ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (৩৪ পর্ব): বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানের প্রথম দফা আক্রমণ
গত কয়েকটি আসরে আমরা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী খোররামশাহর মুক্ত করার অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেছি। আজ আমরা বায়তুল মুকাদ্দাস নামের এই অভিযান শুরু এবং এর প্রথম দফা আক্রমণ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব।
আপনাদের হয়তো মনে আছে, গত আসরে আমরা বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযান পরিচালনার এলাকাগুলোর ভৌগলিক অবস্থানসহ এগুলোর বিস্তারিত পরিচিতি তুলে ধরেছিলাম। এই এলাকাগুলোতে ইরাকি সেনাদের কাছে ছিল প্রায় দুই হাজার ৭০০ ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান, ৪০ হাজার পদাতিক সেনা ও ৫০০টি কামান। এর আগে ইরাকি বাহিনী আট মাসের ব্যবধানে ইরানি যোদ্ধাদের কাছে তিনটি বড় অভিযানে পরাজিত হয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। বাগদাদের সাদ্দাম সরকার এবং তার পশ্চিমা ও আরব মিত্ররা বুঝতে পেরেছিল ইরানিরা পরবর্তী অভিযান চালাবে খোররামশাহরকে মুক্ত করার জন্য। তাই ফাতহুল মুবিন অভিযানের পর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তিগুলোর পাশাপাশি আরব দেশগুলো ইরাককে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে দেয়।
এদিকে, ওই অঞ্চলে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী- আইআরজিসি’র ৮৫ থেকে ৯৫ ব্যাটেলিয়ান সৈন্য মোতায়েন ছিল। অভিযান শুরুর আগে ওই সংখ্যাকে ১১২ ব্যাটেলিয়ানে উন্নীত করা হয়। এ ছাড়া, ইরানের সেনাবাহিনীর ছিল ২৪ ব্যাটেলিয়ন সাঁজোয়া যোদ্ধা এবং ২১ ব্যাটেলিয়ান পদাতিক সেনা। কাজেই সামগ্রিকভাবে ওই অভিযানে ইরানের মোট ১৫৭ ব্যাটেলিয়ান সৈন্য অংশগ্রহণ করে।
এর অর্থ হচ্ছে, সেনা সংখ্যার দিক দিয়ে ইরান ইরাকের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকলেও অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের দিক দিয়ে ইরাকিরা ছিল অনেক অগ্রসর। সেইসঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তিগুলো বাগদাদকে সবরকম পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছিল। তৎকালীন শীতল যুদ্ধের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বের ৫৭টি দেশ ইরানবিরোধী যুদ্ধে ইরাককে সহযোগিতা করে।
একটি অভিযানে সাদ্দাম বাহিনীর দুই হাজার ৭০০ ট্যাংক ও ৫০০ কামানের উপস্থিতি প্রমাণ করে ইরাক ও ইরানের মধ্যে শক্তির বড় ধরনের তারতম্য ছিল। ইরাকিদের যখন সামরিক শক্তি ছিল এত বিশাল তখন অর্থনৈতিক, বাজিণ্যিক ও সামরিক দিক দিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানকে একরকম অচল করে রাখা হয়। অতি হাল্কা অস্ত্র সংগ্রহ করাও সে সময় ইরানি যোদ্ধাদের জন্য ছিল কঠিন।
ফাতহুল মোবিন অভিযানের পর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরাকের সাদ্দাম সরকারের হাতে দূরপাল্লার মিগ-২৫ যুদ্ধবিমান তুলে দেয়। এসব যুদ্ধবিমানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে গুলি করা সম্ভব ছিল না বলে এগুলো রণাঙ্গনে ইরানের বিপরীতে ইরাককে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তোলে। অন্যদিকে ইরানের শক্তিশালী দিক ছিল দেশরক্ষায় এদেশের যোদ্ধাদের আত্মত্যাগী মনোভাব এবং চূড়ান্তভাবে আগ্রাসী বাহিনীকে চমকে দেয়ার মানসিকতা। এই চমকে দেয়ার মানসিকতার কারণে বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানে আহওয়াজ-খোররামশাহর মহাসড়ক ধরে অগ্রসর না হয়ে কারুন নদী পার হওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। ইরাকিদের পক্ষে একথা ধারণা করাও কষ্টসাধ্য ছিল যে, ইরানি যোদ্ধারা খরস্রোতা এই নদী পেরিয়ে আসতে পারবে।
বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পর এটি পরিচালনার জন্য কুদস, ফাত্হ ও নাস্র নামের তিনটি কমান্ডিং পোস্ট স্থাপিত হয় এবং কারবালা নামের কেন্দ্রীয় কমান্ডিং পোস্ট অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। কুদস কমান্ডকে খোররামশাহরের উত্তর অংশে অবস্থিত 'কারখে' নদীর দিক দিয়ে ইরাকি বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর দায়িত্ব দেয়া হয়। এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল শত্রুসেনাদের ব্যস্ত রাখা যাতে অপর দুই কমান্ডিং পোস্টের যোদ্ধারা তুলনামূলক কম ঝামেলায় ও সহজে কারুন নদী পার হয়ে যেতে পারেন। এই অভিযানে কুদস কমান্ডের যোদ্ধাদেরকে ইরাকের পাঁচ নম্বর ম্যাকানিক্যাল ডিভিশন ও ছয় নম্বর সাঁজোয়া ডিভিশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হতো। কিন্তু ইরাকিরা শহর রক্ষার জন্য এত বেশি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছিল যে সেগুলো অতিক্রম করে শত্রুসেনা পর্যন্ত পৌঁছানো সহজ কাজ ছিল না।
ফাত্হ কমান্ডকে কারুন নদী পেরিয়ে ওই নদী থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আহওয়াজ-খোররামশাহর মহাসড়কে অবস্থান নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়। তবে নদী পেরিয়ে মহাসড়ক পর্যন্ত পৌঁছার মাঝখানে যেকোনো সময় যদি ইরাকিরা টের পেয়ে পাল্টা হামলা চালায় তবে ইরানি যোদ্ধাদের মারাত্মক ক্ষতি হবে। এ কারণে তাদেরকে এক রাতেই নদী পার হয়ে ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মহাসড়কের পেছনে অবস্থান করার নির্দেশ দেয়া হয়। অন্যদিক ফাত্হ কমান্ড কারুন নদী পার হয়ে সরাসরি শত্রুসেনাদের ওপর আক্রমণ চালানোর দায়িত্ব পায়। এই অভিযানের সাফল্য নির্ভর করছিল ইরানি যোদ্ধারা শত্রু সেনাদেরকে কতখানি চমকে দিতে পারে এবং ইরানি সমরবিদরা ইরাকি বাহিনীর শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা চিহ্নিত করার কাজে কতটা সফলতা অর্জন করেন তার ওপর।
১৯৮২ সালের ৩০ এপ্রিল রাত ১২টা ৩০ মিনিটে এই অভিযানের প্রথম পর্ব শুরু হয়। এর ২৫ মিনিট পর কারবালা কমান্ডিং পোস্টের ২৫তম ব্রিগেড ইরাকি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং ভোররাত ৩টা নাগাদ পূর্বপরিকল্পিত সবগুলো স্থানে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। কুদস কমান্ডের যোদ্ধারা পাঁচটি স্থানে শত্রুসেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ফাত্হ কমান্ডের যোদ্ধারা নদী পার হয়েই দ্রুত আহওয়াজ-খোররামশাহর মহাসড়কের দিকে এগিয়ে যান। এ ছাড়া, নাস্র কমান্ডের যোদ্ধারা অভিযানের শুরুতেই সাদ্দাম বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। তবে মহাসড়কের পাশে বিশাল এলাকা জুড়ে কাদাপানি থাকায় এবং ইরাকের আট নম্বর ম্যাকানিক্যাল ডিভিশন ও ছয় নম্বর সাঁজোয়ো ডিভিশন সতর্ক থাকায় ইরানি যোদ্ধারা নির্ধারিত গতিতে সামনে অগ্রসর হতে ব্যর্থ হন; ফলে সে রাতের যুদ্ধ সকাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই ফ্রন্টে ইরানের সশস্ত্র যোদ্ধারা বিকাল ৩টা পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান এবং একটা পর্যায়ে কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হন।
বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ও নাস্র ক্যাম্পের কমান্ডার হাসান বাকেরি পরবর্তীতে এই অভিযানের প্রথম ধাপ সম্পর্কে বলেন: “সেই রাতের অভিযানের শুরুর দিকেই ইরানি যোদ্ধারা আহওয়াজ-খোররামশাহর মহাসড়কে ইরাকি বাহিনীর তিন নম্বর পদাতিক ডিভিশনের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে তাদের প্রায় অর্ধেক সমরাস্ত্র ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হন।” বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানের প্রথম দিনগুলোর কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ইরাকি কর্নেল রেজা আল-বসরি পরবর্তীতে বলেন: “ইরানিরা অতি অল্প সময়ের মধ্যে কারুন নদী পার হয়ে যায় এবং এ ঘটনা আমাদের সেনাদের মনে মারাত্মক ভীতি ছড়িয়ে দেয়। ” এভাবে টানা ছয়দিনের সংঘর্ষের মাধ্যমে ইরানি যোদ্ধারা তাদের প্রথম দফা অভিযান সাফল্যের সঙ্গে শেষ করেন এবং এর পরপরই খোররামশাহরে দ্বিতীয় পর্যায়ের হামলা শুরু হয়।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ১১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।