ডিসকভার ইরান:
খারাকানের টুইন টাওয়ার: ইরানের ইটের স্থাপত্যের অনন্য বিস্ময়
পার্সটুডে: ইরানের কাজভিন প্রদেশের খারাকানের টুইন টাওয়ার সেলজুক যুগের স্থাপত্যের অন্যতম অসাধারণ নিদর্শন। প্রায় এক হাজার বছর আগে নির্মিত এই দুই সমাধি-টাওয়ার শুধু তাদের বয়সের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; জ্যামিতিক নকশা, সূক্ষ্ম ইটের কারুকাজ, কুফি লিপি, দেয়ালচিত্র এবং অভিনব নির্মাণপ্রযুক্তির কারণে এগুলো ইরানের স্থাপত্য ঐতিহ্যের বিশেষ সম্পদ।
খারাকানের টাওয়ারগুলো ইরানে দ্বি-খোলবিশিষ্ট গম্বুজের প্রাচীনতম উদাহরণগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই পদ্ধতিতে গম্বুজের ভেতরের কাঠামো ও বাইরের অবয়ব আলাদা রাখা হয়। ফলে একই সঙ্গে স্থাপনার কাঠামোগত শক্তি এবং বাইরের সৌন্দর্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
বাইরের দেয়ালে ৬০টিরও বেশি ধরনের ইটের অলংকরণ রয়েছে। জটিল জ্যামিতিক নকশা, সূচালো খিলান এবং কুফি লিপির শিলালিপি মিলিয়ে টাওয়ার দুটিকে যেন ‘ইরানি ইটের কারুকার্যের জাদুঘর’ বলা যায়।
খোলা প্রান্তরের মাঝে প্রায় এক হাজার বছরের ইতিহাস
কাজভিন প্রদেশের বিস্তৃত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে খারাকানের যুগল টাওয়ার। এগুলো আভাল জেলার হেসার ভালি-আসর গ্রাম থেকে প্রায় এক কিলোমিটার এবং কাজভিন-হামেদান সড়ক থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
টাওয়ার দুটি একে অপরের থেকে মাত্র ২৯ মিটার দূরে। পূর্ব টাওয়ারটি পুরোনো। এটি ৪৬০ হিজরি বা ১০৬৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। প্রায় ২৫ বছর পর, ৪৮৬ হিজরি বা ১০৯৩ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম টাওয়ারটি নির্মাণ করা হয়।
দুই টাওয়ারের নকশায় বিস্ময়কর মিল থাকলেও কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। এসব পার্থক্য সেলজুক যুগে স্থাপত্যচিন্তার ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
মূল বাইরের গম্বুজ দুটি এখন আর নেই। ভূমিকম্প ও সময়ের ক্ষয়ও স্থাপনাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তারপরও তাদের মূল কাঠামো, ইটের কারুকাজ ও অভ্যন্তরের কিছু অলংকরণ এখনো টিকে আছে।
নির্মাতাদের নামও সংরক্ষিত
খারাকানের টাওয়ারগুলোর আরেকটি বিশেষত্ব হলো—এখানে নির্মাতাদের নাম শিলালিপিতে সংরক্ষিত রয়েছে। মধ্যযুগীয় ইরানের অনেক স্থাপনার ক্ষেত্রে স্থপতি বা কারিগরদের পরিচয় জানা যায় না। তাই খারাকানের শিলালিপির ঐতিহাসিক মূল্য অনেক বেশি।
পূর্ব টাওয়ারের শিলালিপিতে ৪৬০ হিজরি সালের তারিখসহ মুহাম্মদ ইবনে মাকি আল-জাঞ্জানির নাম রয়েছে। পশ্চিম টাওয়ারের ৪৮৬ হিজরির শিলালিপিতে আবুল-মাআলি ইবনে মাকি আল-জাঞ্জানিকে নির্মাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই নামের মিল থেকে ধারণা করা হয়, তারা সম্ভবত একই পরিবারের সদস্য ছিলেন—হয়তো বাবা-ছেলে বা ভাই। যদি এই ধারণা সঠিক হয়, তাহলে খারাকানের টাওয়ার দুটি মধ্যযুগীয় ইরানে স্থাপত্যজ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা কীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছিল, তারও একটি বিরল উদাহরণ।
টাওয়ার দুটি সেলজুক আমির আবু সাঈদ বিজার ইবনে সাদ এবং আবু মনসুর ইলতাইতি ইবনে তেকিন-এর সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অষ্টভুজ আকৃতি ও অভিনব গম্বুজ
খারাকানের স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর অষ্টভুজ পরিকল্পনা এবং দ্বি-খোলবিশিষ্ট গম্বুজ।
দুই টাওয়ারেই বাইরের অংশ অষ্টভুজাকার। ভেতরের কাঠামো ধীরে ধীরে প্রায় বৃত্তাকার হয়ে গম্বুজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এতে একদিকে অষ্টভুজ দেয়ালের দৃঢ়তা, অন্যদিকে বৃত্তাকার গম্বুজের সুবিধা—দুটিই পাওয়া গেছে।
পূর্ব টাওয়ারে দুটি সর্পিল সিঁড়ি রয়েছে, আর পশ্চিম টাওয়ারে একটি। পূর্ব টাওয়ারের সিঁড়িতে ২১ থেকে ২২টি ধাপ এবং পশ্চিম টাওয়ারের সিঁড়িতে ২৪টি ধাপ রয়েছে। সিঁড়িগুলো ভেতরের ও বাইরের গম্বুজের মধ্যবর্তী অংশে পৌঁছায়।
দুই টাওয়ারের ভেতরের গম্বুজ এখনো টিকে আছে। তবে বাইরের গম্বুজ ধসে গেছে।
অষ্টভুজ আকৃতির কারণে প্রতিটি দেয়াল আলাদা অলংকরণ ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য জটিল জ্যামিতিক ইটের নকশা তৈরিতে স্থপতিদের বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।
সংখ্যার মধ্যেও স্থাপত্যের সৌন্দর্য
খারাকানের টাওয়ার দুটির মাপেও একটি সুস্পষ্ট সামঞ্জস্য দেখা যায়। পূর্ব টাওয়ারের মূল উচ্চতা ছিল প্রায় ১৮ মিটার এবং পশ্চিম টাওয়ারের প্রায় সাড়ে ১৯ মিটার। দুই টাওয়ারের বাইরের অষ্টভুজের প্রতিটি বাহু প্রায় ৬ মিটার এবং ভেতরের পরিমাপ প্রায় ৪ মিটার।
গবেষকেরা দুই স্থাপনার নকশায় ১:২, ২:৩ এবং ১:২:৩ ধরনের অনুপাতের সম্পর্ক শনাক্ত করেছেন। এগুলো সচেতনভাবে কোনো নির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্র মেনে তৈরি করা হয়েছিল, নাকি প্রচলিত স্থাপত্যিক মডিউল ও অভিজ্ঞতা থেকে এই অনুপাত তৈরি হয়েছিল—তা নিশ্চিত নয়। তবে এসব অনুপাত টাওয়ার দুটির সামগ্রিক ভারসাম্য ও সৌন্দর্য বাড়িয়েছে।
ইটের কারুকাজে অনন্য সৌন্দর্য
খারাকানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এর ইটের কারুকাজ। দুই টাওয়ারে ৬০টিরও বেশি ধরনের ইটের নকশা পাওয়া গেছে।
বাইরের দেয়ালকে বিভিন্ন প্যানেল, খিলান ও জ্যামিতিক নকশার অংশে ভাগ করা হয়েছে। মাছের কাঁটার মতো নকশা, সূচালো খিলান, বর্গাকার গাঁট, তারকা, বহুভুজ এবং আন্তঃবিন্যস্ত বিভিন্ন নকশা এতে ব্যবহৃত হয়েছে।
পশ্চিম টাওয়ারটি পরবর্তী সময়ে নির্মিত হওয়ায় সেখানে কিছু নতুন ধরনের অলংকরণ দেখা যায়। ফ্রেমের মধ্যে সূচালো খিলান এবং তিন-পাপড়ির নকশা তার উদাহরণ।
ইটের উঁচু-নিচু বিন্যাস সূর্যের আলোয় দেয়ালে পরিবর্তনশীল ছায়া তৈরি করে। ফলে দিনের বিভিন্ন সময়ে টাওয়ারগুলোর চেহারাতেও সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা যায়।
এই অসাধারণ ইটের কারুকাজই খারাকানকে প্রাথমিক সেলজুক স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনে পরিণত করেছে।
কুফি লিপিতে পবিত্র বাণী
টাওয়ার দুটির দেয়ালের ওপরের অংশে কুফি লিপিতে আরবি শিলালিপি রয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিম—দুই টাওয়ারেই পবিত্র কোরআনের সূরা আল-হাশরের শেষ তিন আয়াত লেখা হয়েছে।
পূর্ব টাওয়ারের প্রবেশপথেও কুফি লিপির শিলালিপি রয়েছে। প্রধান দরজার বিপরীত অংশে ‘আল্লাহ’ শব্দটি নয়বার ব্যবহার করা হয়েছে।
পশ্চিম টাওয়ারের একটি অংশে সূরা আল-মুমিনুনের ১১৫ নম্বর আয়াতের অংশবিশেষও কুফি লিপিতে লেখা রয়েছে।
জ্যামিতিক ইটের নকশার সঙ্গে কুফি ক্যালিগ্রাফির এই সমন্বয় ইরানের ইসলামি স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে—স্থাপত্যের সঙ্গে পবিত্র বাণীর গভীর সম্পর্ক।
পূর্ব টাওয়ারের দেয়ালে প্রায় এক হাজার বছরের ছবি
পূর্ব টাওয়ারের ভেতরের দেয়ালগুলোতে প্রাথমিক সেলজুক যুগের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দেয়ালচিত্র এখনো সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলো ইরানে টিকে থাকা সেলজুক যুগের দেয়ালচিত্রের অন্যতম মূল্যবান উদাহরণ।
সাদা প্লাস্টারের ওপর আঁকা এসব ছবিতে নীল, কালো এবং বিভিন্ন ধরনের বাদামি রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে মসজিদের প্রদীপ, ময়ূর, জীবনবৃক্ষ, ছয় ও আট-পাপড়ির তারা, ডালিমগাছ, ফুল ও বিভিন্ন গাছপালার ছবি দেখা যায়।
একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র হলো তিনটি শিকলে ঝোলানো মসজিদের প্রদীপ। এর পাশে কুফি লিপিতে ‘এর মালিকের ওপর বরকত’ লেখা রয়েছে। কিছু গবেষক সূরা নূরের আলোকে এই প্রদীপকে স্রষ্টার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
জীবনবৃক্ষের ডালে জোড়ায় জোড়ায় বসে থাকা পাখিকে জান্নাতের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ময়ূরকেও উর্বরতা, বসন্ত, জান্নাত এবং সূর্যের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন কিছু গবেষক।
পশ্চিম টাওয়ারের অভ্যন্তর তুলনামূলকভাবে সাদামাটা। সেখানে পূর্ব টাওয়ারের মতো বিস্তৃত দেয়ালচিত্র নেই; বরং ইটের অলংকরণই প্রধান।
ইরানি স্থাপত্যের দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ
খারাকানের টাওয়ার কোনো বিচ্ছিন্ন স্থাপত্য সৃষ্টি নয়। এগুলো ইরানে সমাধি-টাওয়ার নির্মাণের দীর্ঘ ঐতিহ্যের একটি পরিণত রূপ।
সেলজুকদের আগেই জিয়ারি, বাওয়ান্দ ও কাকুইদের মতো রাজবংশের সময়ে ইরানে ইটের তৈরি সমাধি-টাওয়ার নির্মাণের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল।
১০০৬ সালে নির্মিত গনবাদে কাবুস এই ধারার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন। এছাড়া রেস্কেট, রাদকান, লাজিম ও পির আলমদারের মতো টাওয়ারগুলোও এই ঐতিহ্যের বিকাশের সাক্ষ্য দেয়।
১০৫৬ সালের আবরকুহের গম্বুজে আলিও এই ধারার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এসব স্থাপনার মধ্যে আকার ও নির্মাণসামগ্রীতে পার্থক্য থাকলেও ইট, জ্যামিতি, উল্লম্বতা এবং সমাধি-স্থাপত্যের ধারণার মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে।
পরবর্তী সেলজুক স্থাপনাগুলোর মধ্যেও এই ঐতিহ্যের প্রভাব দেখা যায়। দামঘানের চেহেল দোখতারান ও মিহমানদুস্ত টাওয়ার এবং কাজভিন প্রদেশের সামিরানের যুগল টাওয়ার খারাকানের সঙ্গে তুলনার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
বিশেষ করে সামিরানের টাওয়ারগুলোর সঙ্গে খারাকানের স্থাপত্যিক সম্পর্ক গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ধারণা করা হয়, খারাকানের স্থপতিরা পূর্ববর্তী স্থাপনাগুলোর পরিকল্পনা, অনুপাত ও জ্যামিতিক ধারণা গ্রহণ করে সেগুলোকে আরও উন্নত করেছিলেন।
ইরানের স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য
খারাকানের যুগল টাওয়ার তাই শুধু দুটি প্রাচীন সমাধিসৌধ নয়। এগুলো ইরানের দীর্ঘস্থায়ী স্থাপত্য ঐতিহ্য, কারিগরি দক্ষতা, জ্যামিতিক চিন্তা এবং ইসলামি শিল্পবোধের এক অনন্য সমন্বয়।
প্রায় এক হাজার বছর ধরে ভূমিকম্প, আবহাওয়া ও সময়ের ক্ষয় সত্ত্বেও টিকে থাকা এই স্থাপনাগুলো দেখিয়ে দেয়, মধ্যযুগীয় ইরানের স্থপতিরা ইটকে শুধু নির্মাণসামগ্রী হিসেবে দেখেননি; বরং সেটিকেই স্থাপত্যের ভাষা ও শিল্পের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
জ্যামিতিক ইটের কারুকাজ, কুফি লিপি, দ্বি-খোলবিশিষ্ট গম্বুজ এবং পূর্ব টাওয়ারের দেয়ালচিত্র—সব মিলিয়ে খারাকানের যুগল টাওয়ার ইরানের সেলজুক স্থাপত্যের এক অসাধারণ অধ্যায়। এগুলো একই সঙ্গে অতীতের নির্মাণজ্ঞান, শিল্পসৌন্দর্য এবং স্থাপত্যের ধারাবাহিকতার এক জীবন্ত সাক্ষ্য।#
পার্সটুডে/এমএএআর/১৯