ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (৩৩ পর্ব): "বায়তুল মুকাদ্দাস" নামক অভিযান
আশা করছি আপনারা প্রত্যেকে ভালো আছেন। গত আসরে আমরা খোররামশাহর মুক্ত করার অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেছি। আজ আমরা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় এই বন্দরনগরী মুক্ত করার অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে আরো কথা বলব। একইসঙ্গে আজকের আলোচনার একটি বড় অংশ জুড়ে থাকবে খোররামশাহরের পতন ঠেকানোর জন্য ইরাকি বাহিনীর প্রস্তুতি।
আপনাদের হয়তো মনে আছে, খোররামশাহর মুক্ত করার অভিযানের নাম দেয়া হয়েছিল বায়তুল মুকাদ্দাস। ওই শহর ও এর আশপাশের বেশ কিছু এলাকা দখলদার ইরাকি বাহিনীর কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে ওই অভিযান চালানো হয়। খোররামশাহর থেকে শুরু করে ইরাক সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ প্রান্তর যুদ্ধের শুরুতেই ইরাকি বাহিনী দখল করে নিয়েছিল। ইরানের দক্ষিণের এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি নদী থাকায় ইরাকিদের বিরুদ্ধে বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযান পরিচালনা করা ইরানি যোদ্ধাদের জন্য কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুক্ত করার জন্য অভিযানটির পরিকল্পনা করা হয় তার উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব প্রান্তে ছিল যথাক্রমে ‘নেইসান’, ‘কারখে কুর’ ও ‘আরভান্দ’ নদী। পশ্চিম প্রান্তে ছিল ‘হুরাল হোভেইযে’ নামের বিশাল জলাশয়।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, যুদ্ধের শুরুর দিকে যখন ইরাকি বাহিনী ইরানের ভেতরে ঢুকে পড়ে তখন এই অঞ্চলে দখলদার সেনাদের অগ্রাভিযান রোধ করার জন্য ইরানি যোদ্ধার কিছু কৃত্রিম খাল বা পরিখা খনন করেছিলেন। ইরাকিরা খোররামশাহর ও এর আশপাশের এলাকা দখল করে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার জন্য ওইসব খালের পরিধি ও সংখ্যা আরো বাড়িয়েছিল। কাজেই ভারী অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে ইরাকিদের ওপর হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানি যোদ্ধারা অনেকটা বিপাকেই পড়ে যান। কারণ, এসব নদী ও খালের ঠিক ওপারেই আগ্রাসী সেনারা ট্যাংক ও কামানের মতো অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। কাজেই বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানের পরিকল্পনা প্রণয়নকারী কর্মকর্তাদেরকে এসব প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা জয় করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হয়।
অবশ্য যুদ্ধের দেড় বছরের মাথায় ইরানি যোদ্ধারা ততদিনে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা জয় করে শত্রুসেনাদের ঘায়েল করার কলাকৌশল রপ্ত করে ফেলেছেন। দেড় বছরের যুদ্ধে ইরান ও ইরাকের সৈন্যদের সামনে পরস্পরের দুর্বলতা ও শক্তিমত্তার জায়গাগুলো ভালোভাবে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বায়তুল মুকাদ্দাসের আগে তিনটি বড় অভিযান পরিচালনা করে ইরাকিদের হাত থেকে কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে ইরানি যোদ্ধাদের যেমন যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল তেমনি তাদের মনোবলও ছিল তুঙ্গে। ইরাকি বাহিনীর বিষয়টি জানা ছিল বলে তারাও খোররামশাহরের ওপর দখলদারিত্ব ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
এ সম্পর্কে বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানে অংশগ্রহণকারী ইরানি কমান্ডার মুয়িনিয়ান বলেন: “আরব-ইসরাইল যুদ্ধে সুয়েজ খাল রক্ষা করার জন্য ইসরাইল যে ধরনের রণপ্রস্তুতি নিয়েছিল আগ্রাসী ইরাকি সেনারা খোররামশাহর রক্ষা করতে ঠিক সেরকম একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। নদীর ওপার থেকে ইরানি যোদ্ধারা যাতে শহরে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সেজন্য ইরাকি সেনারা নদীর পাড়েই ভারী অস্ত্রসস্ত্র ও গোলাবারুদ স্থাপন করে।” ইরানি যোদ্ধারা বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযান পরিচালনার আগে ইরাকের সাদ্দাম বাহিনী ২০ মাস ধরে এই অঞ্চল দখল করে রেখেছিল। ফলে যুদ্ধ-প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ইরাকি বাহিনী যথেষ্ট সময় পেয়েছিল। সে সময়কে কাজে লাগিয়ে তারা শহরের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া এবং স্থলমাইন স্থাপন করে।
ইরাকি বাহিনী জানত, ইরান পরবর্তী অভিযান চালাবে খোররামশাহর ও এর আশপাশের অঞ্চল মুক্ত করার লক্ষ্যে। কিন্তু কবে ও কোন দিক দিয়ে এ অভিযান চালানো হবে সে সম্পর্কে কোনো ধারনা তাদের ছিল না। তাই তারা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে উপহার পাওয়া মিগ-২৫ জঙ্গিবিমান নিয়ে অনবরত আকাশে টহল দিচ্ছিল এবং আকাশ থেকে ছবি তুলে ইরানি যোদ্ধাদের অবস্থান শনাক্ত করছিল। তবে এই কাজে ইরাকি সেনারা জটিলতার সম্মুখিন হয়েছিল। পরবর্তীতে ইরাকি জেনারেলরা এ ব্যাপারে এই বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছিল যে, ইরানের সেনাবাহিনী প্রচলিত যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নিত বলে তারা সব সময় সামরিক পোশাকে সজ্জিত থাকত এবং এক স্থান থেকে আরেক স্থানে সেনা স্থানান্তরের সময়ও এর ব্যত্যয় ঘটতা না। কিন্তু বিপত্তিটা ছিল ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’কে নিয়ে।
কারণ, আইআরজিসি’র যোদ্ধারা সামরিক পরিবহনে না চড়ে বেসামরিক পরিবহন ব্যবহার করতেন। ইরাকি বাহিনী বিষয়টি উপলব্ধি করেছিল। এ কারণে, তারা ইরানি যোদ্ধাদের প্রতিহত করার জন্য তাদের পদাতিক ও সাঁজোয়া বিভাগকে ঢেলে সাজায়। তারা খোররামশহর রক্ষা করার জন্য ১০ ব্রিগেড সাঁজোয়া বাহিনী, ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের পাঁচ ব্রিগেড সেনা, ১৭ ব্রিগেড পদাতিক সৈন্য এবং সাত ব্যাটালিয়ন কমান্ডো প্রস্তুত করে। এসব সেনা ও তাদের সঙ্গে থাকা যুদ্ধাস্ত্র নির্দিষ্ট কোনো স্থানে মোতায়েন করে রাখা হয়নি বরং যেকোনো সময় ডাক এলে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অবস্থায় প্রস্তুত রাখা হয়। সার্বিকভাবে ইরাকের ৪০ হাজার সেনা, দুই হাজার ৭০০ ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান এবং ৫০০টি গোলা সম্ভাব্য ইরানি হামলার মোকাবিলায় প্রস্তুত করা হয়।
ইরাকের দখল করা খোরররামশাহর যাতে ইরানি যোদ্ধারা পুনরুদ্ধার করতে না পারেন সেজন্য ইরাকের তৎকালীন সাদ্দাম বাহিনীর তৃতীয় ডিভিশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। শহরের নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্ব ছিল এই ডিভিশনের হাতে। তারা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় এই বন্দরনগরী রক্ষা করার জন্য সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেছিল। শহরের পূর্ব ও উত্তর দিকে দিয়ে ইরানি যোদ্ধারা হামলা করতে পারে ধরে নিয়ে তারা এই দুই অংশে ১৮০ ডিগ্রি ব্যাসার্ধের প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করেছিল। এটি তৈরি করতে গিয়ে তারা খোররামশহরের বহু আবাসিক ঘরবাড়ি ধ্বংস করে ফেলে। আগ্রাসী ইরাকি সেনাাবাহিনীর তৃতীয় ডিভিশনকে যেকোনো মূল্যে এই শহর রক্ষা করার দায়িত্ব দেয়া হয়।
এরইমধ্যে আগ্রাসী ইরাকি সেনারা গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে খবর পেয়ে যায় যে, ইরানি যোদ্ধারা খোররামশাহর মুক্ত করার লক্ষ্যে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বড় ধরনের অভিযান চালাতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তারা শহরের সম্ভাব্য প্রবেশ পথগুলিতে আরো বেশ কিছু মাইন স্থাপন করে এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ বাড়িয়ে দেয়। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা জয় করার পাশাপাশি অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী ইরাকি বাহিনীকে পরাজিত করা যে ইরানি যোদ্ধাদের জন্য কতটা কষ্টসাধ্য ছিল তা উপলব্ধি করা হচ্ছে ইরাকি বাহিনীর এতসব প্রস্তুতি বর্ণনা করার মূল উদ্দেশ্য।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ০৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।