ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (২৩ পর্ব): বায়তুল মুকাদ্দাস নামক অভিযান
গত আসরে আমরা আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর অবরোধ থেকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় আবাদান শহর মুক্ত করার অভিযানের পরিকল্পনা প্রণয়নে শহীদ হাসান বাকেরির ভূমিকা সম্পর্কে কথা বলেছি। আজ আমরা ইরাক-ইরান যুদ্ধের আরো কিছু অভিযানের পরিকল্পনা তৈরি ও সেগুলো বাস্তবায়নে এই মহান শহীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করব।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় আবাদান শহরটি আরভান্দ নদীর তীরে অবস্থিত এবং এদেশের বৃহত্তম তেল শোধনাগার এই শহরে অবস্থিত। ইরাকি বাহিনী খোররামশাহর দখলের ৩৪ দিন পর আবাদান শহর দখলের পরিকল্পনা করে। কিন্তু ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর দূরদর্শিতার ফলে আগ্রাসী বাহিনী তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। আবাদান অবরোধমুক্ত করার অভিযানে ইরানি যোদ্ধারা সফল হওয়ার ফলে শত্রুসেনারা এতদিন ইরানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নির্বিঘ্নে যে দখলদারিত্ব বজায় রেখেছিল তার অবসান হয়। যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো স্থানে ইরানি যোদ্ধারা হামলা চালাতে পারে- এমন আশঙ্কা ইরাকি বাহিনীকে পেয়ে বসে। এ ছাড়া, আবাদান মুক্ত করার অভিযানে ইরানি যোদ্ধাদের সামনে ইরাকি বাহিনীর দুর্বলতাগুলিও স্পষ্ট হয়ে যায়।
আবাদান অভিযানের সাফল্য নিয়ে ইরানের সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডাররা যুদ্ধের পরবর্তী কৌশল ঠিক করতে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। এ বৈঠক থেকে ১২টি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় এবং তা দেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সর্বোচ্চ পরিষদে পাঠানো হয়। যুদ্ধের ময়দানে কীভাবে সবচেয়ে কম ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে শত্রুপক্ষের সর্বোচ্চ ক্ষতি করা যায় এবং চূড়ান্তভাবে আগ্রাসী বাহিনীকে ইরানের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করা যায় সে সংক্রান্ত বেশ কিছু পরিকল্পনা প্রতিরক্ষা বিষয়ক সর্বোচ্চ পরিষদে পাঠানো হয়। এসব পরিকল্পনা প্রণয়নকারী সেনা কমান্ডারদের শীর্ষে ছিলেন শহীদ হাসান বাকেরি। তার পরিকল্পনায় ইরানি যোদ্ধারা আবাদান অবরোধ মুক্ত করার অভিযানে সফল হওয়ার পর হাসান বাকেরির ওপর শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাদের নির্ভরতা বেড়ে যায়। শহীদ বাকেরিও তার ওপর রাখা আস্থা রক্ষা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন।
ইসলামি বিপ্লবের পর নবগঠিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’কে একটি সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর মোকাবিলায় যুদ্ধে পারদর্শী করে গড়ে তুলতে হাসান বাকেরি অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করেন। এ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন আইআরসিজি’র পদস্থ কর্মকর্তা জেনারেল গোলামআলী রাশিদ। জেনারেল রাশিদ ইরাক-ইরান যুদ্ধের দিনগুলোতে শহীদ বাকেরির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং হাসান বাকেরির শাহাদাতের মুহূর্তে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। একটি সেনাদলের নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে শহীদ বাকেরি পারদর্শিতা সম্পর্কে জেনারেল রাশিদ বলেন, “যারা বাকেরিকে যুদ্ধের প্রথম মাসগুলোতে দেখেছেন তাদের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না যে, এক বছরের মাথায় সেই বাকেরি এতবড় একজন দক্ষ কমান্ডারে পরিণত হবেন। ”
জেনারেল রাশিদ আরো বলেন, “যুদ্ধের ময়দানে কয়েক মাসের মধ্যেই হাসান বাকেরি তার দক্ষতার পরিচয় দেন। ‘ফারমন্দে কুল্লে কোভা’ নামক অভিযানে কমান্ডার রহিম সাফাভি আহত হলে হাসান বাকেরি যুদ্ধরত অবস্থায় প্রথমবারে মতো কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই অভিযানে বাকেরির অসমসাহসী দক্ষতা ও পরিচালনায় আমাদের বিজয় হয়। ওই অভিযানে হাসান বাকেরি নিজের যোগ্যতা ও সামর্থের পরিচয় দেন। পরবর্তী চারটি ধারাবাহিক অভিযানে আরো বড় সাফল্য পান কমান্ডার হাসান বাকেরি।”
জেনারেল গোলামআলী রাশিদ এ সম্পর্কে আরো বলেন, “যুদ্ধের ময়দানে সেনা কমান্ডারদের আসল যোগ্যতার পরিচয় পাওয়া যায়। শহীদ হাসান বাকেরির যোগ্যতা ও প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশ হয়েছিল ইরাক-ইরান যুদ্ধের ময়দানে। যুদ্ধ করতে করতেই তিনি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগের শূন্যতা অনুভব করতেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সেসব বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতেন। আজ আইআরজিসি নামক ফুলে-ফলে সুশোভিত যে বাহিনী আমরা দেখতে পাই তাকে এত সুন্দর করে সাজানোর পেছনে শহীদ হাসান বাকেরির অবদান অনস্বীকার্য। এ ছাড়া, তার হাত ধরে যুদ্ধের সময় তৈরি হয়েছিল অনেক বড় যোদ্ধা ও কমান্ডার। এসব দক্ষ কমান্ডারদের মধ্যে শহীদ শফিযাদেহ’র নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।”
ইরাক-ইরান যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কমান্ডার ও পরবর্তীতে আইআরজিসি’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জেনারেল ইয়াহিয়া রহিম সাফাভির বর্ণনায় শহীদ বাকেরির প্রধান গুণ ছিল সৃজনশীলতা ও তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা। জেনারেল সাফাভি বলেন, হাসান বাকেরি শুধু একজন সেনা কমান্ডার ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন আট বছরের প্রতিরক্ষা যুদ্ধের একজন কৌশল-প্রণেতা। তিনি যেকোনো অভিযান শুরু করার আগে তার পরিকল্পনা প্রণয়ন করতেন এবং কল্পনার জগতে সে অভিযানে বিজয়ী হতেন। তারপর তিনি দলবলসহ আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। ফলে তৎকালীন যুগের সেরা ও অত্যাধুনিক অস্ত্রসস্ত্রে সমৃদ্ধ ইরাকি বাহিনী অপমানজনকভাবে ইরানি যোদ্ধাদের কাছে ধরাশায়ী হতো।
শহীদ হাসান বাকেরির আরেকটি পরিচয় হচ্ছে তিনি ছিলেন ইরানের বর্তমান সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ বাকেরির বড় ভাই। শহীদ বাকেরির মূল্যবান জীবনী নিয়ে বই লিখেছেন প্রখ্যাত লেখক ও ইতিহাসবিদ আলী মিনু। তিনি শহীদ হাসান বাকেরির ব্যক্তিত্ব মূল্যায়ন করেছেন এভাবে: সম্মুখযুদ্ধে পদাতিক, সাঁজোয়া ও আর্টিলারি বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের কাজে হাসান বাকেরির জুড়ি ছিল না। তিনি গোয়েন্দা বিভাগের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানের সুনিপূণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারতেন। সেইসঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে তার সাহসী ও অগ্রণী ভূমিকা ইরানি যোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করত। যুদ্ধের ময়দানে সেই কমান্ডার সফলতা অর্জন করতে পারেন যিনি শত্রু বাহিনীর কর্মকৌশল সম্পর্কে আগাম ধারণা লাভ করতে পারেন। ফলে তার পক্ষে নির্ধারিত ক্ষণে নির্ধারিত স্থানে শক্তিমত্তার সঙ্গে শত্রুবাহিনীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে পর্যুদস্ত করা সম্ভব হয়।
আলী মিনু তার লেখার এক জায়গায় এ সম্পর্কে জীবদ্দশায় শহীদ বাকেরির দেয়া বক্তব্যের উদ্ধৃতি তুলে ধরেন যেখানে হাসান বাকেরি বলেছেন: “আমি যুদ্ধে যোগ দেয়ার ছয় মাসের মধ্যেই অভিযান পরিচালনার কৌশলগুলো রপ্ত করে ফেলেছিলাম। এরইমধ্যে আবাদান অবরোধমুক্ত করার অভিযান শুরু হয়ে গেল। আমি উপলব্ধি করলাম, সেই ব্যক্তি একজন দক্ষ কমান্ডার হতে পারে যে কিনা প্রয়োজনে নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তবে কখন প্রয়োজন এবং কখন প্রয়োজন নেই- এই সিদ্ধান্ত নেয়াটা যুদ্ধের ময়দানে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। দক্ষ কমান্ডার যখনই প্রয়োজন অনুভব করবে তখনই দলবলসহ বিপজ্জনক অভিযান পরিচালনা করবে।” বাস্তবিক অর্থে শহীদ বাকেরি এরকম একজন কমান্ডার ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বায়তুল মুকাদ্দাস নামক অভিযানের কথা উল্লেখ করো যায়। ওই অভিযানে আইআরজিসি’র ‘নাস্র’ ঘাঁটির কমান্ডার হিসেবে শহীদ বাকেরি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ০৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।