পার্বত্য ৩ জেলায় হামের প্রকোপ: ১০ শিশুর মৃত্যু, সেবা দিচ্ছে সেনাবাহিনী
https://parstoday.ir/bn/news/bangladesh-i78796-পার্বত্য_৩_জেলায়_হামের_প্রকোপ_১০_শিশুর_মৃত্যু_সেবা_দিচ্ছে_সেনাবাহিনী
রোগচক্রের পঞ্জিকায় বাংলাদেশে এখন হামের মৌসুম। হাম প্রতিরোধে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে গত মার্চ মাসে সারাদেশে প্রচারাভিযান শুরু করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতায় সে পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে গেছে।
(last modified 2026-04-10T03:25:29+00:00 )
এপ্রিল ০৪, ২০২০ ১০:১০ Asia/Dhaka
  • পাহাড়ে বেড়েছে হামের প্রকোপ
    পাহাড়ে বেড়েছে হামের প্রকোপ

রোগচক্রের পঞ্জিকায় বাংলাদেশে এখন হামের মৌসুম। হাম প্রতিরোধে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে গত মার্চ মাসে সারাদেশে প্রচারাভিযান শুরু করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতায় সে পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে গেছে।

এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বেড়েই চলছে শিশু রোগীর সংখ্যা।

রাঙামাটি থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম সাজেক ইউনিয়নে হাম ও হামসদৃশ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। জেলার সবচেয়ে বড় ও দুর্গম এই ইউনিয়নের ১০ থেকে ১২টি গ্রামে এ রোগে আড়াই শতাধিক শিশু আক্রান্ত হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারির পর থেকে এ পর্যন্ত এ রোগে ১০টি শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে শুধু সাজেকেই মৃত্যু হয়েছে আট শিশুর।

সাজেকের স্থানীয় জনপ্রতিধিনিধিরা জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সাজেক ইউনিয়নের তুইচুই মৌজার দুর্গম অরুণপাড়ার শিশুরা হামের মতো এক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। প্রথমে স্বাস্থ্যবিভাগ রোগটিকে ‘অজ্ঞাত রোগ’ বললেও পরে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করে এটিকে হাম বলে নিশ্চিত করা হয়। তবে এর উপসর্গ হামের মতো হলেও কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

রাঙামাটি জেলা সিভিল সার্জন ডা. বিপাশ খীসা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত সাজেকের বিভিন্ন গ্রামের ১৭০ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সাজেকের শিয়ালদহ এলাকায় উদ্দেশ্যে আমাদের আরেকটি মেডিকেল টিম রওয়ানা দিয়েছে। তারা শুক্রবার সেখানে পৌঁছে কাজ শুরু করেছে।

এদিকে, গত ২৮ মার্চ খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের ত্রিপুরা অধ্যুষিত প্রত্যন্ত গ্রাম রথিচন্দ্র কার্বারি পাড়ায় হামসদৃশ রোগে আক্রান্ত হয়ে ধ্বনিকা ত্রিপুরা নামের ৯ বছরের এক শিশু মারা যায়। এ ঘটনার পর রথিচন্দ্র ত্রিপুরা পাড়ার আরও ২০ শিশুকে দীঘিনালা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তারা বর্তমানে সুস্থ আছে।

এছাড়া গত ১৩ মার্চ বান্দরবানের লামা উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পুরাতন লাইল্যা মুরুং পাড়ায় হাম আক্রান্ত হয়ে দুতিয়া মুরুং (৭) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। এ ঘটনার ওই পাড়ার আক্রান্ত আরও ৩৫ শিশুকে ইউপি চেয়ারম্যানের সহায়তায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। তারা সবাইও সুস্থ আছে।

স্থানীয়রা জানায়, হাম আক্রান্ত এলাকাগুলো এতো দূর্গম যে যেখান থেকে সংকটাপন্ন রোগীদের উপজেলা সদরের নিয়ে আসা বা সেখানে চিকিৎসক পৌঁছাতে দারুণ সমস্যা হচ্ছে।

এ অবস্থায় পাহাড়ের হাম আক্রান্ত এলাকায় চিকিৎসা সেবার কাজ শুরু করেছে  বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অধীনে খাগড়াছড়ি রিজিয়নের সেনারা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ও পায়ে হাঁটা দুর্গম পথ অতিক্রম করে  হাম আক্রান্ত বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের দূর্গম এলাকায় আক্রান্তদের সেবাদান শুরু করেছে। সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে মেডিকেল ক্যাম্প  স্থাপন করে চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করছে। হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত অনেক রোগীকে হেলিকপ্টার যোগে চট্টগ্রামে নিয়ে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়ৈছেন, হাম আক্রান্ত এলাকার মানুষ অপেক্ষাকৃত দরিদ্র  এবং এ বছর জুম চাষের ফসলহানি হবার কারণে অভাব তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে। এসব পরিবারের শিশুরা দারুন পুষ্টিহীনতার শিকার। যার কারণে প্রতিবছর এ মৌসুমে হামসহ নানা অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত হয় পাহাড়ি শিশুরা।

সারাদেশের মানুষ যখন করোনা ভাইরাস আতঙ্কে ঘরবন্দী তখন খাগড়াছড়ি রিজিয়নের আওতাধীন বাঘাইহাট জোনের সেনা সদস্যরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পায়ে হেঁটে পুষ্টিহীনতায় শিকার এসব শিশুদের জন্য নিয়ে যাচ্ছে পুষ্টিকর খাবার ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি।

হাম আক্রান্ত এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাঘাইহাট জোনের সেনাবাহিনী সদস্যরা সুপেয় পানি, পুষ্টিকর খাবার, ত্রাণ সামগ্রী ও চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে স্থানীয়দের পাশে থাকবে জানিয়েছেন সাজেকের জনপ্রতিনিধিরা।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বর্তমানে সাজেকের কয়েকটি মৌজার ১০-১২টি গ্রামের শিশুরা হামসদৃশ এই রোগে আক্রান্ত আছে। এ পর্যন্ত মারা গেছে আট শিশু। হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে আরও আট শিশুকে।

স্থানীয় কার্বারিরা (গ্রামপ্রধান) জানিয়েছেন, দুর্গম গ্রামের মানুষরা এখনো কুসংস্কারে বিশ্বাসী হওয়ায় চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা না করিয়ে শিশুদের স্থানীয় বৈদ্য, পূজা ও লতাগুল্মের মাধ্যমে চিকিৎসা দিচ্ছেন। এতে করে শিশুরা আক্রান্তের সময় দীর্ঘ হওয়ায় সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে। আবার অনেক অভিভাবক এক ধরনের ভীতির কারণে শিশুকে টিকা দেন না, এমনকি স্যালাইন পর্যন্ত খাওয়াতে চান না। ফলে এসব শিশুরা কোনো রোগে আক্রান্ত হলে তাদের সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কার্বারিরা আরও বলছেন, দুর্গম সাজেকের একেকটি এলাকা থেকে একেকটি এলাকায় পৌঁছাতে দুই-তিন পর্যন্ত সময়ও লাগে। পাড়ি দিয়ে হয় গহীন অরণ্যও। এতে অল্প সময়ের মধ্যে মেডিকেল টিম সব এলাকায় পৌঁছাতে পারে না। তাছাড়া অধিকাংশ মানুষ শিশুদের লতাপাতা ও বৈদ্যালি চিকিৎসা দেন।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নেলশন চাকমা বলেন, ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সবশেষ উদলছড়ি গ্রামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এখনো সাজেকের উদোলছড়ি, নিউঢাংনাং, কমলাপুর, শিবপাড়া, সাতনাম্বার পাড়া, বড়ইতলী, ডেবাছড়ি, কজইছড়ি, ভূয়াছড়ি, লাম্বাবাক ও উজানছড়িতে বিচ্ছিন্নভাবে আড়াই শতাধিক শিশু হামসদৃশ রোগে আক্রান্ত আছে। এসব গ্রামে শিশুদের পুষ্টিকর খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

ইউপি চেয়ারম্যান নেলশন জানান, গত বুধবার সাজেকের সাতনাম্বার পাড়া থেকে একই পরিবারের দুই শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের খাগড়াছড়ি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এর আগে লংতিয়ান পাড়ার একই পরিবারের ভাই ও অরুণপাড়ার এক শিশুকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। যতটুকু জেনেছি, তারা সবাই সুস্থ আছে। বর্তমানে সেনাবাহিনী ও বিজিবির মেডিকেল টিম ছাড়াও স্বাস্থ্য বিভাগের দুইটি মেডিকেল টিমের একটি উদোলছড়ি ও আরেকটি মাচালং এলাকা থেকে ভূয়াছড়িসহ আশপাশের এলাকায় চিকিৎসা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, দুর্গম গ্রামের মানুষ হওয়ায় এসব এলাকার মানুষজন বেশিরভাই কুসংস্কারে বিশ্বাসী। অনেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অমান্য করে গ্রামে বৈদ্যের চিকিৎসা দিচ্ছেন। এর কারণেই শিশুরা সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

সম্প্রতি সাজেকের মাচালং ও সাতনাম্বার এলাকাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে হাম বা হামের মতো এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিয়ে এসেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. বিষ্ণুপদ দেবনাথ। তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি এলাকায় হামের মতো রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিয়ে এসেছি। প্রত্যন্ত গ্রামের এসব মানুষের মধ্যে অনেক বেশি টিকাভীতি রয়েছে। এরা গুরুতর অসুস্থ শিশুদেরও স্যালাইন দিতে চান না। স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসার চেয়ে তারা স্থানীয় বৈদ্যের চিকিৎসায় আগ্রহী। ওইসব এলাকার শিশুরা অপুষ্টিতেই ভুগছে, বেশিরভাগ শিশুই খুব শুকনো।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইফতেখার আহমেদ জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে আনুমানিক ১৬০ জন শিশু এই রোগে আক্রান্ত। তিনি বলেন, আমরা ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম যে শিশুদের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠিয়েছি, ল্যাবরেটরি রিপোর্টে তাদের হাম রোগ শনাক্ত হয়েছে। এটি সংক্রামক রোগ হওয়ায় একে আমরা হাম বলেই ধারণা করছি। তবে ১৬০ শিশু ছাড়াও অনেকেই শিশু নিউমোনিয়া ও সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত রয়েছে। তাদের লক্ষণগুলোকে হাম বলা যাচ্ছে না। বর্তমানে সাজেকে আমাদের দুইটি মেডিকেল টিম কাজ করছে।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আহসান হাবিব জিতু বলেন, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত সাজেক ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে হামের মতো একটি রোগে ১৭৪টি শিশু আক্রান্ত হয়েছে। আমি গত মঙ্গলবার সাজেকের তিন গ্রাম সাতনাম্বার পাড়া, শিব পাড়া ও বড়ইতলী এলাকা পরিদর্শন করেছি। এদিন স্থানীয়দের মাঝে পুষ্টিকর খাবার বিতরণ করছি। এছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল টিমও কাজ করছে।#

পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।