সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজের চোখে লকডাউন এবং বাস্তবতা
লকডাউন চলছে। লকডাউন এবং বাস্তবতা নিয়ে সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ বললেন, মানুষের কাছে এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় বিষয় তার খেয়ে পরে বাঁচার চেষ্টা। ফলে সাধারণ মানুষ কিভাবে লকডাউন করবে? তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারন করেছে। ফলে এ থেকে বাঁচার জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে।
রেডিও তেহরান: জনাব,মোস্তফা ফিরোজ,বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য নতুন করে লকডাউন দেয়া হয়েছে। যদিও লকডাউন বাস্তবায়নের চিত্র নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। লকডাউন দেয়ার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ হয়েছে। তো করোনাভাইরাস মোকাবেলার ক্ষেত্রে এই লকডাউন কতটা কার্যকর ব্যবস্থা?
মোস্তফা ফিরোজ: দেখুন, লকডাউনে বাংলাদেশের অর্থনীতি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত বছর একইসময়ে যে লকডাউন দেয়া হয়েছিল তারফলে যে ক্ষতি মানুষের হয়েছিল সেই ক্ষতি এখনও মানুষ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তার উপর আবারও লকডাউনের খড়গ।
এবার করোনায় মৃত্যু ও সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেশি গতবছরের তুলনায়। তারপরও লকডাউনের ফলে সাধারণ মানুষের দুরবস্থার বিষয়ে তেমন কোনো প্রণোদনা বা বিশেষ ব্যবস্থা গতবার থাকলেও সেভাবে পাইনি আর এবার তো না! সাধারণ মানুষের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা না করে লকডাউনের এই ব্যবস্থা তা মানতে পারছে না। সাধারণ মানুষের ভেতর এ নিয়ে একটা প্রতিবাদ আছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিরোধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এই লকডাউন সরকার ও প্রশাসনের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ। লকডাউন পুরোপুরি কার্যকর হওয়া কিংবা মানুষ কিভাবে লকডাউন সারভাইভ করবে? কারণ মানুষের কাছে এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় বিষয় তার খেয়ে পরে বাঁচার চেষ্টা।
রেডিও তেহরান: করোনা মোকাবেলায় সরকারের দেয়া লকডাউনের প্রস্তুতি নিয়ে কথা হচ্ছে। আপনার আলোচনায় বললেন, লকডাউন মান্য করার ক্ষেত্রে মানুষের জীবন-জীবিকার একটি বড় বিষয় আছে। তো সেক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তুতিটা যথাযথ ছিল না- আপনি কি এমনটাই বলতে চেয়েছেন?
মোস্তফা ফিরোজ: দেখুন, লকডাউন মানে হচ্ছে লকডাউন। উন্নত দেশগুলোতে যে লকডাউন হচ্ছে সেখানে তার দেশের মানুষের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করেই তা করা হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের ক্ষুধার্ত মানুষকে কিভাবে আপনি লকডাউনে পাঠাবেন। সে মানবে কেন? তার কখন করোনা হবে না হবে তা নিয়ে ভয় আছে শঙ্কা আছে কিন্তু তাকে তো তিনবেলা খেতে হবে। সেই খাওয়া পরার ব্যবস্থা কে করবে, কিভাবে করবে? তার কি কোনো ব্যবস্থা করা হয়েছে? এ দেশের সাধারণ মানুষ দিন আনে দিন খায় তারপক্ষে তো একদিন কাজ না করলে খাওয়ার সামর্থ নেই।
এখানে একটি প্রশ্ন, সরকার হঠাৎ করে সরকার বাংলাদেশের ৫০ বছর পুর্তি উপলক্ষে হঠাৎ করে যে সবকিছু ছেড়ে দিল সেটা তো ঠিক হয়নি। যদি সরকার ঐ সময়টাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে থাকত তাহলে হয়তো এতটা কঠিন অবস্থায় পড়ত হতো না। তাছাড়া গত এক বছরের মধ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করার যে বিষয়টি ছিল সেটিও তো করা হয়নি। সেই কাজটি না করে যদি এখন মানুষকে লকডাউনে যেতে বলা হয় তাহলে মানুষ যাবে কিভাবে?
রেডিও তেহরান: আপনি আইসিইউ সংকটের কথা বললেন। কিন্তু আমরা মিডিয়ার একটি প্রতিবেদনে দেখেছি- একদিকে সংকট অন্যদিকে সরকারি গোডাউনে তিন শধাতিক আইসিইউ বেড পড়ে আছে। কেউ নিচ্ছে না, টেকনিশেয়ান নেই। তো স্বাস্থ্যখাতের অবস্থাপনা আছে বলে অনেক মনে করছেন? তো স্বাস্থ্যখাতের চিত্রটি আসলে কেমন?
মোস্তফা ফিরোজ: স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি খুবই করুণ।সত্যি কথা বলতে কি আমাদের যে আইসিইউ সক্ষমতা কিন্তু বাড়ানো হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাসাপাতালগুলোর যে করোনা ইউনিট ছিল তাও কমিয়ে দিয়েছে। যেখানে বৃদ্ধির দরকার ছিল সেখানে কমানো হয়েছে। যেমন ধরুন বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছিল যে তার করোনা আয়োজন বিশাল। তাছাড়া মহাখালিতে। কিন্তু বাস্তবে তো সেই আয়োজনগুলো তো আমরা দেখলাম। না। আমরা ভারতে দেখছিলাম ক্রমেই করোনা বেড়ে যাচ্ছে। তার সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের কয়েক মাসের একটা সুযোগ ছিল কিন্তু সেই সুযোগকে তো আমরা কাজে লাগালাম না।ফলে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ ঠেকানোর মতো তেমন কোনো প্রস্তুতি আমরা নিলাম না। উপরন্তু- বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরপূর্তি উপলক্ষে আমরা বেশ কিছু রিলাক্স করলাম যাতে সুবর্ণজয়ন্তী ভালোভাবে উদযাপন করা যায়। আর সেটিই এখনকার যে করোনার নাজুক পরিস্থিতি সেই বড় বিপর্যয় ডেকে আনল।
রেডিও তেহরান: জনাব মোস্তফা ফিরোজ, বাংলাদেশে লকডাউনের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষা ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক বছরের বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। কতটা যৌক্তিক সরকারের এই সিদ্ধান্ত?
মোস্তফা ফিরোজ: করোনার এখন যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তাতে এখন তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব নয়। এখন খোলার চিন্তা করাটা হবে বিপজ্জনক। অন্যদিকে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম যে চলছে সেটিও যে খুব বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে সেকথাও বলা যাবে না। বলা চলে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা বলা চলে বসেই আছে। এটি অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এরফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে যে মানসিক সমস্যা হচ্ছে, তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের ধারবাহিকতা যে ব্যহত হলো সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়াটা খুব কঠিন হবে। এ সময়ে ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলাটা যৌক্তিক হবে না। এসময় বন্ধ রাখাটা ঠিক আছে কিন্তু কত দিন!নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাকৃতিকভাবে যে সুযোগটা তৈরি হয়েছিল সেই সুযোগটা তো আমরা কার্যকর করলাম না। এই ক্ষতিটা ব্যাপক। আমি জানি না কবে নাগাদ করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় যে ওয়েভ চলছে তা শেষ হবে তা কিন্তু বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে দেশের শিক্ষার্থী, অভিভাবক-সবাই গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
রেডিও তেহরান: কবে আমরা করোনা মুক্ত হবো-সেকথা আপনি বলছিলেন। আসলে করোনা এখন আমাদের স্বাভাবিক জীবনের একটি অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। করোনা নিয়েই হয়তো আমাদের বাঁচতে হবে। দরকার সচেতনাবোধ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। তো সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে আপনার পরামর্শ কী হবে?
মোস্তফা ফিরোজ: দেখুন, আমি মনে করি, রাতারাতি আমরা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র পাল্টাতে পারব না। তবে এটিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে। ফলে প্রথম কাজ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, মাস্ক পরা এবং করোনা প্রতিরোধের যে চিকিৎসা ব্যবস্থা-তার সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা। স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মেনে চলা। হালছাড়া আমাদের জন্য বিপজ্জনক হবে। তাহলে কিন্তু আমরা আবার তৃতীয় ওয়েভের মধ্যে চলে যাব। সুতরাং এই খারাপ সঙ্গীটাকে দূরে রাখার জন্য প্রতিটি নাগরিকের যেমন দায়িত্ব তেমনি একইভাবে সরকার প্রশাসন সবারই একযোগে কাজ করতে হবে। এছাড়া মুক্তির কোনো উপায় নেই।
রেডিও তেহরান: তো জনাব মোস্তফা ফিরোজ- বাংলাদেশে করোনা সক্রমণ বৃদ্ধিতে লকডাউন, জনজীবনে তার প্রভাব,সরকারের প্রস্তুতি-এসব বিষয় নিয়ে রেডিও তেহরানের সাথে কথা বলার জন্য আবারও অনেক অনেক ধন্যবাদ।
মোস্তফা ফিরোজ: জ্বি আপনাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৭
- বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।