ধারার ফার্সি বইগুলোর সারিতে এ বই হয়ত আজও শীর্ষস্থানীয় দুই-তিনটি বইয়ের অন্যতম। এ বইটি সে যুগেই অনেক লেখকের নজর কেড়েছিল। সমসাময়িক বর্ষীয়ান লেখক মোল্লা কাতেয়ি হারুভি আওহাদির এ বই সম্পর্কে লিখেছিলেন, আওহাদির ‘আরাফাতুল আশেকিন ওয়া ওরাসাতুল আরেফিন' শীর্ষক বইটি একটি ভাল ও গুরুত্বপূর্ণ বই হওয়া সত্ত্বেও খ্যাতি পায়নি। বইটি লেখা শেষ হওয়ার বছরেই তথা ১০২৪ হিজরিতে ১০৩ বছর বয়স্ক হারুভি মারা যান। তাই আওহাদির এ বইটির খ্যাতি অর্জন না করা সম্পর্কে তার মন্তব্যটি যথেষ্ট সময়োচিত হয়নি। অবশ্য পশ্চিমা প্রাচ্যবিদ ও ইরান বিশেষজ্ঞরাও  আওহাদির ‘আরাফাতুল আশেকিন ওয়া ওরাসাতুল আরেফিন' শীর্ষক বইটির কথা বহু পরে জানতে পেরেছেন। এর কারণ হয়ত হাতে-লেখা বিশাল এ বইটির খুব কম সংখ্যক কপি করা হয়েছিল। 

সমসাময়িক যুগে ও তারও পরে আওহাদির এ বই ব্যবহার করেছেন অনেক লেখক। আলী কুলি খান ওয়ালেহ দাগেস্তানিই সর্বপ্রথম তার ‘রিয়াদুশ শোয়ারা’ শীর্ষক বই লেখার ক্ষেত্রে এ বইটি ব্যবহার করেছিলেন। তিনি এ বইয়ের অনেক তথ্য সরাসরি ও হুবহু তুলে ধরেছেন। এরপর আওহাদির বইটি ব্যবহার করেছেন রেজা কুলি খান হেদায়াত ‘মাজমায়ুল ফাসাহা’ ও ‘তাজকিরায়ে রিয়াদুল আরেফিন’ শীর্ষক  দু’টি বইয়ে। আওহাদির এ বইটির হাতে-লেখা একমাত্র কপিটি ছিল তার হাতে। কিন্তু আলী কুলি খানের মত তিনিও আওহাদির বইটির নাম উল্লেখ করেননি। তাদের পর আফতাব রাই লাখনৌভি হিজরি ১৩০০ সনে লেখা ‘রিয়াদুল আরেফিন’ নামক বইয়ে আওহাদির বইটির তথ্য ব্যাপক মাত্রায় ব্যবহার করেছেন উৎসের নামসহ। আরও পরে আওহাদির বই ব্যাপক মাত্রায় ব্যবহারকারী লেখকদের মধ্যে আহমাদ গোলচিন ও জাবিহউল্লাহ সাফার নাম উল্লেখযোগ্য।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/০১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।