হরমুজগানের স্থাপত্য: প্রকৃতির সাথে বোঝাপড়া করে গড়া এক ঐতিহ্য
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i163174-হরমুজগানের_স্থাপত্য_প্রকৃতির_সাথে_বোঝাপড়া_করে_গড়া_এক_ঐতিহ্য
পার্সটুডে: ইরানের দক্ষিণে হরমুজগান প্রদেশ। একদিকে গরম মরুভূমি, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরের নীল জল—এই দুইয়ের মিশেলেই গড়ে উঠেছে এই অঞ্চল। এখানকার ইতিহাস ধরে রাখা আছে বড় বড় রাজকীয় ভবনে নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে মানানসই স্থাপত্যে।
(last modified 2026-09-17T14:51:53+00:00 )
সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ ২০:৪১ Asia/Dhaka
  • হরমুজগানের স্থাপত্য: প্রকৃতির সাথে বোঝাপড়া করে গড়া এক ঐতিহ্য

পার্সটুডে: ইরানের দক্ষিণে হরমুজগান প্রদেশ। একদিকে গরম মরুভূমি, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরের নীল জল—এই দুইয়ের মিশেলেই গড়ে উঠেছে এই অঞ্চল। এখানকার ইতিহাস ধরে রাখা আছে বড় বড় রাজকীয় ভবনে নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে মানানসই স্থাপত্যে।

হরমুজগান বহুকাল ধরেই সমুদ্র-বাণিজ্য আর কাফেলার পথের এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। এই বিশেষ অবস্থান আর গরম-আর্দ্র আবহাওয়া মিলেই তৈরি হয়েছে এখানকার নিজস্ব ধাঁচের স্থাপত্য। প্রেস টিভির বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানায়, এই স্থাপত্যে আছে তিনটি প্রধান জিনিস—জলবায়ু-উপযোগী মসজিদ, সুরক্ষা ও বাণিজ্যের জন্য দুর্গ, আর পানি ধরে রাখার জন্য জলাধার।

উপকূলীয় মসজিদ, দুর্গ-সরাইখানার নেটওয়ার্ক আর বড় বড় জলাধার—এসবই বলে দেয় দক্ষিণ ইরানের মানুষ কীভাবে প্রকৃতির সাথে মানিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছে। সীমিত সম্পদ দিয়ে কঠিন আবহাওয়ায় টিকে থাকার এই কৌশলগুলোই স্থানীয় স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

মসজিদ: সাধারণ কিন্তু কার্যকর

ইস্পাহান বা শিরাজের মসজিদ যেমন বিশাল গম্বুজ আর জাঁকজমকের জন্য বিখ্যাত, হরমুজগানের মসজিদ তেমন নয়। এগুলো অনেক সাদাসিধে, কিন্তু কাজে দারুণ কার্যকর। গত তিনশ বছরে তৈরি এসব মসজিদের গঠন ঠিক হয়েছে এখানকার আবহাওয়া, স্থানীয় উপকরণ আর সমুদ্রপথে আসা বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাবে।

মালেক বিন আব্বাস মসজিদ, বন্দর লেঙ্গেহ

এই মসজিদগুলোর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো "শবেস্তান-ইওয়ান" নকশা। শবেস্তান মানে মূল নামাজের জায়গা—স্তম্ভওয়ালা একটা হলঘর, ছাদ সমতল বা খিলান-করা। এই নকশায় ছায়া পড়ে, বাতাসও চলাচল করে ভালো, ফলে ভেতরটা থাকে ঠান্ডা। বেশিরভাগ ইরানি মসজিদে গম্বুজ থাকলেও এখানে থাকে না—কারণ সমতল বা খিলান-ছাদ গরম কম ধরে রাখে। শবেস্তানের পাশে থাকে বড় ইওয়ান, অর্ধেক-খোলা একটা জায়গা, যেখানে মানুষ বসে গল্প করে, একে অপরের সাথে মেলামেশা করে।

মসজিদের ভেতরের নকশাও বেশ নমনীয়। সাধারণত ইরানি মসজিদে মাঝখানে একটা উঠান থাকে, কিন্তু হরমুজগানে উঠানের জায়গা বদলে যায় বাতাসের দিক আর পরিবেশ বুঝে। অর্থাৎ এখানে নিয়ম মানার চেয়ে আরাম আর সুবিধাই বড় কথা। পুরুষ আর নারীদের জন্য আলাদা দরজা রাখা হয়—এটা সামাজিক রীতি আর গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখায়। ঢোকার পথটাও এমনভাবে বানানো, যাতে মানুষ ধীরে ধীরে বাইরের কোলাহল থেকে ভেতরের শান্ত পরিবেশে প্রবেশ করে।

বাইরে থেকে দেখতে এই মসজিদগুলো সাদামাটা, কিন্তু ভেতরে আছে চুনের কারুকাজ—ফুল-লতা আর জ্যামিতিক নকশা। সহজ হলেও এসব কাজে স্থানীয় শিল্পীদের হাতের দক্ষতা স্পষ্ট বোঝা যায়। তারা ব্যবহার করতেন চুন, পাথর আর মাটির মতো স্থানীয় জিনিসপত্র। বন্দর-লেঙ্গেহর মালেক-বিন-আব্বাস মসজিদ, বন্দর আব্বাসের গালেহদারি মসজিদ, আর কারচি মসজিদ—এই তিনটি এখনও সেই পুরনো ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ঐতিহাসিক গোলেদরি মসজিদ, বন্দর আব্বাস।

দুর্গ আর সরাইখানা: নিরাপত্তার প্রতীক

মসজিদের পাশাপাশি হরমুজগানের দুর্গ আর সরাইখানাগুলোও এই অঞ্চলের ইতিহাসের বড় অংশ। পাহাড়ে, উপকূলে, দ্বীপে—সব জায়গাতেই ছড়িয়ে আছে এসব স্থাপনা। এগুলোর কাজ ছিল বাণিজ্যপথ পাহারা দেওয়া আর এলাকার নিরাপত্তা রক্ষা করা।

হরমুজ আর কেশম দ্বীপের পর্তুগিজ দুর্গগুলো সবচেয়ে বিখ্যাত—এগুলো তৈরি হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতে। পুরু দেয়াল, পাহারা দেওয়ার টাওয়ার, রসদ আর পানি রাখার গুদাম—সব মিলিয়ে এগুলো ছিল আসল সামরিক ঘাঁটি। পর্তুগিজরা এখানে একশ বছরেরও বেশি সময় ছিল, শেষ পর্যন্ত ১৬২৩ সালে শাহ আব্বাসের নির্দেশে সাফাভি বাহিনী এই এলাকা পুনরুদ্ধার করে।

কীশের মাশা মসজিদ

দেশের ভেতরের দিকেও গোহরান আর কামিজ নামের দুর্গ তৈরি হয়েছিল। এগুলো শুধু প্রতিরক্ষার কাজেই নয়, প্রশাসনিক কাজেও ব্যবহৃত হতো। এসব দুর্গে থাকত পরিখা, গভীর কুয়ো আর মজবুত দেয়াল—বিপদের সময় নিরাপত্তা আর পানির যোগান নিশ্চিত রাখতে। সরাইখানাগুলো ছিল যাত্রীদের বিশ্রাম আর মালামাল বেচাকেনার জায়গা, যা হরমুজগানকে বিশ্ব-বাণিজ্যের একটা বড় প্রবেশদ্বারে পরিণত করেছিল।

জলাধার: পানির সংকট মেটানোর কৌশল

হরমুজগানের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য হলো জলাধার। শুষ্ক আবহাওয়া আর পানির অভাব মেটাতেই এগুলো তৈরি হয়েছিল। মাটির নিচে বানানো এই জলাধারগুলোতে থাকত পাথরের গম্বুজ, যা পানি ধরে রাখত ঠিকভাবে। শুধু পানি সংরক্ষণই নয়, এগুলো তৈরি হতো সবাই মিলে—তাই এগুলো ছিল সামাজিক ঐক্যেরও প্রতীক।

বাস্টাকের কাছে কারাইকি জলাধার

কং বন্দরের "দরিয়া-দৌলাত" জলাধার এর একটা ভালো উদাহরণ। এতে পানি আনা, ছাঁকা আর বিতরণের আলাদা ব্যবস্থা ছিল—মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে যা ছিল খুবই কার্যকর। আজকাল আধুনিক ব্যবস্থা এসে অনেক জায়গায় এই পুরনো জলাধার প্রতিস্থাপন করেছে, তবু এখনও এগুলো স্থানীয় জ্ঞান আর মানুষের একতার প্রতীক হয়ে টিকে আছে।

সব মিলিয়ে হরমুজগানের এই স্থাপত্য বলে দেয়, মানুষ কীভাবে প্রকৃতির সাথে বুদ্ধি খাটিয়ে মানিয়ে চলতে জানে। সীমিত সম্পদ নিয়েও কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার এই গল্প শুধু ইতিহাস নয়, বরং আজকের দিনেও শেখার একটা বড় উদাহরণ।#

পার্সটুডে/এমএএআর/১৭