ত্বাবারি গ্বাদিরের হাদিসে হযরত আলীর (আ)’র ফজিলত বর্ণনা করেন
খ্রিস্টীয় নবম শতকের প্রখ্যাত মুফাসসির ও ইতিহাসবিদ আবু-জা'ফর মুহাম্মদ বিন জারির ত্বাবারির জন্ম হয়েছিল বর্তমান উত্তর ইরানের অ'মল শহরে হিজরি ২২৪ সনে বা ৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে তথা ফার্সি ২১৮ সনে।
অসাধারণ প্রতিভাবান, জ্ঞান-পিপাসু, ও গবেষক ত্বাবারি নিজের প্রায় পুরো জীবন ব্যয় করেছেন জ্ঞান-অনুসন্ধানে এবং এমনকি জ্ঞান অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে ভেবে তিনি বিয়ে করেননি। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি কুরআন মুখস্থ করেন। ত্বাবারি ৮ বছর বয়স থেকেই নামাজের জামায়াতে ইমামতি করতেন। তিনি নয় বছর বয়সে হাদিস লেখা শুরু করেন। তার বাবাও এই সন্তানের পড়াশুনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। জন্মভূমিতেই জীবনের প্রথম ১২ বছর পর্যন্ত প্রাথমিক নানা শিক্ষা অর্জন করেন ত্বাবারি। এরপর তিনি সফরে বের হন এবং তেহরান-সংলগ্ন রেই শহরে আসেন।
সেযুগে রেই শহর ছিল ইরানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। জারির ত্বাবারি এখানে মুহাম্মদ বিন হামিদ রাজির কাছে হাদিস শাস্ত্র ও ইসলামের মহানবীর (সা) যুদ্ধগুলোর ইতিহাস সংক্রান্ত 'আল মাগ্বাজি' বইটি অধ্যয়ন করেন মুহাম্মদ বিন ইসহাক ওয়াকদির কাছে। তিনি মুহাম্মদ বিন হামিদ দৌলাবির কাছে অধ্যয়ন করেন ইতিহাস শাস্ত্র। ত্বাবারি আবু আবদুল্লাহ আহমাদ বিন হাম্বালের ক্লাসে যোগ দিতে রেই থেকে বাগদাদ যান। কিন্তু বাগদাদে যখন পৌঁছেন তখন জনাব হাম্বাল ইন্তেকাল করেন। ত্বাবারি বসরা ও কুফার মধ্যবর্তী শহরগুলোতে গিয়ে সে যুগের বড় বড় শিক্ষকদের কাছে হাদিস শাস্ত্র পড়েন। তার এই শিক্ষকদের মধ্যে আবু কারিব মুহাম্মদ বিন আলা হামেদানি ছিলেন অন্যতম। ত্বাবারি এরপর বাগদাদে ফিরে আসেন এবং একজন বড় ফকিহ হিসেবে ফতোয়া দিতে থাকেন।
বাগদাদ জ্ঞান-পিপাসু জারির ত্বাবারির জ্ঞান-পিপাসা যথেষ্ট মাত্রায় নিবৃত্ত করতে পারেনি। ফলে তিনি বাগদাদ থেকে সিরিয়া ও বৈরুত হয়ে ২৫৩ হিজরিতে মিশরে যান। এ সময় মিশরের শাসক ছিলেন আহমাদ বিন ত্বুলুন। ত্বাবারি তিন বছর মিশরে থাকেন। এ সময় তিনি ফুসত্বাত্ব শহরে কোনো কোনো বড় আলেম ও পণ্ডিতের কাছে জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি আনাস ইবনে মালিক, শাফেয়ী ও ইবনে ওয়াহাবের কাছ থেকে অনেক হাদিস লিখে রাখেন।
জারির ত্বাবারি বিদেশ সফরের সময় ইতিহাস ও ভূগোলের তথ্য-সমৃদ্ধ বহু ভ্রমণ-কাহিনী পড়েছিলেন। এ সময় তিনি জীবনী-লেখকদের অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাদের কাছ থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেন। মিশরে তিন বছর থাকার পর ত্বাবারি সিরিয়া হয়ে আবারও বাগদাদে আসেন। এর কিছুকাল পরই তিনি আবারও জন্মভূমি ইরানের ত্বাবারিস্তানের দিকে রওনা হন এবং হিজরি ২৯০ সনে অ’মল শহরে পৌঁছেন। কিন্তু পড়াশুনার জন্য অ'মলে থাকাটা তিনি সুবিধাজনক বলে মনে করেননি। ফলে আবারও ফিরে যান বাগদাদে এবং অধ্যয়ন অব্যাহত রাখেন।
ইসলামী আইন, হাদিস ও ইতিহাস বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের পড়াশুনা সম্পন্ন করার পর বাগদাদে বসেই ত্বাবারি ইতিহাস সংক্রান্ত বই ‘তারিখ আর রুসুল ওয়াল মুলুক’ লেখা শুরু করেন। এ বইটিই তারিখে ত্বাবারি নামে খ্যাতি অর্জন করে। তিনি প্রতিদিন ৪০ পাতা লিখতেন এবং প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এভাবে লেখালেখির মাধ্যমে তারিখে ত্বাবারি লেখা সম্পন্ন করেন। বলা হয় তিনি ২৩ বছর ধরে তার লেখা নানা নোট বিন্যস্ত করেন এবং বহু ভ্রমণকাহিনী সংগ্রহ করে মৃত্যুর কিছুকাল আগে এই ইতিহাস বইটি লেখা শেষ করতে সক্ষম হন। ত্বাবারি এ বইটি ছাড়াও ওয়াকফ্ বিষয়ে একটি বই লেখেন আব্বাসিয় খলিফা আলমুকতাফির অনুরোধে। এ বইয়ে তিনি সব মুসলিম আলেম ও ফকিহ্ বা আইনবিদদের মতামত তুলে ধরেন। এ ছাড়াও ত্বাবারি ইসলামের প্রাথমিক যুগের নেতৃবৃন্দের জীবনী বিষয়ক গ্রন্থ আল ফাজায়েল লিখেছিলেন। এ বইয়েই তিনি গ্বাদিরের হাদিস তুলে ধরেন আমিরুল মু’নিন হযরত আলীর (আ) ফজিলতের বর্ণনা হিসেবে। জারির ত্বাবারি পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক বইও লিখেছেন। নানা কাজের ফাঁকে সময় করে তিনি তাফসির লিখতেন। ‘জামে’ আলবায়ান আন তাভিলুর কুরআন’ শীর্ষক বইটি তাফসিরে ত্বাবারি হিসেবে খ্যাত।
জারির ত্বাবারি কখনও প্রলোভন ও হুমকির কাছে নত হননি। লেখালেখিতে নিরপেক্ষ থাকার জন্য তিনি কখনও কোনো রাষ্ট্রীয় বা সরকারি পদ গ্রহণ করেননি। অনেকেই তাকে কিছু বিদআত বা কুপ্রথা চালুকারী বলে অপবাদ দিয়েছিলেন। ত্বাবারি তার অনেক বিরুদ্ধচারীকে ক্ষমা করলেও কুপ্রথার প্রবর্তক হওয়ার অপবাদ দানকারীদের ক্ষমা করা সম্ভব নয় বলে মৃত্যুর আগে মন্তব্য করেছিলেন।
জারির ত্বাবারি কোন্ মাজহাবের অনুসারী ছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অবশ্য তিনি নিজেই একটি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ইবনে নাদিম এই মাজহাবের অনুসারী অনেক আইনবিদ ও চিন্তাবিদের নাম লিখে গেছেন তার বইয়ে। ত্বাবারি বাগদাদেই মারা যান ৩১০ হিজরির ২৬ শাওয়াল (শনিবার)। বাগদাদে তার বাসভবনেই তাকে দাফন করা হয়।
ইবনে আসিরের তারিখ আল কামিল থেকে জানা যায় ত্বাবারির মৃত্যুর পর তার দাফনে বাধা দিতে আসে হাম্বালি মাজহাবের অনুসারীদের উসকে-দেয়া একদল জনতা। তারা বলে যে ত্বাবারি একজন রাফেজি বা শিয়া। এর কারণ ছিল ত্বাবারি ফকিহ্ বা ইসলামী আইনবিদদের মতবিরোধ শীর্ষক এক বইয়ে বড় বড় ফকিহ্ ও মাজহাবের ইমামদের নাম এবং তাদের মতামত উল্লেখ করলেও আহমাদ বিন হাম্বলের নামই উল্লেখ করেননি। এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হল ত্বাবারি বলেছিলেন, আহমাদ বিন হাম্বল ফকিহ ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুহাদ্দিস বা হাদিস-বিশারদ। ফলে ইমাম হাম্বলের অনুসারী ও ছাত্ররা ক্ষিপ্ত হন। সে যুগে বাগদাদে হাম্বালিদের প্রধান্য থাকায় তারা ত্বাবারি সম্পর্কে যা-খুশি তাই বলতে ও করতে সক্ষম ছিল।
ত্বাবারির জীবনী সংক্রান্ত সবচেয়ে প্রাচীন অথচ সবচেয়ে বিশদ বর্ণনার বইটি হল ইবনে নাদিমের লেখা বই আলফেহরেস্ত। বইটি লেখা হয়েছিল ত্বাবারির মৃত্যুর ৬৭ বছর পর।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/০১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।