সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ:
ইরাকের হাশদ আল-শাবির বিরুদ্ধে আল-জোলানির অবস্থানের উদ্দেশ্য কী?
-
সিরিয়ার শাসক আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি
পার্সটুডে: সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি এক বক্তব্যে দাবি করেছেন যে, ইরাক-সিরিয়া সীমান্ত এলাকায় ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্স (পি এম ইউ) বা হাশদ আশ-শাবি বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
আল-জোলানি, যিনি একসময় একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন, ২০২৪ সালে পশ্চিমা দেশগুলো, ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী এবং অঞ্চলের কয়েকটি দেশের সমর্থনে বাশার আল-আসাদের সরকারকে উৎখাত করে সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করেন। এখন যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সিরিয়ার এই শাসক দাবি করছেন যে, ইরাক-সিরিয়া সীমান্তে হাশদ আশ-শাবির উপস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন উদ্বেগ প্রকাশের পেছনে আল-জোলানির উদ্দেশ্য কী?
বাস্তবতা হলো, সিরিয়ার জন্য আল-জোলানির এই উদ্বেগের কোনো ভিত্তি নেই। অন্য কথায়, তিনি প্রকৃতপক্ষে সিরিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। যদি সত্যিই তিনি দেশের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হতেন, তাহলে ইরাক-সিরিয়া সীমান্তে হাশদ আশ-শাবির উপস্থিতিকে স্বাগত জানাতেন। কারণ হাশদ আশ-শাবি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে এবং সন্ত্রাসী হুমকির মোকাবিলায় তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে আল-জোলানি মূলত নিজের জন্য আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জনের চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে, সিরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রচেষ্টায় থাকা আল-জোলানি ইরাকের প্রতিরোধ বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজেকে পশ্চিমা স্বার্থের অনুকূল ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। প্রকৃতপক্ষে, এই মন্তব্যকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো, হাশদ আশ-শাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আল-জোলানি প্রতিরোধ শক্তিকে একটি আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন। যদিও এ ধরনের মন্তব্য সিরিয়ার এই নেতার অতীত বা তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারবে না, তবুও তিনি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকারী একটি শক্তিকে হুমকি হিসেবে দেখিয়ে নিজের ভাবমূর্তি বদলানোর চেষ্টা করছেন। এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশেষ করে ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করার জন্য বাগদাদের ওপর ওয়াশিংটনের চাপের প্রেক্ষাপটে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল-জোলানি এই মন্তব্য এমন সময় করেছেন, যখন তিনি ইহুদিবাদী ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্য কথায়, তিনি এমন অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে ইসরায়েলকে সিরিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি করতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছেন। অথচ বাশার আল-আসাদের সরকারের পতনের পর ইসরায়েল সিরিয়ার কিছু ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে এবং সেসব এলাকা থেকে সরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখায়নি।
এছাড়া উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইরাকের প্রতিরোধ বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আল-জোলানি সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ সহিংসতা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে জনমতকে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করছেন। তার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সিরিয়ায় অন্তত ১৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এখনো কোনো নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়নি এবং তিনি নিজের মতাদর্শের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার গঠন করেছেন।
সবশেষে বলা যায়, আল-জোলানির মতো ব্যক্তিদের এ ধরনের বক্তব্য ইরাকের প্রতিরোধ বাহিনীর জন্য কোনো গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারবে না। বরং এটিকে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, তার বিতর্কিত অতীত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে দেওয়া একটি দায় এড়ানোর রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। #
পার্সটুডে/এমএএইচ/২৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।