করোনার সংক্রমণরোধে বাংলাদেশ সরকারের ১৮ দফা নির্দেশনা, চিকিৎসকের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পুনরায় বেড়ে যাওয়ায় পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি সেবা–প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব অফিস ও কারখানা বন্ধ রাখা, উপাসনালয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানা, জনসমাগম নিষিদ্ধ ঘোষণাসহ আরও কিছু প্রস্তাবনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রয়োজনে উচ্চ সংক্রমিত এলাকাতে লকডাউন করার প্রস্তাবও রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবনায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জরুরি সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য সব অফিস–শিল্পকারখানা বন্ধ রাখতে হবে। জরুরি সেবা–প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩৩ ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে উপস্থিত হবেন এবং অসুস্থ, গর্ভবতী ও ৫৫ বছরের উর্ধ্ব ব্যক্তিদের বাড়ি থেকে অফিস নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়সহ যে কোনো উপলক্ষে জনসমাগম নিষিদ্ধ করা এবং কমিউনিটি সেন্টার বা কনভেনশন সেন্টারে বিয়ে, জন্মদিন, সভা, সেমিনার ইত্যাদি অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ন্যূনতম উপস্থিতির কথা প্রস্তাবনায় রাখা হয়েছে। যেমন, মসজিদে প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাজের সময় সর্বোচ্চ ৫ জন এবং জুমার নামাজের সময় ১০ জনের বেশি ব্যক্তিকে হাজির হতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
গণপরিবহনের ক্ষেত্রে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ধারণ ক্ষমতার অর্ধেকের বেশি যাত্রী পরিবহন না করা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতে আন্তঃজেলা পরিবহন বন্ধ রাখা। অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী উড়োজাহাজেও ধারণক্ষমতার অর্ধেকের বেশি যাত্রী পরিবহন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি আকাশপথ, জল ও স্থলপথেও সব আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল সীমিত করা এবং দেশে ফেরার পর যাত্রীদের ১৪ দিন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম স্থান বাজার। সে জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়, বিক্রয়ের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত স্থান বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে শপিংমল বন্ধ, পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া খুব প্রয়োজনে বাইরে গেলে সবসময় যথাযথভাবে মাস্ক পরতে বলা হয়েছে। অন্যথায় আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রস্তাবে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাত ৮টার পর বাড়ির বাইরে বের হতে নিষেধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মীরজাদী সেব্রিনা এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আগামী দিনগুলোতে কী করণীয়, সে বিষয়ে অধিদপ্তর থেকে গত ২৫ মার্চ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটির পরামর্শক্রমে এসব পালনীয় বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভাইরনমেন্ট-এর সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম রেডিও তেহরানকে জানান, ক’দিন আগেই তারা একটি বিবৃতি প্রকাশ করে সরকারকে সাত দফা পরামর্শ দিয়েছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এ ব্যাপারে সামাজিক সংগঠন ও জনপ্রতিনিধিদের সোচ্চার হতে হবে।
বরিশালে করোনার সংক্রমণ, দ্রুত বাড়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেশি আক্রান্ত এলাকায় প্রয়োজনে লক ডাউন কার্যকর করা হোক এবং সব ধরনের সামাজিক সাংসাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান স্থগিত রাখা হোক। তিনি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেবার অনুরোধ করেন।
এদিকে, দেশের দক্ষিণাঞ্চল বরিশাল বিভাগে গত এক সপ্তাহে করোনার সংক্রমণ বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই এই বিভাগে করোনার সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। ১৩ থেকে ১৯ মার্চ এই সাত দিনে বিভাগের ছয় জেলায় আক্রান্ত হয় মাত্র ৭৭ জন। কিন্তু ২০ থেকে ২৬ মার্চ পরের সাত দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন গুণ, অর্থাৎ ২২৮ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষার পাশাপাশি করোনার লক্ষণ দেখা দিলেও এখন অনেকেই আর পরীক্ষা করান না। এই অবস্থায় তাঁরা বাইরে যাচ্ছেন, স্বাভাবিকভাবে সবার সঙ্গে মিশছেন; এমনকি আইসোলেশনে থাকছেন না। এটা আরও ভয়াবহ প্রবণতা। এ বিষয়ে সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন। না হলে সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল গণমাধ্যমকে বলেন, এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে আগের মতোই চলাফেরা করা, মাস্ক না পরা ও করোনার লক্ষণ থাকলেও পরীক্ষা না করিয়ে ঘুরে বেড়ানো। মূল কথা, উদাসীনতা এর পেছনে দায়ী। এ ব্যাপারে জনসাধারণকে নানাভাবে সচেতন করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু তা উপেক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে সামনে বড় বিপদ হতে পারে।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।