আগস্ট ০৫, ২০২০ ১৬:১৫ Asia/Dhaka

গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি তৃতীয় শতকের প্রখ্যাত ইরানি ঐতিহাসিক, পবিত্র কুরআনের মুফাস্‌সির ও দার্শনিক মুহাম্মাদ বিন জারির ত্বাবারির জীবন ও অবদান সম্পর্কে কথা বলব।

গত পর্বের আলোচনায় আমরা মুহাম্মাদ বিন জারির ত্বাবারির ইতিহাস বিষয়ক বই তারিখ আর রুসুল ওয়া আল মুলুক বা তারিখে ত্বাবারি সম্পর্কে কিছু ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছি। আমরা বলেছিলাম তারিখ আল ত্বাবারিতে রয়েছে পৃথকভাবে বিশ্বের ও ইসলামের ইতিহাস। সাধারণ বা বিশ্ব-ইতিহাস অংশে রয়েছে সৃষ্টির শুরু থেকে হিজরি ৩০২ বা খ্রিস্টিয় ৯১৫ সন পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস।

তারিখ আল ত্বাবারি পরবর্তীকালে বহু লেখকের জন্য তাদের বইয়ের তথ্য-উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ত্বাবারির এ বই বহু কারণে একটি অনন্য ইতিহাস-গ্রন্থ। বিস্তারিত বর্ণনা ও লেখার বিশেষ স্টাইল আর প্রাচীনত্ব বইটিকে করেছে অসাধারণ এবং গ্রহণযোগ্য।

মুসলিম বিশ্বে ইতিহাস লেখার পদ্ধতির ক্ষেত্রে দুটি প্রধান ধারা দেখা যায়। একটি ধারা হল বিষয়কেন্দ্রীক বর্ণনা ও অন্যটি হল সাল বা সন-কেন্দ্রিক বর্ণনা। ইসলামী যুগের প্রথম শতকগুলোতে মুসলিম বিশ্বে এ দুই ধারাই জোরালো ছিল।

আখবারি সম্প্রদায় নামে পরিচিত মুসলমানদের একটি গোষ্ঠী মহানবীর (সা) সুন্নাত ও হাদিসকে প্রাধান্য দেয়ার কথা বলত। তারা বলত ইতিহাস-শাস্ত্র তার ধর্মীয় দায়িত্বকে কখনও অনুমিত প্রস্তাবের ওপর ছেড়ে দিতে পারে না।  বরং ইতিহাস শাস্ত্রের উচিত সব সময় উপকারী বিদ্যা হিসেবে হাদিস ও তাফসির শাস্ত্রকে মদদ দেয়া। 

অন্য এক দল মনে করত ইতিহাস হচ্ছে অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা যাতে রয়েছে ভবিষ্যত মানুষের জন্য কল্যাণ। তাই ইতিহাসকে চিন্তা ও কৌশলের হাতিয়ার এবং বস্তুগত বিদ্যার অংশ হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। আর সেযুগের মুসলমানদের চিন্তা-চেতনা ও নানা গোষ্ঠীর সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ত্বাবারি তার নিজস্ব পদ্ধতিতে ইতিহাস লেখা শুরু করেন। তার এই পদ্ধতি পরবর্তী যুগে বেশিরভাগ ঐতিহাসিকের জন্য আদর্শে পরিণত হয়।

 ত্বাবারি তার ইতিহাস সংকলনের ক্ষেত্রে হিজরি তৃতীয় শতকের প্রথমার্ধের চেয়ে প্রথম শতকের প্রথমার্ধের লিখিত মাধ্যমগুলোকে বেশি ব্যবহার করেছেন। তিনি তার সমসাময়িক যুগের লেখালেখিকে ব্যবহার করেননি।

মরহুম ডক্টর সাদেক্ব অ'ইনেভান্দের মতে ত্বাবারির ইতিহাসের বেশিরভাগেরই উৎস হল ইরাক। কারণ তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় ইরাকেই কাটিয়েছেন। এ ছাড়াও সে যুগের মুসলিম বিশ্বে বাগদাদের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। উমাইয়া শাসনামলেও বাগদাদ ছিল বিদ্রোহ ও সংগ্রামের কেন্দ্র।

মুহাম্মাদ বিন জারির ত্বাবারি ইতিহাস লিখতে গিয়ে আবু মিখনাফ, আওয়ানেহ বিন হাকাম ও সাইফ বিন উমারের তথ্য বা লেখালেখিকে কাজে লাগিয়েছেন। এই তিনজন ছিলেন আখবারি চিন্তাধারায় বিশ্বাসী।

তারিখে ত্বাবারি ইতিহাস বই হলেও পাঠক তাতে সাহিত্যের স্বাদও পান। ত্বাবারির ভাষা অত্যন্ত জোরালো ও পরিপক্ব। ইতিহাস লিখতে গিয়ে তিনি বহু লেখকের লেখা ব্যবহার করেছেন। এইসব লেখকের সবাই যথেষ্ট মাত্রায় নির্ভরযোগ্য ছিলেন না বলে অনেক গবেষক মনে করেন। এ ধরনের একজন বর্ণনাকারী হলেন কাআব আল আহ্‌বার। ত্বাবারি এই বর্ণনাকারীর বর্ণনা থেকে বনি ইসরাইল ও আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও খৃষ্টানদের ব্যাপারে অনেক তথ্য নিয়েছেন। আর এতে ত্বাবারির ইতিহাসের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশেই হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। উল্লেখ্য, কাআব ছিলেন প্রথম জীবনে ইহুদি। পরে দৃশ্যত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। কাআব ইহুদিদের কিছু রূপকথা ইসলামের মধ্যে প্রচারের চেষ্টা করেছেন বলে ইবনে আব্বাস মন্তব্য করেছেন।

অবশ্য মুহাম্মাদ বিন জারির ত্বাবারি ওয়াক্বেদির মত নির্ভরযোগ্য অনেক ব্যক্তি থেকেও তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ফলে তার ইতিহাস বইটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য ইতিহাস বইগুলোর অন্যতম বলে বিবেচিত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ত্বাবারি ইতিহাস লিখতে গিয়ে ক্ষমতাসীন উমাইয়া শাসকদের পক্ষ নেননি। তিনি তার এ বই লিখেছিলেন হিজরি তৃতীয় শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তথা ২৫০ থেকে ৩০০ হিজরির মধ্যে। আর এ যুগে উমাইয়া শাসনযন্ত্র ছিল উত্তেজনা ও সহিংসতায় ভরপুর। ত্বাবারি নিজে ছিলেন একজন ইসলামী আইনবিদ এবং যেসব মাজহাব ও ফিক্বহি ধারা শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত ত্বাবারি ছিলেন তাদের থেকে ভিন্ন। ফলে বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ বা প্রায় সব ইতিহাসবিদ চরমপন্থা তথা কখনও অতি নরম ও কখনও অতি কঠোরতার পন্থা গ্রহণ করলেও ত্বাবারি নিজেকে এই সংক্রামক ব্যাধি থেকে মোটামুটি মুক্ত রাখতে পেরেছেন। ত্বাবারির ইতিহাস দুই ভাগে বিভক্ত: ইসলামের ও বিশ্বের ইতিহাস। বিশ্ব-ইতিহাস অংশটি রচনা করা হয়েছে ১৩ খণ্ডে। সাধারণ বা বিশ্ব-ইতিহাস অংশে রয়েছে সৃষ্টির শুরু থেকে হিজরি ৩০২ বা খ্রিস্টিয় ৯১৫ সন পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস। অর্থাৎ ঐতিহাসিক ত্বাবারি বিশ্ব-ইতিহাস লিখেছেন সৃষ্টির সূচনা থেকে তার নিজের যুগ পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/০৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।