আন্তর্জাতিক ফোরামে ইরানের অবস্থান তুলে ধরব: প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান
-
মাসউদ পেজেশকিয়ান, ইরানের প্রেসিডেন্ট
পার্সটুডে-নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সফরের লক্ষ্য ও কর্মসূচি তুলে ধরেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করা, এই অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা এবং বিশ্বজনমতের কাছে ইরানের জনগণের কণ্ঠ পৌঁছে দেওয়ার একটি সুযোগ। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরআইবি'র বরাতে পার্সটুডে জানায়, মঙ্গলবার সকালে ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে পেজেশকিয়ান বলেন, এবারের সাধারণ পরিষদ ‘আস্থা’ স্লোগানকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অথচ বাস্তবে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির কারণে অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও কাঠামো, এমনকি জনগণ ও মানুষের অধিকারও উপেক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তারপরও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে বিশ্বের সামনে ইরানের জনগণের অবিচারের শিকার হওয়ার বাস্তবতা এবং একই সঙ্গে তাদের শক্তিমত্তা তুলে ধরা যায়। এই সফরে রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও আলোচনা হবে। এসবের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান ও বিদ্যমান বাস্তবতা বিশ্বজনমতের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।
পেজেশকিয়ান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের জনগণ যে কঠিন পরিস্থিতি ও নানা সংকট মোকাবিলা করেছে, তা তারা মর্যাদার সঙ্গে অতিক্রম করেছে, যা গর্বের বিষয়। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ফোরামে আমরা শক্তভাবে আমাদের অবস্থান তুলে ধরব এবং আশা করি, ইরানের জনগণের প্রকৃত বার্তা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে পারব।
ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, সব ধরনের চাপ, অবিচার ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের জনগণ মর্যাদা ও শক্তির সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে এবং দেশ, জনগণ, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ রক্ষায় জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের অবস্থান তুলে ধরা হবে
সফরে বিভিন্ন বৈঠক ও আলোচনায় কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে-এমন প্রশ্নের জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, বর্তমান বাস্তবতা, ইরানের জনগণের ওপর অবিচার, এই অঞ্চলে সংঘটিত অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবিশ্বাস সৃষ্টিকারী ঘটনাপ্রবাহ আলোচনার অন্যতম বিষয় হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতীতের আলোচনা ও চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বহুবার আলোচনায় বসেছে এবং চুক্তিও করেছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও অপর পক্ষকে সহজেই তাদের চুক্তি ও অঙ্গীকার লঙ্ঘন করতে দেখা গেছে-যা বিশ্বজনমতের সামনেই ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, আমরা যদি শান্তি ও নিরাপত্তায় পূর্ণ একটি বিশ্ব চাই, তাহলে মানুষ ও জাতিসমূহ এবং পৃথিবীর সব মানুষের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। শক্তির ওপর নির্ভর করে কোনো জাতিকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা যায় না।
গাজা ও অঞ্চলের অন্যান্য পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গাজা, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরান ও অন্যান্য স্থানে যা ঘটছে, তা 'মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার আলোকে' বিবেচনা করা উচিত। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে যে-কোনো কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, বেসামরিক মানুষ, বাড়িঘর, হাসপাতাল ও জনসাধারণের স্থাপনায় হামলা মানবাধিকার নিয়ে করা দাবিগুলোর ব্যাপারে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। বাস্তব পরিস্থিতি নিজেই অনেক বিষয়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে এবং বিশ্বজনমত এসব ঘটনা দেখছে।
তিনি প্রশ্ন করেন,“আমাদের মিনাবের নিরপরাধ শিক্ষার্থীরা কি সন্ত্রাসী ছিল? লামার্দের ঘটনায় তারা কি সন্ত্রাসীদের ওপর হামলা করেছিল? বাড়িঘর, হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করে যদি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সমস্যা থাকে, তাহলে এমনটি কেন করা হচ্ছে?”
গাজার মানুষের পরিস্থিতি তুলে ধরে পেজেশকিয়ান বলেন, মানুষের খাদ্য ও পানির প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়া এবং নারী, শিশু ও বয়স্কদের লক্ষ্যবস্তু করা মানবাধিকারের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ পরিস্থিতির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গুরুতর মনোযোগ প্রয়োজন।
গণমাধ্যমে সীমাবদ্ধতা ইরানের বার্তা পৌঁছাতে বাধা হবে না
এই সফরে ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে থাকা গণমাধ্যম দলের উপস্থিতি ঠেকানোর চেষ্টা এবং এর ফলে ইরানের অবস্থান প্রচারে কী প্রভাব পড়বে—এমন প্রশ্নের জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের গণমাধ্যমের উপস্থিতি সীমিত করার কিছু চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে। তবে তাদের হাতে থাকা মঞ্চের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, নিউইয়র্কে বহু গণমাধ্যমের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন। সঠিকভাবে বার্তা পরিচালনা ও পৌঁছে দিতে পারলে ইরানের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থাকবে।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, আরোপিত সীমাবদ্ধতাগুলোকে কিছু পক্ষের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক পরিস্থিতির বাস্তবতা মানুষের সামনে তুলে ধরা ও শোনানোর বিষয়ে উদ্বেগের লক্ষণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা শুধু গণমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়
ইরানের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, এসব প্রচেষ্টা শুধু গণমাধ্যমকেন্দ্রিক নয়। কিছু পক্ষ যতটা সম্ভব বিভিন্ন পথে ইরানের জনগণের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যাতে দেশকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, সামরিক চাপ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর অন্যান্য ক্ষেত্রেও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ বিভেদ সৃষ্টি এবং সমাজে বিভাজন তৈরিতে কিছু গণমাধ্যম ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সক্ষমতা ব্যবহার।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়ে ভেতর থেকে চাপ সৃষ্টি এবং জাতীয় ঐক্য দুর্বল করা। তবে সৃষ্টিকর্তার ওপর আস্থা, সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্ব এবং দেশের বিদ্যমান ঐক্য ও সংহতির ওপর নির্ভর করে এসব প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
শেষে পেজেশকিয়ান আশা প্রকাশ করেন,নিউইয়র্ক সফর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান তুলে ধরা, আঞ্চলিক বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা এবং ইরানের জনগণের বার্তা বিশ্বজনমতের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি সুযোগ হয়ে উঠবে।#
পার্সটুডে/এনএম /২২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।