প্রখ্যাত ইরানি দার্শনিক মুহাম্মাদ বিন জারির ত্বাবারি
আমরা গত পর্বের আলোচনায় জেনেছি ত্বাবারি অনেকটা হাদিস সংকলনের পদ্ধতিতে ইতিহাস লিখেছেন। হাদিসের সূত্র বর্ণনায় অনেক সময় বইয়ের নাম উল্লেখ করার দরকার হয় না, বরং বর্ণনাকারীদের নাম উল্লেখই যথেষ্ট। কারণ বইয়ে স্থান পাওয়ার আগেই অনেক হাদিস ও তার বর্ণনাকারীরাও নির্ভরযোগ্য হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে।
তাই ত্বাবারি নানা ঘটনার বর্ণনায় সূত্র হিসেবে কেবল বর্ণনাকারীদের নামই উল্লেখ করেছেন। কোনো কোনো ঘটনা বা বিষয়ে ত্বাবারি বিপুল সংখ্যক সূত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তির বিরোধী বর্ণনাও একজন নিরপেক্ষ প্রতিবেদকের মতই তিনি উল্লেখ করেছেন নিজস্ব কোনো মন্তব্য ছাড়াই। বর্ণনার সাক্ষ্য-প্রমাণ যদি সঠিক হয় তাহলে খোদ বর্ণনার যুক্তি দুর্বল না সবল তা নিয়ে মাথা ঘামাননি ত্বাবারি। এ ধরনের অনেক বর্ণনা ধর্ম ও নবী-রাসুলদের সম্পর্কিত। ত্বাবারির ইতিহাস বইয়ে তার নিজস্ব মতামত খুব কমই দেখা যায়। ত্বাবারি একজন নিষ্পাপ ব্যক্তিত্ব ছিলেন না বলে তার কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য ভুল হতেই পারে।
গবেষকদের দৃষ্টিতে ত্বাবারির ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ মানের বই। কিছু ভুল-ত্রুটি সত্ত্বেও এ বইয়ের কল্যাণে ইতিহাসের অনেক ঘটনার দলিল-প্রমাণ ও তথ্য-সূত্র রক্ষা পেয়েছে। ইরানের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়েও ত্বাবারি অনেক দুর্লভ তথ্য ও বাস্তবতা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন যা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য আরবি বইয়ে দেখা যায়নি। বেশিরভাগ গবেষকের মতেই ত্বাবারি ইতিহাস বর্ণনায় নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছেন। তিনি তার নিজের সমসাময়িক যুগের ঘটনা-প্রবাহ বর্ণনা করেননি। ত্বাবারি এ ধরনের ঘটনার বর্ণনা দিলে তা পরবর্তীতে অন্য অনেকের বর্ণনায় স্থান পেত এবং এসব তথ্য পরে বিকৃতির শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কার কারণেই হয়তো তিনি সেসব বর্ণনাই করেননি।
ত্বাবারির তারিখ আর রুসুল ওয়া আল মুলুক তথা তারিখে ত্বাবারি নামে খ্যাত ইতিহাসের বিশাল বইটি লেখার পর থেকেই তা পরবর্তীকালে ইসলামের ইতিহাস লেখকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উৎস বা আকর গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামের ইতিহাস শাস্ত্রকে পূর্ণতা দেয়ার ভিত্তি তৈরি করে গেছেন ত্বাবারি তার এ বইটি লিখে। হিজরি সপ্তম শতকে লেখা ইবনে আসিরের ইতিহাস বই আলকামিলের রচনা-পদ্ধতির ওপরও প্রভাব রেখেছে তারিখে ত্বাবারি। ইবনে আসির ৩০২ হিজরি পর্যন্ত সময়ের ইতিহাসের ঘটনা-প্রবাহ লিখেছেন ত্বাবারির ইতিহাসের আলোকেই। ত্বাবারি তার ইতিহাস বইয়ের ব্যাখ্যা বা টিকার বইও লিখেছেন। অনেক লেখক ত্বাবারির মূল বইটিকে সংক্ষিপ্ত করে লিখেছেন। ত্বাবারির পর মুহাম্মাদ বিন আবদুল মালিক হামেদানিসহ অনেকেই তারিখে ত্বাবারির আরও অনেক ব্যাখ্যামূলক বই লিখেছেন। হামেদানির বইটির নাম তাকমিলাতুত তারিখ আত্বত্বাবারি (تکملة تاریخ الطبری)।
আধুনিক যুগে নেদারল্যান্ডের প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ডি গোয়েজি ( Michael Jan de Goeje ) একদল প্রাচ্যবিদকে নিয়ে তারিখে ত্বাবারির বইটির সমালোচনামূলক সম্পাদনা করেছেন। এ জন্য ১৩ খণ্ডের এ বইটিতে যুক্ত হয়েছে আরও তিন খণ্ডের পরিশিষ্ট বা বাড়তি অংশ। ১৮৭৯ থেকে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে বইটি লন্ডন থেকে প্রকাশ করা হয়। লেখক সম্পর্কে ও বইটির নানা সংস্করণ সম্পর্কে ল্যাটিন ভাষায় একটি ভূমিকা দেয়া হয়েছে লন্ডনে ছাপানো ত্বাবারির এ বইয়ে। এ ছাড়াও প্রাচীন মুসলিম স্পেনের কর্ডোভার আরিব বিন সা'দ ত্বাবারির ইতিহাসের যে ব্যাখ্যামূলক বই লিখেছেন তারও কিছু অংশের অনুবাদ যুক্ত হয়েছে এতে। আরিবের ওই বইটির নাম সুল্লাতুত তারিখ বা ইতিহাসের সংযোগ-সূত্র।
ত্বাবারির ইতিহাস বই তারিখে ত্বাবারি মুহাম্মাদ আবুল ফাদ্ল্ ইব্রাহিমের উদ্যোগে কায়রো থেকে ছাপা হয় ১৯৬০ সনে দশ খণ্ডে। ১৯৬৭ সনে এ বইয়ে যুক্ত হয় সুল্লাতুত তারিখ বা ইতিহাসের সংযোগ-সূত্র ও মুহাম্মাদ বিন আবদুল মালিক হামেদানির তাকমিলাতুত তারিখ আত্বত্বাবারি এবং ত্বাবারির ইতিহাসের নিজের লেখা ব্যাখ্যা গ্রন্থটির নির্বাচিত কিছু অংশ।
তারিখে ত্বাবারির অনুবাদ হয়েছে বহু ভাষায়। ইংরেজি, ফরাসি, উর্দু ও ফার্সি ছাড়াও বইটি বাংলা ভাষায়ও হয়েছে অনূদিত। হিজরি চতুর্থ শতকে ফার্সি ভাষায় প্রথম তারিখে ত্বাবারির অনুবাদ করেছিলেন আবু আলী বালআমি। ত্বাবারির মৃত্যুর চল্লিশ বছর পর ৩৫২ হিজরিতে তিনিই প্রথম এ বই ফার্সি ভাষায় অনুবাদ শুরু করেন তৎকালীন সামানিয় ইরানি সুলতান আমির আবু সালেহ মানসুর বিন নুহ সামানির নির্দেশে সর্বসাধারণের ব্যবহারের লক্ষ্যে। আবু সালেহর নির্দেশে তাফসিরে ত্বাবারিও ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করা হয়। তারিখে ত্বাবারির ফার্সি অনুবাদ এত সহজ ও সাবলীল যে মুহাম্মাদ তাকি বাহারের ভাষায় সে যুগের একজন ইরানি বৃদ্ধাও তা সহজেই পড়তে পারতেন। অনুবাদের সময় বালআমি বেশ সংক্ষিপ্ত করায় মূল বইয়ের অগুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য-সূত্র, বর্ণনা, কবিতা ও ভাষণ বাদ পড়েছে তার অনুবাদে এবং এতে পাঠকরা মাত্রাতিরিক্ত বর্ণনার গভীরে হারিয়ে না গিয়ে মূল ঘটনা ও বক্তব্য সহজেই জানতে পারেন।
বালআমি অনেক ক্ষেত্রে ত্বাবারির বর্ণনার ধারাক্রম ও শিরোনাম বদলে দিয়েছেন সহজ ও নিখুঁত করার সুবিধার্থে। এমনকি তিনি কিছু নতুন সনদও যুক্ত করেছেন বর্ণনাকে আরও বেশি প্রামাণ্য ও স্পষ্ট করতে। ফলে ত্বাবারির ইতিহাস বইটি হয়েছে আগের চেয়ে পরিমার্জিত ও সংশোধিত। অনেকে বালআমির এ বইকে স্বতন্ত্র ও বালআমির নিজস্ব কৃতিত্ব বলে গুরুত্ব দিয়ে বইটিকে তারিখে বালআমিও বলে থাকেন। বালআমির বইটির হাতে লেখা বেশ কিছু সংস্করণ দেখা যায় এবং তাতে কিছু কিছু পার্থক্য ও গভীর বৈপরীত্যও দেখা যায়। এসবের মধ্যে সম্ভাব্য সবচেয়ে পুরনো সংস্করণটির তথা মধ্য মহররম ৫৮৬ হিজরিতে লেখা সংস্করণটির ফটোগ্রাফিক কপি প্রকাশ হয় ফার্সি ১৩৪৫ সনে তথা ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে। আধুনিক যুগে বালআমির অনুবাদ সম্পাদনা করেছেন মুহাম্মাদ রওশান।
সি ই বসওয়ার্থ, রোজেন্টাল ও মন্টগোমারি ওয়াটসহ একদল প্রাচ্যবিদ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানি অধ্যাপক এহসান ইয়ারশাতেরের তত্ত্বাবধানে সমগ্র তারিখে ত্বাবারির ইংরেজি অনুবাদ করেন মোট ৩৯ খণ্ডে। ব্যাখ্যাসহ বইটি প্রকাশ করা হয় ১৯৮৫ থেকে ২০০৭ সনে। গুটিনবার্গ ও দ্যুবো প্যারিসে চার খণ্ডে তারিখে ত্বাবারি অনুবাদ করেছেন ফরাসি ভাষায় ১৮৬৭ থেকে ১৮৭৪ সনে।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/১৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।