কুরআনের আলো
সূরা সোয়াদ: আয়াত ৬৭-৭৪ (পর্ব-১২)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ৬৭ থেকে ৭৪ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৬৭ থেকে ৭০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ هُوَ نَبَأٌ عَظِيمٌ (67) أَنْتُمْ عَنْهُ مُعْرِضُونَ (68) مَا كَانَ لِيَ مِنْ عِلْمٍ بِالْمَلَإِ الْأَعْلَى إِذْ يَخْتَصِمُونَ (69) إِنْ يُوحَى إِلَيَّ إِلَّا أَنَّمَا أَنَا نَذِيرٌ مُبِينٌ (70)
“(হে রাসূল! আপনি) বলুন, এটি এক মহাসংবাদ,”(৩৮:৬৭)
“যা থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ।” (৩৮:৬৮)
“ঊর্ধ্ব জগৎ সম্পর্কে আমার কোন জ্ঞান (বা ধারণা) ছিল না যখন ফেরেশতারা (আদম সৃষ্টির ব্যাপারে) বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল।” (৩৮:৬৯)
“আমার কাছে এ ওহীই আসে যে, আমি একজন স্পষ্ট সতর্ককারী।” (৩৮:৭০)
বিগত আয়াতগুলোতে জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে আলোচনা করার পর এই চার আয়াতে বলা হচ্ছে: এগুলো হচ্ছে অদৃশ্যের খবর যা ওহি ছাড়া অন্য কোনো জ্ঞান দিয়ে জানা সম্ভব নয়। এই ওহী রাসূলের মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়ে পবিত্র কুরআনে লিখিত আকারে উম্মতের জন্য সংরক্ষিত হয়েছে। এ কারণে শুরুতেই বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে আল্লাহ তায়ালা বলছেন: আপনি মুশরিকদের বলে দিন, এই কুরআন হচ্ছে এক মহাসংবাদ যে ব্যাপারে তোমরা শুনতে বা চিন্তাভাবনা করতে মোটেও আগ্রহী নও। অথচ এসব কথা আমার নয় বরং আমার প্রতি ওহী হিসেবে অবতীর্ণ হয় যেখানে তোমাদেরকে পরকালের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। তোমাদের মতো আমিও অদৃশ্যের কোনো খবর জানি না। আমি শুধু সেটুকু জানতে পারি যেটুকু আমাকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হয়। যেমন আদমকে সৃষ্টি করার সময় ফেরেশতারা কীভাবে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল তা আল্লাহই আমাকে জানিয়েছেন।
এই চার আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- ধর্মীয় বিষয়গুলোর সত্যতা কারো গ্রহণ করা বা প্রত্যাখ্যানের ওপর নির্ভর করে না। পৃথিবীর সব মানুষ অস্বীকার করলেও কুরআনের একটি বাক্যও মিথ্যা হয়ে যাবে না।
২- নবী-রাসূলগণ নিজস্ব শক্তিতে অদৃশ্যের খবর জানেন না বা অদৃশ্যের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। তাঁদেরকে ওহীর মাধ্যমে যতটুকু জানানো হয় তারা শুধু ততটুকুই জানতে এবং তা উম্মতকে জানাতে পারেন।
সূরা সোয়াদের ৭১ ও ৭২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِنْ طِينٍ (71) فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ (72)
“যখন আপনার পালনকর্তা ফেরেশতাদের বললেন, আমি মাটি দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করব।” (৩৮:৭১)
“অতঃপর যখন আমি তাকে সুষম করব (ও তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গসহ সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করব) এবং তাতে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার সম্মুখে সেজদায় নত হয়ে যেয়ো।” (৩৮:৭২)
এই দুই আয়াতে ফেরেশতাদের সেই কথাবার্তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যার কথা আগের আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ আদিপিতা হযরত আদমকে সৃষ্টি করার আগে বিষয়টি ফেরেশতাদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন: আমি মাটি ও পানি দিয়ে এমন একটি জীব সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি যার সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আমি তার মধ্যে আমার রুহ ফুঁকে দেব। তোমরা তখন তাকে সিজদা দিয়ে তোমাদের চেয়ে তার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করবে।
মানুষের শরীর যে মাটি ও পানির তৈরি তা আমাদের কাছে স্পষ্ট। আমাদের সব খাবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদ থেকে আসে যে উদ্ভিদের উৎপত্তি মাটি থেকে এবং যা বেঁচে থাকে পানির সাহায্যে। কিন্তু মাটির তৈরি সেই দেহের ভেতরে আল্লাহর রুহ ফুঁকে দেয়ার ফলে তার মর্যাদা অনেক বেড়ে গেছে। তাকে আল্লাহ যে রুহ দিয়েছেন তা তার কাছে আমানত হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
অবশ্য রুহ ফুঁকে দেয়ার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর কাছ থেকে কোনো অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে মানবদেহে প্রবেশ করেছে। বরং এর অর্থ হচ্ছে, মানুষের রুহ ঊর্ধ্বজগতের বিষয়; ধুলির ধরার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। অন্য কথায় আল্লাহ তায়ালার যেসব গুণাবলী মানুষের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব কেবল সেগুলোর কিছু অংশ তাকে রুহের মাধ্যমে দান করা হয়েছে।
এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- ফেরেশতাদেরকে মানুষের আগে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু সৃষ্টিগত যোগ্যতার বিচারে মানুষের মর্যাদা ফেরেশতাদের উপরে।
২- মানুষকে দু’টি আলাদা অংশের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে। বস্তুগত অংশ এবং আত্মিক অংশ। আত্মিক দিক দিয়ে আল্লাহর রুহ ফুঁকে দেয়ার কারণে মানুষ ফেরেশতাদের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে।
৩- আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে সিজদা করা জায়েজ নয়। কিন্তু আল্লাহ যদি নিজে অন্য কাউকে সিজদা করতে বলেন তাহলে সেটা ব্যতিক্রম। ফেরেশতারা যেহেতু আল্লাহর আদেশে সিজদা করেছিল তাই তারা এখানে আদমের ইবাদত করেনি বরং আল্লাহরই ইবাদত করেছে।
এই সূরার ৭৩ ও ৭৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
فَسَجَدَ الْمَلَائِكَةُ كُلُّهُمْ أَجْمَعُونَ (73) إِلَّا إِبْلِيسَ اسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ (74)
“অতঃপর সমস্ত ফেরেশতাই একযোগে সেজদায় নত হল,” (৩৮:৭৩)
“কিন্তু ইবলীস (সিজদা করল না); সে অহংকার করল এবং কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” (৩৮:৭৪)
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ফেরেশতারা আল্লাহর অনুগত সৃষ্টি এবং তারা আল্লাহর কোনো আদেশ অমান্য করে না। এ কারণে আল্লাহর নির্দেশ পাওয়া মাত্র তারা একযোগে আদমকে সিজদা করেছে। কিন্তু একমাত্র ইবলিস অহংকার ও আত্মম্ভরিতা করার কারণে সিজদা করা থেকে বিরত থেকেছে। সে নিজেকে আদমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভেবেছে। এর ফলে সে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে যে উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছিল তা হারিয়েছে এবং খোদাদ্রোহী কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।
নিঃসন্দেহে ইবলিসও যদি ফেরেশতা হতো তাহলে সে আল্লাহর অবাধ্য হতো না। তার এই অবাধ্যতা প্রমাণ করে সে ফেরেশতা ছিল না। কুরআনের অন্যত্র তাকে জিন জাতির বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জিন জাতিকেও মানুষের মতো অবাধ্য হওয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। হাদিসে এসেছে, ইবলিস অনেক বেশি আল্লাহর ইবাদত করে পুরস্কারস্বরূপ ফেরেশতাদের কাতারে শামিল হয় যে কারণে আদমকে সিজদা করার নির্দেশ তার জন্যও কার্যকর হয়।
এই দুই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- অহংকার ও আত্মম্ভরিতা মানুষের পতন ডেকে আনে। এমনকি সারাজীবন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থেকে জীবনের শেষপ্রান্তে গিয়ে এই অহংকারের কারণে কাফের হিসেবে যে কোরো মৃত্যু হতে পারে।
২- ফেরেশতাদের সঙ্গ যেভাবে ইবলিসকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে পারেনি সেরকম শুধুমাত্র সৎসঙ্গ মানুষকে মুক্তি দিতে পারে না। জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে হলে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে এবং জান্নাতে যাওয়ার জন্য সার্বক্ষণিক চেষ্টা থাকতে হবে।#