ডিসকভার ইরান:
শতাব্দীর বাণিজ্য ঐতিহ্য থেকে আধুনিক শিল্পনগরী, তাবরিজের গল্প
পার্সটুডে: ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শহর তাবরিজ। শত শত বছর ধরে এই শহর বাণিজ্যের জন্য পরিচিত। কার্পেট, চামড়া, বস্ত্র ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তাবরিজ এখন একটি বড় শিল্প ও রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
প্রেস টিভির বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, তুরস্ক, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, ইরাক ও ককেশাস অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় তাবরিজের ভৌগোলিক অবস্থানও বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকালে যেমন এই শহরের মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ীদের যাতায়াত ছিল, আধুনিক যুগেও তাবরিজ সেই বাণিজ্যিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
শহরের কেন্দ্রেই রয়েছে ঐতিহাসিক তাবরিজ বাজার। এটি বিশ্বের অন্যতম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আচ্ছাদিত বাজার। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা এই বাজার বহু শতাব্দী ধরে ইরানকে ককেশাস, আনাতোলিয়া ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে।
আজও বাজারটি বেশ জমজমাট। পুরোনো দিনের ব্যবসা ও কারুশিল্পের পাশাপাশি আধুনিক তাবরিজের শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডও এগিয়ে চলছে।
কার্পেটের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত
তাবরিজের নাম বললেই প্রথমে যে বিষয়টি মনে আসে, তা হলো পারস্যের কার্পেট।
শহরটি দীর্ঘদিন ধরে কার্পেট বয়ন ও ব্যবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তাবরিজের কার্পেটের বিশেষ নকশা, সূক্ষ্ম কাজ এবং কারিগরদের দক্ষতার কারণে এর আলাদা পরিচিতি রয়েছে।
তাবরিজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশে ৮০ হাজারের বেশি মানুষ হাতে কার্পেট বোনেন। ইরানের মোট হাতে তৈরি কার্পেটের প্রায় ৩০ শতাংশ এই প্রদেশে উৎপাদিত হয়।
ইরানের ন্যাশনাল কার্পেট সেন্টারের প্রধানের তথ্য অনুযায়ী, দেশের হাতে তৈরি কার্পেটের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই রপ্তানির জন্য উৎপাদন করা হয়।
২০২৬ সালের মার্চে শুরু হওয়া ইরানি বছরের প্রথম চার মাসে প্রদেশটিতে কার্পেট উৎপাদন প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে উৎপাদন এক মিলিয়ন বর্গমিটারের বেশি হয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ইরানের হাতে তৈরি কার্পেট রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ডলারের।
কার্পেট শিল্পে তাবরিজের ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও রয়েছে। ২০১৫ সালে ওয়ার্ল্ড ক্রাফটস কাউন্সিল তাবরিজকে ‘ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটি ফর কার্পেট উইভিং’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ, পরিবারের ছোট কর্মশালা থেকে বড় ব্যবসা—কার্পেট এখনো তাবরিজের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চামড়া ও জুতার বড় কেন্দ্র
কার্পেটের পাশাপাশি তাবরিজ চামড়া ও জুতা শিল্পের জন্যও পরিচিত। ছোট ছোট ঐতিহ্যবাহী জুতার কারখানা থেকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে বড় একটি শিল্পখাত।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, তাবরিজে জুতা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি লাইসেন্সধারী ব্যবসা ছিল। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০টি উৎপাদন ইউনিট এবং ১ হাজার ১০০টি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান।
এই খাতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের সরাসরি এবং আরও প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট শিল্পের হিসাব।
ইরানের চামড়া ও চামড়ার ওপরের অংশযুক্ত জুতা উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ তাবরিজে হয় বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। হাতে তৈরি সম্পূর্ণ চামড়ার জুতার ক্ষেত্রে শহরটির অংশ প্রায় ৯৫ শতাংশ।
এ ছাড়া ইরানের নিরাপত্তা, সামরিক ও ক্রীড়া জুতার প্রায় ৭০ শতাংশ তাবরিজে তৈরি হয় বলে জানা গেছে।
তাবরিজের জুতা শিল্পের অন্যতম লক্ষ্যবাজার প্রতিবেশী দেশগুলো। ইরাক, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের বাজারে তাবরিজের জুতার চাহিদা রয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকলেও তাবরিজের উৎপাদকরা দাম ও মান—দুই দিক থেকেই বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
নতুন বাজারের সন্ধানে তাবরিজ
তাবরিজের জুতা শিল্প এখন শুধু পুরোনো বাজারের ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির চেষ্টাও চলছে।
২০২৬ সালের ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে প্রথম ‘ইরান-তাবরিজ ফুটওয়্যার এক্সপোর্ট এক্সিবিশন’ অনুষ্ঠিত হয়।
এতে পূর্ব আজারবাইজানের জুতা শিল্পের উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। তাদের লক্ষ্য ছিল আর্মেনিয়ার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা এবং দেশটির বাজারে ইরানি জুতার উপস্থিতি বাড়ানো।
ককেশাসের দেশগুলোর কাছাকাছি অবস্থান করায় তাবরিজের জন্য এই অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার।
চামড়া শিল্পের ইতিহাসও পুরোনো
তাবরিজের চামড়া শিল্পের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯২৮ সালে শহরটিতে একটি আধুনিক ট্যানারি প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৬২ সালের মধ্যে তাবরিজে ১৯টি চামড়া কারখানা ও ১২টি ট্যানারি গড়ে উঠেছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে তখন ২ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করতেন।
কার্পেট ও জুতার বাইরে আরও অনেক কিছু
তাবরিজের অর্থনীতি শুধু কার্পেট ও চামড়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। শহরটিতে গাড়ি, যন্ত্রপাতি, পেট্রোকেমিক্যাল, ওষুধ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্প গড়ে উঠেছে।
তাবরিজ ও এর আশপাশে ইরান ট্রাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং, মেশিন সাযি তাবরিজ, ইরান ডিজেল ইঞ্জিন ম্যানুফ্যাকচারিং, তাবরিজ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স এবং তাবরিজ তেল শোধনাগারের মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
খাদ্যশিল্পেও তাবরিজের পরিচিতি রয়েছে। বিশেষ করে চকলেট ও মিষ্টান্ন উৎপাদনে শহরটির দীর্ঘদিনের সুনাম আছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট পুরোনো তথ্য অনুযায়ী, তাবরিজে ৮৫০টির বেশি খাদ্য ও মিষ্টান্ন উৎপাদন ইউনিট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য ইরানের পাশাপাশি ৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হয়।
কিছু শিল্প-তথ্যে বলা হয়েছে, ইরানের বিস্কুট ও চকলেট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই তাবরিজে হয়ে থাকে।
রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ দরজা
তুরস্ক, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান ও ককেশাসের কাছাকাছি অবস্থান তাবরিজকে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
২০২৫ সালের ২১ মার্চ থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত ইরানি ১৪০৪ সালের প্রথম আট মাসে পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশ থেকে ১২৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার মূল্যের ২৩ লাখ ৬৬ হাজার টন অ-তেল পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে তাবরিজ কাস্টমসের মাধ্যমে রপ্তানি হয়েছে ৭১ কোটি ২০ লাখ ডলারের পণ্য। এর পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৬২ হাজার টন।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, তাবরিজ শুধু পণ্য উৎপাদনের শহর নয়; এটি ইরানের পণ্যকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
পুরোনো বাণিজ্য, নতুন অর্থনীতি
তাবরিজের বিশেষত্ব শুধু এর পুরোনো বাজার, বিখ্যাত কার্পেট কিংবা চামড়ার জুতা নয়। বরং পুরোনো বাণিজ্য ও কারুশিল্পের সঙ্গে আধুনিক শিল্পকে যুক্ত করতে পারাটাই শহরটির বড় বৈশিষ্ট্য।
একটি পরিবারের ছোট কারখানায় তৈরি কার্পেট, একজন কারিগরের হাতে তৈরি চামড়ার জুতা, আধুনিক কারখানার চকলেট কিংবা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে তৈরি যন্ত্রপাতি—সবকিছুই তাবরিজের অর্থনীতির অংশ।
শত শত বছর আগে ব্যবসায়ীরা যে পথে পণ্য নিয়ে যাতায়াত করতেন, আজ সেই বাণিজ্যিক যোগাযোগই আধুনিক শিল্প ও রপ্তানির নতুন পথ তৈরি করেছে।
তাবরিজ তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক শহর নয়। এটি এমন একটি শহর, যেখানে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প আধুনিক শিল্পের সঙ্গে পাশাপাশি এগিয়ে চলছে।
ঐতিহাসিক বাজার, দক্ষ কারিগর, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যপথের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তাবরিজ উত্তর-পশ্চিম ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
এক কথায়, তাবরিজের গল্প হলো—পুরোনো বাণিজ্য থেকে আধুনিক শিল্পে, পারিবারিক কর্মশালা থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যাওয়ার গল্প।#
পার্সটুডে/এমএআর/৩০