যুদ্ধ-সংঘাতের সময়ে সুফিবাদের ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান
https://parstoday.ir/bn/news/event-i162906-যুদ্ধ_সংঘাতের_সময়ে_সুফিবাদের_ভালোবাসা_ও_সম্প্রীতির_বার্তা_ছড়িয়ে_দেওয়ার_আহ্বান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যুদ্ধ, সংঘাত ও বিভেদের বর্তমান সময়ে সুফি সংস্কৃতির ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বক্তারা বলেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গঠনে সুফি ঐতিহ্যের চর্চা ও গবেষণা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
(last modified 2026-09-08T10:07:23+00:00 )
সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২৬ ১৫:৫৮ Asia/Dhaka
  • সম্মেলন মঞ্চে অতিথিবৃন্দ
    সম্মেলন মঞ্চে অতিথিবৃন্দ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যুদ্ধ, সংঘাত ও বিভেদের বর্তমান সময়ে সুফি সংস্কৃতির ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বক্তারা বলেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গঠনে সুফি ঐতিহ্যের চর্চা ও গবেষণা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

সুফি সংস্কৃতি: মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম আফ্রিকা ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক ৮ম আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি গতকাল ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ এবং দারুল ইরফান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে আরসি মজুমদার আর্টস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমান সংকটময় বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সুফি সাধকদের মানবপ্রেমের বাণী প্রচার করা জরুরি। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সুফি সংস্কৃতির চর্চা ও গবেষণা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, মাওলানা জালালুদ্দীন রুমি, মোহাম্মদ হাফিজ শিরাজী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য ও মানবপ্রেমের দর্শন এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে তিনি গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানান।

ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. মুমিত আল রশিদের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী পর্বে গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহাদাত হোসাইন বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। দারুল ইরফান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ম্যানেজিং ট্রাস্টি শাহজাদা সৈয়দ ইরফানুল হক স্বাগত বক্তব্য দেন। সম্মেলন আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুহসীন উদ্দীন মিয়া শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন।

সম্মেলনের সুফি কবি ফরিদউদ্দিন আত্তারের ‘মুসিবতনামা’র বাংলা অনুবাদ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাহরাইনের সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. ইব্রাহিম আল-শেখ রশিদ আল-মুরাইখী এবং মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জামাল ফারুক জিবরিল মাহমুদ। ড. আল-মুরাইখী ‘Sufism in the Arab Gulf States: A Case Study of the Khalidi Naqshbandi Order’ এবং ড. মাহমুদ ‘The Jurisprudential Vision of Al-Azhar Al-Sharif on the Issue of Sama’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসানুল হাদী।

অধ্যাপক ড. মুহসীন উদ্দীন মিয়া সুফি সংস্কৃতিকে শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, মানবিকতা ও কল্যাণের শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সুফি সংস্কৃতির মানবিক শিক্ষা ধারণ করে একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামান উপমহাদেশে সুফি-চর্চার দীর্ঘ ইতিহাস এবং বাংলাদেশের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সুফি সাধকেরা আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছেন। নিজেদের ইতিহাস ও সুফি ঐতিহ্যকে নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা জরুরি।

মো. শাহাদাত হোসাইন বলেন, সুফিবাদের মূল ভিত্তি আত্মশুদ্ধি। সমাজ পরিবর্তনের আগে মানুষকে নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করতে হবে। বর্তমান নৈতিক অবক্ষয়ের সময়ে তাকওয়া, মানবপ্রেম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির সুফি শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কী-নোট বক্তা ড. ইব্রাহিম আল-শেখ রশিদ আল-মুরাইখী হাদিসে জিবরাইলের আলোকে ইসলাম, ঈমান ও ইহসানের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি ইহসান, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এগুলোকে সুফি সাধনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন।

অন্য কী-নোট বক্তা ড. জামাল ফারুক জিবরিল মাহমুদ সামা প্রসঙ্গে বলেন, এর বৈধতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

দর্শকদের একাংশ

সভাপতির বক্তব্যে ড. মুমিত আল রশিদ বলেন, যুদ্ধ, সংঘাত ও বিভেদের এই সময়ে সুফি সংস্কৃতির ভালোবাসা, সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও ঐক্যের শিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি ফারসি, আরবি, বাংলা, উর্দু, পালি ও সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যকে আরও পরিচিত করতে অনুবাদ, গবেষণা ও নতুন প্রকাশনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

উদ্বোধনী পর্ব শেষে সম্মেলনের বুকলেট উন্মোচন করা হয়। একই সঙ্গে সুফি কবি ফরিদউদ্দিন আত্তারের ‘মুসিবতনামা’র বাংলা অনুবাদ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২২ জন শিক্ষার্থী ও গবেষকের সম্মিলিত অনুবাদে প্রকাশিত বইটিতে ‘মুসিবতনামা’র ২২টি গল্প গদ্যরূপে বাংলায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

দিনব্যাপী সম্মেলনের পরবর্তী পর্বে অধ্যাপক ড. শাহ কাওসার মুস্তাফা আবুলউলায়ীর সভাপতিত্বে প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অধ্যাপক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান ও ড. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ অংশ নেন। সিরিয়ার দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. ফেইরোজ আসাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মেহেদী হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন আরা সাথী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সুফিবাদের ধর্মতাত্ত্বিক, সামাজিক ও সাহিত্যিক প্রভাব নিয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন।

অতিথি বরণ

সম্মেলনে সুফিবাদের মানবিকতা, আত্মশুদ্ধি, শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তার পাশাপাশি ফারসি ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় গবেষণা, অনুবাদ এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।#

পার্সটুডে/এমএএআর/৮