সোম খোরদাদ: ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষার শক্তিশালী ঢাল
আকাশপথে যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুদ্ধবিমান, স্টিলথ ড্রোন, ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় আধুনিক ও বহুস্তরবিশিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ইরান গত কয়েক দশকে নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিভিন্ন ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও কার্যকর ব্যবস্থাগুলোর একটি হলো “সোম খোরদাদ”।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ডবাহিনীর অ্যারোস্পেস ইউনিটের সাবেক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদ আমির আলী হাজিজাদেহর ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণে ইরানের হাতে থাকা সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। বর্তমানে এটি ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়।
রা’দ থেকে খোরদাদ-৩
“সোম খোরদাদ” ব্যবস্থার সূচনা হয় “রা’দ” আকাশ প্রতিরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে। ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো রা’দ ব্যবস্থার কথা প্রকাশ্যে আসে। সে সময় এটি ৫০ কিলোমিটার পাল্লা এবং ২৭ কিলোমিটার উচ্চতায় লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার সক্ষমতা দেখিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার সামনে প্রদর্শিত হয় এর আরও উন্নত সংস্করণ “খোরদাদ-৩”। মাঝারি পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রাশিয়ার বুক-এম২ই সিস্টেমের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও এর নকশা ও প্রযুক্তিগত কাঠামো ছিল সম্পূর্ণ দেশীয় উন্নয়নের ফল।
উন্নত প্রযুক্তি ও যুদ্ধক্ষমতা
খোরদাদ-৩ ব্যবস্থার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ফেজড অ্যারে রাডার, যাতে প্রায় ১,৭০০টি উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে। এই রাডার একই সঙ্গে ৪টি পৃথক লক্ষ্যবস্তুকে শনাক্ত ও ৮টি ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা করতে সক্ষম।
প্রথম দিকের সংস্করণে এর পাল্লা ছিল ৫০ কিলোমিটার। তবে পরবর্তী সংস্করণগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১০০ কিলোমিটার অতিক্রম করে এবং সর্বশেষ সংস্করণে তা ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়।
এই ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শব্দের গতির ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি গতিতে চলতে পারে। এর লেজারভিত্তিক প্রক্সিমিটি ফিউজ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুর নিকটে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম, যা আকাশযুদ্ধে এর কার্যকারিতা আরও বাড়িয়ে তোলে।
“গুলি করে সরে যাও” কৌশল
সোম খোরদাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর উচ্চ গতিশীলতা। পুরো সিস্টেমটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে দ্রুত মোতায়েন, আক্রমণ এবং অবস্থান পরিবর্তন করা যায়। সামরিক ভাষায় একে বলা হয় “Shoot and Scoot” কৌশল বা হামলা করে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করার কৌশল। এই কৌশলে প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে অবস্থান নেয় এবং সুযোগমতো শত্রুর উড়ন্ত লক্ষ্যবস্তুর ওপর আকস্মিক হামলা চালায়। ফলে শত্রুপক্ষের জন্য সিস্টেমটির অবস্থান শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
সমুদ্রপথেও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা
খোরদাদ-৩ শুধু স্থলভিত্তিক নয়,নৌযানেও স্থাপনযোগ্য। এর ছোট ও সমন্বিত নকশা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির নৌ ইউনিটকে সমুদ্রপথে আরও কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা সুবিধা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে,পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা হলে এই ব্যবস্থা উপকূল থেকে বহু দূরের লক্ষ্যবস্তুকেও আঘাত করতে সক্ষম। এর ফলে সমুদ্রভিত্তিক অভিযানে ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মার্কিন ড্রোন ভূপাতিতের ঘটনা
২০১৯ সালের ২০ জুন হরমুজ প্রণালীর কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এমকিউ-৪সি “ট্রাইটন” ড্রোন ভূপাতিত করার মাধ্যমে সোম খোরদাদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনায় আসে।
এই ঘটনাকে ইরানের দেশীয় আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির একটি বড় সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দেয় যে আধুনিক ড্রোন ও নজরদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।#
পার্সটুডে/এমবিএ/২১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।