আগস্ট ০১, ২০২০ ১৭:২৫ Asia/Dhaka

গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি তৃতীয় শতকের প্রখ্যাত ইরানি ঐতিহাসিক, পবিত্র কুরআনের মুফাস্‌সির ও দার্শনিক মুহাম্মদ বিন জারির ত্বাবারির জীবন ও অবদান সম্পর্কে কথা বলব।

খ্রিস্টীয় নবম শতকের প্রখ্যাত ইরানি মুফাসসির ও ইতিহাসবিদ আবু-জা'ফর মুহাম্মদ বিন জারির ত্বাবারির জন্ম, প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ সফর এবং তার মাজহাব ও মৃত্যু সম্পর্কে আমরা জেনেছি গত পর্বের আলোচনায়। ইতিহাস, তাফসির, ইসলামী আইন ও হাদিস শাস্ত্রে তার পারদর্শিতা সম্পর্কেও আমরা জেনেছি। ত্বাবারি অনেক ছাত্রও গড়ে তুলেছিলেন। ইবনে নাদিম তার আলফেহরেস্ত শীর্ষক বইয়ে ত্বাবারিকে ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও দাউদ বিন আলীর সমতুল্য ফকিহ্‌ বা ইসলামী আইনবিদ বলে উল্লেখ করেছেন। ত্বাবারির বইগুলোর মধ্যে তাফসির ও ইতিহাস বিষয়ের বই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ বইগুলো থেকে বোঝা যায় তিনি কত বিপুল সংখ্যক হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন। বিভিন্ন যুগে সংগ্রহ করা ত্বাবারির হাদিসগুলো তার প্রখর স্মৃতিশক্তির সাক্ষ্য বহন করছে।

তাহযিবুল আসার শীর্ষক বইয়ে ত্বাবারি নানা বর্ণনার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরেছেন এবং আইনি বিষয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্য বা স্বাধীনতাও অনেকাংশে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে তার মতামত শিয়া মুসলিম বিশেষজ্ঞদের মতামতের সঙ্গে মিলে যায়। আর এ কারণেই অনেকে ত্বাবারিকে শিয়া মুসলমান বলে মনে করতেন।

মুহাম্মদ বিন জারির ত্বাবারি আইনগত বা ফেকাহ্‌র দিক থেকে একটি মাজহাবেরও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। যদিও তার মাজহাবের কোনো অনুসারী বর্তমান যুগে আছে বলে শোনা যায় না, কিন্তু কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে ত্বাবারির মৃত্যুর পর দুই শতাব্দী পর্যন্ত সুন্নি আলেমদের মধ্যে তার মাজহাবটি বিকশিত হয়েছিল।

ত্বাবারি তার লেখালেখিতে  বহুল আলোচিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। তিনি যখন শুনলেন যে কেউ কেউ গ্বাদিরের হাদিসকে অস্বীকার করছে তখন তিনি এ বিষয়ে প্রামাণ্য হাদিসগুলো বর্ণনা করে এক বিশাল বই লেখেন। জাহাবিসহ আহলে সুন্নাত আল জামায়াতের অনেক ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিস বইটি দেখেছেন এবং তারা বইটিকে তথ্য-সমৃদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন।

মুহাম্মদ বিন জারির ত্বাবারি অনেক বই লিখেছিলেন। কিন্তু সেসবের মধ্যে খুবই কমই টিকে আছে আজ পর্যন্ত। ইয়াকুত হামাভি তার মু'জামুল আদাবা শীর্ষক বইয়ে ত্বাবারির কিছু বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। ত্বাবারির এসব বইয়ের মধ্যে রয়েছে, জামিয়াল বায়ান ফি তাফসিরুল কুরআন, আলফাসলু বাইনুল ক্বুরায়ি, তারিখ আল ত্বাবারি, রাসুলের সাহাবি ও তাবিয়িদের জীবনী নিয়ে লেখা কিতাব জিল আলমাজিল, ফকিহদের বিশ্বাস বা আকিদা নিয়ে মতভেদ সংক্রান্ত বই কিতাব ইখতিলাফুল ওলামাল আমসারি ফি আহকামিশ শারায়িল ইসলামি এবং তার আরো অনেক বই।

ত্বাবারির দুই বিখ্যাত বই হল পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক বই জামে'য়-আলবায়ান ও ইতিহাস বিষয়ক বই তারিখ আর রুসুল ওয়া আল মুলুক বা তারিখে ত্বাবারি। তারিখ আল ত্বাবারিতে রয়েছে পৃথকভাবে বিশ্বের ও ইসলামের ইতিহাস। সাধারণ বা বিশ্ব-ইতিহাস অংশে রয়েছে সৃষ্টির শুরু থেকে হিজরি ৩০২ বা খ্রিস্টীয় ৯১৫ সন পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস।

ত্বাবারির কিছু বক্তব্যের আলোকে মনে করা হয় তিনি পবিত্র কুরআনের তাফসির লেখার পর তথা ২৯০ হিজরির পর ইতিহাস বিষয়ক এ বইটি লিখেছিলেন যদিও এ বিষয়টি সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা বা দাবি করা যায় না। মুহাম্মদ বিন জারির ত্বাবারি ইতিহাস লেখার সময় একজন ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদ হিসেবে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আইনি বিষয়ের নানা মতের প্রভাবকে এড়াতে পারেননি বলে মনে করা হয়। ত্বাবারির ইতিহাস বইটি ইতিহাস বিষয়ের সবচেয়ে প্রাচীন বইগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু তার এ বইয়ে কালাম শাস্ত্রবিদ ও ধর্মীয় চিন্তাবিদদের নানা বিশ্বাসের প্রভাব রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। আর তাই তারা ত্বাবারিকে নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক বলে মনে করেন না।

মুহাম্মদ বিন জারির ত্বাবারি কবিতা ও সাহিত্যেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাই তারিখে ত্বাবারিকে অনেকেই সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বই বলে মনে করেন। ত্বাবারি বিশ্ব-ইতিহাস লিখেছেন সৃষ্টির সূচনা থেকে তার নিজের যুগ পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে। #

 পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/০১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।