পারস্য উপসাগরে আবারও ফিরছে বুড়ো উপনিবেশবাদী ব্রিটেন
পারস্য উপসাগরে ব্রিটেনের সামরিক উপস্থিতির এক নতুন অধ্যায় শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি বাহরাইনের রাজধানী মানামায় পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের বৈঠকে এ ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে।
প্রায় ২০০ বছর ধরে পারস্য উপসাগরে ঔপনিবেশিক উপস্থিতি বজায় রেখেছিল ব্রিটেন। নানা জাতি ও দেশের মধ্যে ‘ঝগড়া বাধিয়ে শাসন করা’বা ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ ছিল তার এই উপস্থিতির প্রধান কূটকৌশল। ধূর্ত ও রাজতান্ত্রিক ব্রিটিশরা বিশ্বে সবচেয়ে বড় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল মূলত এই কূটকৌশলেই। ১৯২২ সালে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে অধিকৃত নানা উপনিবেশসহ ব্রিটিশ শাসনাধীন অঞ্চলের মোট আয়তন ছিল তিন কোটি ত্রিশ লক্ষ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এবং ব্রিটিশ শাসনাধীন জনসংখ্যা ৪৫ কোটি ছাড়িয়ে যায়। বলা হত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্যাস্ত হয় না।
অন্য কথায় বিংশ শতকের প্রথম দিকেও প্রায় চারশো বছরের পুরনো ব্রিটিশ রাজতান্ত্রিক সরকার তার দখলে রেখেছিল পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ ভূ-ভাগ। সে সময় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশই ছিল ব্রিটেনের প্রজা। খ্রিস্ট ধর্ম-প্রচার ও বাণিজ্যের নামে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা বিশ্বের নানা অঞ্চলে ঢুকতো। এরপর স্থানীয় নানা দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ বাঁধিয়ে একদল ক্ষমতালোভী ও ক্রীড়নক রাজনীতিবিদকে সমর্থন দিয়ে তাদেরকে ক্ষমতায় বসাত ব্রিটিশরা। আর অবশেষে সামান্য বল প্রয়োগ করে ওই অঞ্চলটিকে ব্রিটেনের উপনিবেশে পরিণত করত ব্রিটেন। উপনিবেশবাদী ব্রিটিশরা অন্য অনেক অঞ্চলের মত এভাবেই ছলে-বলে-কৌশলে পশ্চিম এশিয়ায়ও তার সাম্রাজ্য ও কর্তৃত্বের বিস্তার ঘটায়। ব্রিটেন অধিকৃত অঞ্চলের নানা সম্পদ ও কাঁচামাল লুট করে বা পানির দরে কিনে নিয়ে নিজস্ব শিল্পের বিকাশ ঘটায়। উপনিবেশবাদী ব্রিটিশরা গোটা ইরানের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারলেও গত ২০০ বছরে ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও অখণ্ডতার ওপর আঘাত হানার জন্য সব সময়ই সচেষ্ট ছিল।
একজন গবেষক লিখেছেন, ‘ব্রিটিশরা গত ১৫০ বছরে ইরান সম্পর্কে ৫ হাজারেরও বেশি বই লিখেছে যেসব বইয়ে ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও অখণ্ডতা-বিরোধী নানা পরামর্শ দেয়া হয়েছে ব্রিটেন সরকারকে।’ কিন্তু এই একবিংশ শতকেও উপনিবেশবাদী বুড়ো শিয়াল ব্রিটেন উপনিবেশবাদী নানা পুরনো লক্ষ্য হাসিলের চেষ্টা করছে নতুন নানা শ্লোগান বা অজুহাতের মোড়কে। বিভেদ উস্কে দিয়ে শাসন করার সেই পুরনো নীতিই বজায় রেখেছে ব্রিটেন। আর এ লক্ষ্যেই ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে সম্প্রতি এই অভিযোগ তুলেছেন যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হস্তক্ষেপ করছে।
সম্প্রতি দৈনিক রাই আল ইয়াওম এক বিশ্লেষণে লিখেছে:
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য রাখা থেকে বোঝা যায় ব্রিটেন এ অঞ্চলে আবারও তার পুরনো ভূমিকা ও অবস্থানে ফিরতে চায়। এ অঞ্চলের আরব দেশগুলোতে পশ্চিমা সরকারগুলোর অস্ত্র বিক্রির প্রতিযোগিতায় নামাও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এইসব বক্তব্যের অন্যতম বড় লক্ষ্য। তবে এবার ব্রিটেন পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা পিজিসিসিকে বাণিজ্য ও সামরিক ক্ষেত্রসহ সব ক্ষেত্রেই নিজের কৌশলগত সহযোগী করতে চায় বলে দৈনিকটি মন্তব্য করেছে।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এমন সময় পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের কথা বলেছেন যখন লন্ডন পারস্য উপসাগরে তার সামরিক উপস্থিতি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বাইরাইনে এক নতুন নৌ-ঘাঁটি নির্মাণ করছে। এ অঞ্চলে আবারও স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলা ব্রিটেনের এইসব তৎপরতার একটি বড় লক্ষ্য। সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা ছাড়াও ব্রিটেন এ অঞ্চলের বিশাল অস্ত্র বাজারের সিংহভাগ দখলে আগ্রহী। বিশেষ করে সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি ব্রিটেনের এক বড় টার্গেট।
পাশ্চাত্যের অনেক অস্ত্র কোম্পানির প্রধান ক্রেতা হল তেল-সমৃদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সরকারগুলো। নিরাপত্তাহীনতার জুজুর ভয় দেখিয়ে আরব রাজ-বাদশাহ ও শেখদের গদি-রক্ষার গ্যারান্টি হিসেবে তাদের কাছে বিপুল অস্ত্র বিক্রি করছে পশ্চিমা দেশগুলো। একই অজুহাত দেখিয়ে তারা এ অঞ্চলে নানা সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। আর এইসব ঘাঁটির নির্মাণ-খরচসহ আনুষঙ্গিক সব খরচ বহন করছে স্থানীয় রাজা-বাদশাহদের সরকার। এ অঞ্চলের নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থানগুলোও নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় ব্রিটিশ এবং মার্কিন সরকারসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো।
বিশ্বের তেল-রিজার্ভের দুই তৃতীয়াংশ ইরান, ইরাক ও সৌদি আরবে অবস্থিত হওয়ায় এ অঞ্চলের প্রতি সব সময়ই ছিল ব্রিটিশ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লোলুপ দৃষ্টি। এ অঞ্চল থেকে ব্রিটেনের বিদায়ের পর মার্কিন সরকার অনেকটা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই গোটা মধ্যপ্রাচ্যে কর্তৃত্ব বিস্তার ও ঘাঁটি গড়ার পদক্ষেপ নেয়। মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর এ অঞ্চলের নিরাপত্তা হয়ে পড়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
মার্কিন সরকারের নতুন মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনার বড় টার্গেট ছিল দখলদার ইসরাইলের নিরাপত্তা জোরদার এবং রাজা-বাদশাহ শাসিত দেশগুলোর সম্পদ লুণ্ঠন অব্যাহত রাখা। ওবামাও নানা শ্লোগানের আড়ালে একই নীতি বজায় রেখেছেন। তবে নির্বাচিত নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ অঞ্চলের বিষয়ে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারেন বলে অনেকেই মনে করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের নানা অঞ্চলে বিভিন্ন অজুহাতে হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখা মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকারের এক পুরনো কৌশল। এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলা হয়েছে ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী নীতির অনুসরণেই। ইরানের ব্যাপারে মার্কিন নীতিও সেই ব্রিটিশ নীতিরই ধারাবাহিকতার প্রকাশ। আসলে ব্রিটেন ও মার্কিন সরকার মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-জুজুর ভয় দেখিয়ে একদিকে যেমন তাদের অস্ত্র-ব্যবসাকে রমরমা করতে চায় তেমনি এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সামরিক শক্তি হিসেবে ইসলামী ইরানের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা ও প্রভাবকেও চ্যালেঞ্জ করতে চায় তারা। কারণ, ইরান এ অঞ্চলে বিজাতীয় শক্তির উপস্থিতির বিরোধী এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক জোট গড়তে চায়। #