করোনা সংক্রমণের চতুর্থ ধাপে বাংলাদেশ: পিপিই সংকট নিয়ে উদ্বেগ
-
পিপিই পরিহিত দুই স্বাস্থ্যকর্মী (ফাইল ফটো)
বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের ২৫ শতাংশ এবং নার্সদের ৬০ শতাংশ এখনও পিপিই (পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুপমেন্ট) পাননি। আর যেসব স্বাস্থ্যকর্মী পিপিই পেয়েছেন তারাও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে ‘সন্দিহান’।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ-এর এক যৌথ জরিপে এমন চিত্র ফুটে উঠেছে। গতকাল (শনিবার) এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে ওই জরিপ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
পিপিই নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোভাব ও চিকিৎসা নিয়ে তাদের পরিস্থিতি তুলে ধরে গবেষক বুশরা জেরিন ইসলাম বলেন, করোনা চিকিৎসায় অগ্রভাগে থাকা ৭৫ ভাগ চিকিৎসক এবং ৪০ শতাংশ নার্স পিপিই পেয়েছেন। কিন্তু রেইনকোটের মতো যে পিপিই দেওয়া হয়েছে, সেটা আদৌ কাজ করে কি না তা নিয়ে সন্দিহান তারা।
আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ হচ্ছে, এগুলো একবার ব্যবহার করে ধ্বংস করতে হবে। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের সেগুলো পুনরায় ব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে। এসব বিষয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে বড় রকমের মানসিক চাপ তৈরি করছে।
চিকিৎসকরা পিপিই পরিধান, ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন নিজ উদ্যোগে জেনে নিলেও নার্সদের অধিকাংশ এই সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ পাননি বলে গবেষণায় ধরা পড়েছে।
এ সময় বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক মুস্তাক চৌধুরী বলেন, “ভাইরাস মোকাবেলায় প্রস্তুতির জন্য অনেক সময় পেলেও আমরা প্রস্তুতি নিতে পারিনি। আমরা সময় নষ্ট করেছি। সেটা মসজিদ বন্ধে কয়েক সপ্তাহ সময় নেওয়া এবং গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিয়ে বাজে অবস্থা থেকে বোঝা যায়।”
চিকিৎসক সমাজের উদ্বেগ
চিকিৎসকদের অধিকার রক্ষায় গঠিত সংগঠন ‘ফাউন্ডেশন অব ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটিস’- এর মহাসচিব শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন রেডিও তেহরানকে জানান, আগে থেকে সতর্ক করা সত্ত্বেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সেবা কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না করার কারণে তারা যে আক্রান্ত হয়েছেন এটাকে অবশ্যই ক্রিমিনাল নেগলিজেন্স বা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি বিধান করতে হবে।
ইতোমধ্যে একজন চিকিৎসক এ ব্যাপারে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি একটি উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে। আদালতের ছুটি শেষে আইনি প্রতিকার চাওয়া হবে। এর আগে গতমাসে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ -এর সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মুরশিদ ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীদের সুরক্ষা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। আদালত সে প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এ সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেবার নির্দেশনা প্রদান করেছে।
এদিকে, বাংলাদেশ সরকারের কোভিড-১৯ গাইডলাইনের অন্যতম প্রণেতা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, ডা. মো. রোবেদ আমিন বলেছেন, আমরা করোনা সংক্রমণের চতুর্থ ধাপে পৌঁছে গিয়েছি। মার্চের শেষ থেকে আমরা যে বিপদঘণ্টা বাজিয়ে চলছিলাম, সরকার মাত্র গত সপ্তাহে সারা দেশ ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার মাধ্যমে তারই স্বীকৃতি দিয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেছেন, করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে সিলেটে একজন কর্তব্যরত চিকিৎসকের সুচিকিৎসা না পাওয়া এবং তার মৃত্যু স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থাপনার উদাহরণ। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
ডাক্তার রোবেদ আমিন পিপিই’র গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, আন্তর্জাতিক রেগুলেশনে স্পষ্ট লেখা আছে, পিপিই না পেলে একজন স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোর অধিকার রাখেন। এন-৯৫ যে ডাক্তারের থাকবে না, তিনি আইসিইউতে ঢুকলে তো অন্যদেরও ক্ষতি করে দেবেন।
তিনি বলেন, তাছাড়া, পিপিই পেলেই হলো না, এর উপযুক্ততার টেস্ট আছে। সেটা নিশ্চিত না করলে সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করলে হবে না। প্রকৃত এন-৯৫ না থাকলে আইসিইউ, সিসিইউ, এসডিইউ চলবে না। আবার ফ্রন্টলাইনার বলতে ডাক্তার নন, নার্স, আয়া, ক্লিনার, প্লাম্বার, অ্যাম্বুলেন্স কর্মী, এমনকি কবর খননকারীও আছেন। তাঁদের সবার পিপিই লাগবে।
পিপিই বিতর্কের মাঝে মামলার হুমকি
এদিকে, করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের এন-৯৫ মাস্ক এর মোড়কে সাধারণ মাস্ক সরবরাহের ঘটনা প্রসঙ্গে বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তার ছেলে, স্বাস্থ্য সেবা সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জড়িয়ে ‘মানহানিকর সংবাদ’ প্রকাশিত হচ্ছে অভিযোগ করে মামলা করার হুমকি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার-সিএমএসডি কর্তৃপক্ষ।
আজ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় সিএমএসডি এবং মাস্ক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেএমআই গ্রুপ আলাদা ডিসপ্লে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে তাদের ‘ভুল’ স্বীকার করেছে।
সিএমএসডি পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহিদ উল্লাহ’র নামে প্রকাশিত এ বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশীয় চিকিৎসা সামগ্রী প্রম্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জে এম আই গ্রুপ ‘ভুলক্রমে’ এন-৯৫ মুদ্রিত মোড়কে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করেছে।
পৃথক বিজ্ঞাপনে জেএমআইগ্রুপও স্বীকার করেছে, জরুরি সরবরাহকালীন সময়ে ২০ হাজার ৬০০ পিস ফেস মাস্ক ‘ভুলবশত’ এন-৯৫ কার্টুনে সরবরাহ করা হয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পিপিই নীতিমালা অনুযায়ী রোগীর নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য এন-৯৫ মাস্ক পরা জরুরি। কিন্তু মার্চের শেষ ভাগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে যেসব মাস্ক পাঠানো হয়, তার প্যাকেটে ‘এন-৯৫’ লেখা থাকলেও ভেতরে ছিল সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক।
এ মাসের গোড়ার দিকে রাজধনীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে এন-৯৫ মুদ্রিত প্যাকেটে সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক সরবরাহ করায় হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী ওই মাস্কের মান সম্পর্কে জানতে চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে পরিচালককে চিঠি দেন। তারপরই বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসক সমাজের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/১৯