ডিসকভার ইরান:
কাজভিনের কালেহ কুর্দ গুহা: যেখানে দর্শনার্থীরা মুখোমুখি হন মানবজাতির আদি উৎসের
পার্সটুডে: আধুনিক মানুষের অস্তিত্বের বহু আগে থেকেই ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে, তেহরানের ১৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত কাজভিন শহরের পশ্চিমে একটি গুহায় বাস করত ভিন্ন প্রজাতির মানুষ। তারা যে সরঞ্জাম আর দাঁত রেখে গেছে, তা এখন ইরানের মানব-ইতিহাসকে নতুন করে লিখছে।
কাজভিনের দক্ষিণ-পশ্চিমের পাহাড়ি এলাকায় একটি পর্বত সময়ের গভীরে লুকিয়ে রেখেছে একটি পথ—কালেহ কুর্দ গুহা (কালেহ অর্থ কেল্লা)। এর প্রশস্ত প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় এমন একটি মেঝে, যার নিচে চাপা পড়ে আছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস।
আরও গভীরে গেলে গুহাটি একটি উল্লম্ব কূপে নেমে যায়, যা গিয়ে মেশে ফুটবল মাঠের সমান আকারের এক পাথুরে হলঘরে। বছরের পর বছর ধরে এখানে খননকাজ চালানো প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এই গুহাতেই ইরানে এ পর্যন্ত পাওয়া মানব-জীবনের সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ লুকিয়ে আছে।
কালেহ কুর্দ গুহাটি খারাকানের যমজ মিনার থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে, আভাজ জেলার হেসার নামের ছোট্ট এক গ্রামে অবস্থিত। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০০ মিটারেরও বেশি উঁচুতে, আলবোর্জ পর্বতমালা আর ইরানের বিশাল মালভূমির মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত।
গুহাটি নিজে সেখানে পাওয়া যেকোনো কিছুর চেয়েই অনেক বেশি প্রাচীন। ভূতাত্ত্বিকদের হিসাবে এর পাথরের বয়স কয়েক কোটি বছর—মানুষের অস্তিত্বের বহু আগেকার। কিন্তু গত কয়েক লক্ষ বছরে এখানে যা ঘটেছে, তাই কালেহ কুর্দকে বিখ্যাত করে তুলেছে।
গুহাটির দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অংশ আছে। প্রবেশপথের কাছে দেখা যায়, প্রাচীন মানুষেরা এখানে শিবির স্থাপন করে কাজ করত এবং মাটির স্তর রেখে গিয়েছিল, যেগুলো প্রত্নতাত্ত্বিকরা মৌসুমের পর মৌসুম ধরে খনন করে চলেছেন।
আরও গভীরে, গুহার মেঝে একটি ১২ মিটার উঁচু উল্লম্ব কূপে গিয়ে খোলে, যা প্রায় ৫০x২০ মিটার আকারের একটি লুকানো হলঘরে নেমে যায়—যার ছাদ ২০ মিটার উঁচুতে। সেখানে বাদুড়েরা বাস করে ভেজা ও ঠান্ডা বাতাসে, যার তাপমাত্রা থাকে ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও গুহা-অভিযানের সরঞ্জাম ছাড়া কারো এই কূপ দিয়ে নিচে নামা উচিত নয়।
গবেষকদের মতে, এই ভেতরের কূপটিই সম্ভবত সেই কারণ, যার জন্য গুহাটি এত ভালোভাবে টিকে আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই কূপ লুটেরা ও প্রাচীন নিদর্শন পাচারকারীদের সবচেয়ে গভীর কক্ষে পৌঁছাতে বাধা দিয়েছে।
তবে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রকৃতপক্ষে যা কিছু খুঁজে পেয়েছেন—পাথরের সরঞ্জাম, পশুর হাড় আর মানুষের দাঁত, যা কালেহ কুর্দকে বিখ্যাত করেছে—তার বেশিরভাগই এসেছে সেই লুকানো হলঘর থেকে নয়, বরং গুহার প্রবেশপথ থেকে, যেখানে খননকাজ এখনও চলছে।
প্রায় ১,৮০,০০০ বছর আগেকার দাঁত
গুহার সঙ্গে প্রাচীন মানুষের সংযোগ প্রথম ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যখন তারবিয়াত মোদারেস বিশ্ববিদ্যালয়ের হামেদ ওয়াহদাতিনসাব ও ফ্রান্সের জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের (প্যারিস) জিল বেরিলোঁর নেতৃত্বে একটি যৌথ ইরানি-ফরাসি দল স্বনামধন্য প্রত্নতাত্ত্বিক সাময়িকীতে তাদের গবেষণার ফল প্রকাশ করে।
তাদের সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কার ছিল দুটি নিয়ান্ডারথাল দাঁত, যাদের বয়স আনুমানিক ১,৭৫,০০০ এবং ১,৮০,০০০ বছর বলে নির্ধারিত হয়েছে। ইরানে এ ধরনের আবিষ্কার এই প্রথম, এবং ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাগার এই বয়স নির্ধারণ যাচাই করেছে। দাঁতগুলোর পাশাপাশি দলটি বহু পাথরের সরঞ্জাম ও পশুর হাড়ও উদ্ধার করেছে।
কালেহ কুর্দের নিদর্শনগুলোর বয়স নির্ধারণ নির্ভর করে এমন কিছু কৌশলের উপর, যা মাটিচাপা পদার্থের ভেতরে জমে থাকা প্রাকৃতিক বিকিরণ পরিমাপ করে—যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ইলেকট্রন স্পিন রেজোন্যান্স এবং ইউরেনিয়াম-থোরিয়াম ডেটিং। সহজ কথায়, এই পরীক্ষাগুলো অনুমান করে যে, কোনো নমুনা মাটির নিচে কতদিন চাপা ছিল, তার ভেতরে সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে জমে থাকা বিকিরণের পরিমাণের ভিত্তিতে।
ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। "সাংস্কৃতিক স্তর"—অর্থাৎ যে মাটির স্তরে প্রাচীন সরঞ্জাম ও নিদর্শন পাওয়া গেছে—তার বয়স ৪,৫২,০০০ বছরেরও বেশি নির্ধারিত হয়েছে। এর ফলে কালেহ কুর্দ হয়ে উঠেছে ইরানের মালভূমিতে মানুষের উপস্থিতির পরিচিত সবচেয়ে প্রাচীন স্থান, এবং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীনতম নিদর্শনও।
২০২৫ সালের জুনে আসর ইরান-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াহদাতিনসাব বলেন, "আমরা এমন এক ধরনের মানুষের কথা বলছি, যারা কালেহ কুর্দ গুহায় সাম্প্রতিকতম বয়স নির্ধারণ অনুযায়ী প্রায় ৪,৫৫,০০০ বছর আগের।" তিনি আরও বলেন, "এই বয়স চূড়ান্ত নয়। সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসাবেও, আমরা অনুমান করি এই নিদর্শনগুলো ৬,৫০,০০০ থেকে ৭,০০,০০০ বছর পর্যন্ত পুরনো হতে পারে।"
নিয়ান্ডারথালদের আগে কারা এখানে বাস করতে পারত, তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "আধুনিক মানুষ পৃথিবীতে এসেছে মাত্র ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ বছর আগে।" "আমাদের আগে অন্য প্রজাতির মানুষ ছিল। ইরানে নিয়ান্ডারথালরা প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৪,০০,০০০ বছর আগে পর্যন্ত এই ভূখণ্ড দখল করে ছিল। আরও পেছনে গেলে, ইরানের মালভূমিতে বাস করত মানুষের অন্য প্রজাতি—যাদের আমরা আর নিয়ান্ডারথাল বলি না। আমরা তাদের বলি হোমো হাইডেলবার্গেনসিস, অথবা সম্ভবত হোমো ইরেক্টাস।"
কালেহ কুর্দে এখনও সেই আগের মানুষদের কোনো হাড় পাওয়া যায়নি। তবে দলটি কিছু পরোক্ষ প্রমাণ পেয়েছে—নিয়ান্ডারথাল যুগের আগেকার স্তরে পাওয়া পাথরের সরঞ্জাম এবং ভাঙা পশুর হাড়, যা শিকারের প্রমাণ বহন করে।
কালেহ কুর্দের প্রবেশপথে কাজ করতে ধৈর্যের প্রয়োজন হয়েছে। বৈজ্ঞানিক দল পৌঁছানোর অনেক আগেই কিছু ভূপৃষ্ঠসংলগ্ন জায়গা অবৈধ খননের কারণে বিঘ্নিত হয়েছিল, যা স্থানটির মানচিত্র তৈরিকে শুরুতেই একটি চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছিল।
ওয়াহদাতিনসাব বলেন, "আমাদের সামনে দুটি বিকল্প ছিল: নতুন একটি গর্ত খোঁড়া, অথবা আগে থেকে বিঘ্নিত মাটির মধ্য দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা।"
"আমরা হাত দিয়ে তা চেলে দেখেছি। অনেক প্রাসঙ্গিক তথ্য হারিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তারপরও সেই মাটি থেকে হাজার হাজার হাড় ও পাথরের সরঞ্জামের টুকরো বেরিয়ে এসেছে।"
২০১৮ সালে খননের প্রথম মৌসুম মূলত এভাবে নিদর্শন উদ্ধারেই কেটে যায়। এরপর ২০১৯ সালে দ্বিতীয় মৌসুমে দলটি একটি শিশু নিয়ান্ডারথালের দুধ-দাঁত খুঁজে পায়, যার বয়স প্রায় ১,৫৫,০০০ বছর নির্ধারিত হয়েছে। এই দাঁতটি এখন কাজভিন জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে।
এরপর কোভিড-১৯ মহামারি তিন বছরের জন্য কাজ বন্ধ করে দেয়, যে সময়টা গবেষকরা কাজে লাগান আগে সংগৃহীত নমুনার বিস্তারিত বয়স নির্ধারণে। ২০২১ সালে তৃতীয় মৌসুম দিয়ে খনন আবার শুরু হয়, এরপর ২০২২ সালে চতুর্থ মৌসুম এবং ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে পঞ্চম মৌসুম চলে।
প্রবেশপথে সতর্কভাবে আরও তিনটি মৌসুম খনন চালানোর পরও দলটি এখনও বিঘ্নিত মাটির প্রকৃত তলদেশে পৌঁছাতে পারেনি। ওয়াহদাতিনসাব বলেন, "আমরা এখন সাত মিটার নিচে নেমে এসেছি, তবু তলদেশে পৌঁছাইনি।" "এই সাত মিটার এমন বিপুল পরিমাণ তথ্যের প্রতিনিধিত্ব করে, যা কখনোই সম্পূর্ণভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।"
এই ক্ষতি সত্ত্বেও, বৈজ্ঞানিকভাবে খনন করা স্তরগুলো থেকে পাওয়া গেছে বিলুপ্ত গুহা-হায়েনার (বর্তমান জীবিত হায়েনার চেয়ে দুই-তিন গুণ বড়) দেহাবশেষ, সেইসঙ্গে বিলুপ্ত গুহা-ভালুক, লোমশ দুই-শিংওয়ালা গণ্ডার এবং প্রাগৈতিহাসিক ঘোড়ার একাধিক প্রজাতির অস্তিত্বের প্রমাণ।
নিয়ান্ডারথালদের আগে এখানে কে বাস করত?
দলটি যত গভীরে খনন করছে, ছবিটা তত পুরনো—এবং তত রহস্যময়—হয়ে উঠছে। সদ্য পাওয়া একটি মানুষের দাঁত, যার বয়স আনুমানিক ১,৮০,০০০ বছর, গত বছর জাতীয় জাদুঘরের একটি প্রদর্শনীতে উন্মোচিত হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ মৌসুমের স্তরগুলো, যা ৪,৫৫,০০০ বছরের চিহ্নের কয়েক মিটার নিচে অবস্থিত, এখনও পরীক্ষাগারের ফলাফলের অপেক্ষায় আছে।
সহকর্মীদের মধ্যে প্রচলিত একটি পুরনো প্রবাদ উল্লেখ করে ওয়াহদাতিনসাব বলেন, "বিলুপ্ত মানুষের জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া অনেকটা লটারি জেতার মতো।"
শত সহস্র বছর ধরে মাটির নিচে টিকে থাকা সংরক্ষিত মানব দেহাবশেষ অত্যন্ত বিরল—আর সেই কারণেই দলটি মূলত পরোক্ষ প্রমাণের উপর নির্ভর করে, যেমন সরঞ্জাম এবং কসাই করা পশুর হাড়, যা দিয়ে তারা পুনর্গঠন করার চেষ্টা করেন যে কে এবং কখন এই গুহায় বাস করত।
তিনি বিশ্বাস করেন, কালেহ কুর্দ শেষ পর্যন্ত হয়তো ইরাকি কুর্দিস্তানের শানিদার গুহা সহ এই অঞ্চলের যেকোনো নিশ্চিত নিয়ান্ডারথাল স্থানের চেয়েও প্রাচীন প্রমাণিত হবে—শানিদার গুহাকে মাঝে মাঝে তার এগারোটি দেহাবশেষ সংগ্রহের জন্য "নিয়ান্ডারথাল স্বর্গ" বলা হয়।
তিনি জর্জিয়ার দমানিসির কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে ১৭ লক্ষ ৭০ হাজার বছর পুরনো খুলি পাওয়া গেছে, এটিকে একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখিয়ে যে প্রাথমিক মানব পূর্বপুরুষরা এশিয়া পাড়ি দেওয়ার পথে হয়তো ইরানের মধ্য দিয়েই গিয়েছিলেন—যা কালেহ কুর্দ শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করতে সাহায্য করতে পারে।
একটি স্থান, যা এখনও রহস্যে পরিপূর্ণ
কালেহ কুর্দের দৈনন্দিন জীবন পুনর্গঠনের চেষ্টা থেকে কিছু আকর্ষণীয় তত্ত্ব সামনে এসেছে। গুহার সামনের উপত্যকায় একটি নদী আছে, আর গবেষকদের ধারণা, নিয়ান্ডারথালরা হয়তো বন্য ঘোড়ার পাল সেদিকে তাড়িয়ে নিয়ে দুই দিক থেকে ফাঁদ পেতেছিল—এমন প্রাণীর জন্য এটি ছিল এক সমন্বিত শিকার-কৌশল, যাকে অন্য কোনোভাবে ধরা প্রায় অসম্ভব ছিল কারণ এরা অতিরিক্ত দ্রুতগামী।
অন্যান্য নিয়ান্ডারথাল স্থান থেকে পাওয়া কঙ্কালের প্রমাণে দেখা যায় হাত, কলারবোন ও পাঁজরে পুরনো ভাঙা অংশ, যা পরে সেরে গিয়েছিল—যা থেকে বোঝা যায়, নারী-পুরুষ উভয়েই বিপজ্জনক শিকারে অংশ নিতেন এবং তাদের ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।
ওয়াহদাতিনসাবের অনুমান, এই স্থানে আরও অন্তত এক দশক ধরে টানা খননকাজ প্রয়োজন হবে। ইতিমধ্যে এ বছরের আগস্টের মাঝামাঝি সপ্তম মৌসুমের কাজ শুরু হয়ে গেছে।
আপাতত, প্রতিটি নতুন মৌসুম গল্পে যোগ করছে আরেকটি নতুন স্তর—কখনো কখনো একেবারে আক্ষরিক অর্থেই—যা ইরানে মানব-জীবনের রেকর্ডকে প্রতিবারই আরও পেছনের অতীতে ঠেলে দিচ্ছে।#
পার্সটুডে/এমএএআর/১৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।