প্রখ্যাত ইরানি কবি ও লেখক তাকিউদ্দিন বালিয়ানির জীবন
প্রখ্যাত ইরানি কবি ও লেখক তাকিউদ্দিন আওহাদি বালিয়ানির অবদান সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে আমরা তার দু-একটি বিখ্যাত বইয়ের নানা দিক তুলে ধরেছি। আজ আমরা এই লেখকের রচিত অভিধান-গ্রন্থ 'সুরমেইয়ে সোলায়মানি' বা 'সোলায়মানি সুরমা' নিয়ে কিছু কথা বলব।
আওহাদির এই অভিধানে অপ্রচলিত অনেক ফার্সি শব্দ স্থান পেয়েছে। এ ছাড়াও ভূগোল আর ইতিহাস বিষয়ক অনেক নাম ও পরিভাষা এবং ওষুধের নামও 'সুরমেইয়ে সোলায়মানি' শীর্ষক এই অভিধানে দেখা যায়। ৩২টি অধ্যায়ের এ বইয়ে শব্দগুলো ফার্সি বর্ণমালার ধারাক্রম অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। প্রত্যেক অধ্যায়ে রয়েছে ৩২টি ছোট উপ-অধ্যায় যা বিন্যস্ত হয়েছে শব্দের শেষ অক্ষরের দিক থেকে ফার্সি বর্ণমালার ধারাক্রম অনুযায়ী।
আওহাদি 'সুরমেইয়ে সোলায়মানি' শীর্ষক অভিধান রচনা করেছিলেন ইরানের ইস্পাহানে থাকার সময়। এ বইটিতে আওহাদি ও মুহাম্মদ কাসেম সারওয়ারি কাশানি নামের অন্য একজন অভিধান লেখকের একটি বিতর্কও স্থান পেয়েছে। আওহাদির আরাফাতুল আশেকিন বইয়ে এ বিষয়ে বর্ণনা এসেছে। 'সুরমেইয়ে সোলায়মানি' আওহাদির একমাত্র বই যা ছাপানো হয়েছে।
হিজরি ১১ শতক ছিল ব্যাপক মাত্রায় ফার্সি অভিধান রচনার যুগ। এ সময়ে ফার্সি ভাষা তৎকালীন বৃহত্ত্তর ইরান ও মধ্য এশিয়া ছাড়াও ব্যাপক মাত্রায় ভারত উপমহাদেশেও প্রচলিত ছিল। তাই এইসব অঞ্চলে ফার্সি ডিকশনারি বা অভিধানের ব্যাপক চাহিদা থাকায় রচনা করা হয়েছিল এই ভাষার অনেক অভিধান। এসবের মধ্যে ফারহাঙ্গে জাহানগিরি, ফারহাঙ্গে রাশিদি, মাজমায়ুল ফোরাসে সারওয়ারি, ফারহাঙ্গে জা'ফারি, বোরহ'নে ক্ব'ত্বে'এ ও সুরমেইয়ে সোলায়মানির নাম উল্লেখযোগ্য। এসব ডিকশনারির মধ্যে বোরহানে ক্ব'ত্বে'এ সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ।
অন্য ভাষা থেকে কেবল ফার্সি ও ফার্সি থেকে ফার্সি বা ফার্সি থেকে একটি অথবা একই সঙ্গে সমার্থক কয়েকটি বিদেশী ভাষার শব্দকোষ তথা অভিধান রচনা ইরানি অভিধান শিল্পের এক ঐতিহ্যবাহী ধারার অংশ। অতীতের এসব অভিধানে শব্দের অর্থ বর্ণনায় অনেক ভুল-ত্রুটি থাকলেও এসব ডিকশনারির গুরুত্ব বা গ্রহণযোগ্যতা ছিল ব্যাপক। মধ্য যুগের ফার্সি অভিধান লেখকরা সাধারণত 'লোগাতে ফার্সে আসাদি' নামক অভিধান নকল করে নতুন নতুন অভিধান রচনা করতেন। সময়ের ব্যবধানে এসব নকল অভিধানেও অনেক হস্তক্ষেপের ফলে নানা ধরনের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। নানা ধরনের ঘাটতি ও অদ্ভুত ধরনের অনেক বাড়তি অধ্যায়ও যুক্ত হয়েছিল এসব অভিধানে। একই বই থেকে বার বার নকল করে নতুন অভিধান লেখা হত বলে একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তিও হত। শব্দের প্রামাণ্য ব্যবহার বা দৃষ্টান্ত দেখাতে গিয়ে কবিতার লাইনের যে উদ্ধৃতি দেয়া হত তাতেও অনেক ভুল প্রয়োগ দেখা যায়। শব্দের দৃষ্টান্ত তুলে ধরার দিক থেকে ফার্সি অভিধানগুলো ছিল দু' ধরনের। কোনো কোনো অভিধানে শব্দগুলোর ব্যাখ্যা বা অর্থ তুলে ধরা হত কবিতার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে। এসব অভিধান সাধারণ অভিধানের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ও সমৃদ্ধ বলে স্বীকৃত।
অন্যদিকে কোনো কোনো অভিধানে শব্দের অর্থগুলো তুলে ধরা হত গদ্য ও পদ্যের কোনো দৃষ্টান্ত ছাড়াই। ফারহাঙ্গে জাহানগিরি, ফারহাঙ্গে রাশিদি ও মাজমায়ুল ফোরাসে সারওয়ারি নামের ডিকশনারিগুলো কবিতার পঙক্তিতে তুলে ধরা প্রামাণ্য দৃষ্টান্তের কারণে বেশি জনপ্রিয় ও সমৃদ্ধ হিসেব স্বীকৃত। ফারহাঙ্গে জা'ফারি, সুরমেইয়ে সোলায়মানি ও বোরহ'নে ক্ব'ত্বে-এ শীর্ষক অভিধানগুলো কবিতার মাধ্যমে শব্দগুলো বিশ্লেষণ করেনি বা শব্দ-প্রয়োগের কোনো দৃষ্টান্ত তুলে ধরেনি। তাই এ ধরনের অভিধানগুলোর সম্পাদনা করা প্রথমোক্ত অভিধানগুলো সম্পাদনার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। গদ্য ও পদ্যের দৃষ্টান্ত না থাকায় এসব অভিধানের অনেক ভুল শব্দ ও শব্দের অর্থ সম্পর্কে ভুল বর্ণনাগুলো শুদ্ধ করার জন্য সম্পাদককে অনেক বেশি বেগ পেতে হয় ও গ্রহণযোগ্য নানা অভিধান থেকে প্রামাণ্য দৃষ্টান্তগুলো তুলে ধরার জন্য অনেক বাড়তি খাটা-খাটুনি করতে হয়।
আওহাদি ফার্সি টু ফার্সি শব্দভাণ্ডারের 'সুরমেইয়ে সোলায়মানি' শীর্ষক অভিধান রচনা করেছিলেন একাদশ হিজরির প্রথম দিকে। তিনি কেবল কঠিন ও অপ্রচলিত ফার্সি শব্দগুলোর অর্থ তুলে ধরার জন্য একটি সহজ-সরল অভিযান রচনার তাকিদ নিয়ে এই অভিধান রচনা করেন যাতে পাঠক বা লেখকের জন্য প্রান্তিক বা অগুরুত্বপূর্ণ ও সবার-জানা সাধারণ শব্দে ভারাক্রান্ত বড় ধরনের অভিধান ঘাটার ঝামেলা না থাকে। আওহাদির এই অভিধানে ব্যাখ্যা করা মোট শব্দ সংখ্যা পাঁচ হাজার ৮৫০। এসবই অপ্রচলিত ও কঠিন ফার্সি শব্দ। অতীত যুগের বা ফার্সি সাহিত্যের প্রাথমিক শতকগুলোর গদ্য ও পদ্যে এসব শব্দের ব্যবহার থাকলেও পরবর্তী যুগে এসবের বেশিরভাগই বিস্মৃত হয়ে গেছে। ভুলে-যাওয়ার এসব শব্দের মধ্যে রয়েছে কোনো কোনো ব্যক্তি, স্থান, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, শহর-নগর আর গাছপালার নাম ও কোনো কোনো পরিভাষা এবং যৌগিক শব্দ। এই অভিধানে অনেক আরবি, হিন্দি, তুর্কি ও প্রাচীন গ্রিসের শব্দ ও কিছু অস্পষ্ট শব্দও স্থান পেয়েছে। আওহাদির মতে এসবই ফার্সি শব্দ। এ অভিধান রচনায় আওহাদি কয়েকটি অভিধানকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে মুহাম্মদ হুসাইন বিন খালাফ তাবরিজির লেখা 'বোরহানে ক্ব'ত্বে-এ' বা 'অকাট্য প্রমাণ' নামক বিখ্যাত অভিধান। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/০১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।