কাজভিন: ইরানের শতাব্দীপ্রাচীন ক্যালিগ্রাফি ঐতিহ্যের স্পন্দিত হৃদয়
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i163116-কাজভিন_ইরানের_শতাব্দীপ্রাচীন_ক্যালিগ্রাফি_ঐতিহ্যের_স্পন্দিত_হৃদয়
পার্সটুডে: তেহরান থেকে ১৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে, ইরানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত কাজভিন শহর শত শত বছর ধরে ফার্সি ক্যালিগ্রাফি শিল্পের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ধর্মীয় মাদ্রাসা, কুরআন পড়াশোনা, রাজার পৃষ্ঠপোষকতা আর গুরু-শিষ্যের পুরনো রীতি—এসব মিলেই কাজভিনকে ক্যালিগ্রাফি ও পাণ্ডুলিপি তৈরির একটি বড় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।
(last modified 2026-09-15T13:12:01+00:00 )
সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬ ১৯:০০ Asia/Dhaka
  • কাজভিন: ইরানের শতাব্দীপ্রাচীন ক্যালিগ্রাফি ঐতিহ্যের স্পন্দিত হৃদয়

পার্সটুডে: তেহরান থেকে ১৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে, ইরানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত কাজভিন শহর শত শত বছর ধরে ফার্সি ক্যালিগ্রাফি শিল্পের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ধর্মীয় মাদ্রাসা, কুরআন পড়াশোনা, রাজার পৃষ্ঠপোষকতা আর গুরু-শিষ্যের পুরনো রীতি—এসব মিলেই কাজভিনকে ক্যালিগ্রাফি ও পাণ্ডুলিপি তৈরির একটি বড় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।

প্রেস টিভির বরাত দিয়ে পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ষোড়শ শতাব্দীতে সাফাভি আমলে এই শহর তার সেরা সময় পার করে। তখন শাহ তাহমাস্‌প কাজভিনকে রাজধানী বানান এবং একটি রাজকীয় গ্রন্থাগার ও কর্মশালা তৈরি করেন, যেখানে ক্যালিগ্রাফাররা চিত্রশিল্পী ও স্বর্ণচিত্রকরদের সাথে কাজ করতেন। এই সময়েই নাস্তালিক লিপি আরও সুন্দর ও নিখুঁত রূপ পায়, যা ফার্সি ক্যালিগ্রাফির ইতিহাসে কাজভিনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

কাজভিন বিশেষভাবে পরিচিত "কাজভিন ঘরানা" নামে—এক বিশেষ ধরনের গুরু-শিষ্য প্রশিক্ষণ আর নিজস্ব সৌন্দর্যবোধের জন্য। এই ঘরানার সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষ হলেন মির-ইমাদ হাসানি কাজভিনি, যাকে নাস্তালিক লিপির সবচেয়ে বড় শিল্পীদের একজন এবং শহরের ক্যালিগ্রাফি ঐতিহ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বলে মনে করা হয়।

কাজভিনের পুরনো পাড়া ও মাদ্রাসায় একসময় বহু প্রজন্মের লেখক-শিল্পীরা হাতে নলখাগড়ার কলম নিয়ে মোমবাতির আলোয় বসে যত্ন করে অক্ষর লিখতেন। এই শহর বহুদিন ধরে হাতে লেখার শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে—এমন এক ঐতিহ্য যা ইরানের ইতিহাসে বহু শতাব্দী ধরে টিকে আছে।

সাফাভি আমলে ক্যালিগ্রাফি চর্চার ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হতো

ক্যালিগ্রাফি কেন্দ্র হিসেবে কাজভিনের এই খ্যাতি এমন একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে এসেছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কুরআন পড়াশোনার মাদ্রাসা, রাজার পৃষ্ঠপোষকতা আর গুরু-শিষ্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে টিকে থেকেছে। এই পুরনো ঐতিহ্যের কারণেই কাজভিন ইরানের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে "ইরানি ক্যালিগ্রাফির রাজধানী" হিসেবে একটি বিশেষ জায়গা পেয়েছে।

ক্যালিগ্রাফির সাথে কাজভিনের সম্পর্ক অনেক পুরনো

ক্যালিগ্রাফির সাথে কাজভিনের সম্পর্ক বহু শতাব্দী পিছিয়ে যায়। ইসলামের একদম শুরুর দিকেই এই শহর জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, যেখানে কুরআন ও হাদিস পড়ানোর মাদ্রাসা ছিল। ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক বই হাতে নকল করার ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন থেকেই পেশাদার লেখকদের একটা ঐতিহ্য গড়ে ওঠে।

শুরুর দিকের লেখাগুলো বেশিরভাগই ছিল কুফি লিপিতে (ইসলামি ক্যালিগ্রাফির প্রথম রীতি), পরে এর জায়গায় আসে বেশি সহজ ও প্রবাহমান নাসখ লিপি। হিজরি সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে, গ্রন্থাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ার সাথে সাথে ক্যালিগ্রাফি শুধু একটা দরকারি দক্ষতা না থেকে ধীরে ধীরে একটা পূর্ণাঙ্গ শিল্পে পরিণত হয়।

মাদ্রাসা ও সুফি খানকাহগুলো এই বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে ওঠে। কুরআন, সাহিত্য আর অন্যান্য বই পড়াশোনার পাশাপাশি নিখুঁত ক্যালিগ্রাফি শেখানো হতো, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী কাজভিনের সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হয়ে থাকা এক ঐতিহ্য গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি কাজভিন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আসে, যখন সাফাভি শাসক শাহ তাহমাস্‌প এই শহরকে রাজধানী বানান। এর ফলে রাজদরবারের পাশাপাশি একটি রাজকীয় গ্রন্থাগার, ছবি আঁকা ও স্বর্ণচিত্রণের কর্মশালা এবং ফার্সি ভাষাভাষী বিশ্বের নানা প্রান্তের শিল্পী-পণ্ডিতরা এই শহরে চলে আসেন।

ইরানে ক্যালিগ্রাফি চর্চা

রাজকীয় কর্মশালাগুলোতে কুরআন, কবিতার বই ও ইতিহাসের গ্রন্থ তৈরি হতো, যেখানে ক্যালিগ্রাফাররা চিত্রশিল্পী ও স্বর্ণচিত্রকরদের সাথে একসাথে কাজ করতেন। একটা পাণ্ডুলিপিতে অনেক বিশেষজ্ঞের কাজ থাকতে পারত, আর হাতের লেখার মানকে তার চারপাশের ছবি-নকশার মতোই গুরুত্ব দেওয়া হতো।

এই সময়েই আগের ইরানি মাস্টারদের হাতে তৈরি নাস্তালিক লিপি আরও সুন্দর হয়ে ওঠে, আর কাজভিন এই লিপির বিকাশের একটা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

সাফাভি দরবারে বই খুবই মূল্যবান জিনিস হিসেবে গণ্য হতো, তাই বই তৈরি করাও ছিল এক রকম শিল্প ও কারিগরির চর্চা। সুন্দর লেখার এই চাহিদাই যারা ক্যালিগ্রাফি করতেন তাদের কাজের মান আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।

কাজভিন ঘরানা ও মির-ইমাদ

ফার্সি ক্যালিগ্রাফির ইতিহাসবিদরা প্রায়ই "কাজভিন ঘরানা"-র কথা বলেন—এই শহরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা শেখানোর পদ্ধতি, সৌন্দর্যবোধ আর গুরু-শিষ্য ঐতিহ্যের একটা সম্মিলিত রূপ।

আগেকার দিনের প্রশিক্ষণে একজন শিক্ষার্থীকে হয়তো বছরের পর বছর গুরুর কাছে শুধু আলাদা আলাদা অক্ষর অনুশীলন করতে হতো—কলম ধরার কোণ, চাপের পরিমাণ, মোটা-চিকন রেখার ভারসাম্য। শুধু আলাদা অক্ষরে দক্ষ হওয়ার পরই একজন শিক্ষার্থী শব্দ লেখা এবং তারপর পুরো লেখা তৈরির দিকে এগোতে পারতেন।

এটা এমন একটা অনুশাসন ছিল যা ধৈর্য ধরে, অক্ষরে অক্ষরে গড়ে উঠত—এভাবেই তৈরি হতেন এমন ক্যালিগ্রাফাররা যাদের নাম শেষ পর্যন্ত কাজভিনের সীমানা ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ত।

কাজভিনের সাথে মির-ইমাদ হাসানি কাজভিনির নামের মতো এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত আর কোনো নাম নেই। তিনি হিজরি দশম শতাব্দীর শেষ ভাগে এই শহরে জন্ম নেন এবং প্রায় ছোটবেলা থেকেই ক্যালিগ্রাফিতে অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে পরিচিত ছিলেন।

ইরানে ক্যালিগ্রাফি চর্চা

তরুণ মির-ইমাদ, নিজের শিল্পে আরও ভালো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, মোল্লা মোহাম্মদ-হোসেন তাবরিজির কাছে শিখতে কাজভিন ছেড়ে তাবরিজে চলে যান। একদিন তিনি এমন সুন্দর একটা লেখা তার গুরুকে দেখান যে, মোল্লা মোহাম্মদ-হোসেন—না জেনে যে এটা তার নিজের ছাত্রেরই লেখা—বলে ওঠেন, "তুমি যদি এভাবে লিখতে পারো, তাহলে লেখো, নয়তো কলম রেখে দাও।"

যখন মির-ইমাদ জানান যে এই লেখা তারই, তখন তার গুরু সেই কাগজ আর তরুণ ক্যালিগ্রাফারের মুখ—দুটোই চুমু খান এবং বলেন, "আজ থেকে তুমিই ক্যালিগ্রাফারদের গুরু।"

ইতিহাস বলে, তার দক্ষতা আর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সেমনান, দামগান, বোস্তাম, তাবারেস্তান, খোরাসান আর গিলানে, আর শেষে জীবনের শেষ দিকে তিনি চলে যান ইসফাহানে—শাহ আব্বাসের আমলে সাফাভি সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানীতে।

মির-ইমাদের বিশেষত্ব ছিল তার লেখার নরমতা আর সামঞ্জস্যে—অক্ষরগুলোর মধ্যে এমন এক মসৃণ প্রবাহ, যাকে অনেকে নাস্তালিক ক্যালিগ্রাফির সবচেয়ে উঁচু স্তর বলে মনে করেন। প্রায় চারশ বছর ধরে ক্যালিগ্রাফাররা তার লেখা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

একসময় সুন্দর লেখার মানেই ছিল মিরের মতো লেখা। যারা এতে সফল হতেন, তারা "দ্বিতীয় মির" বা "তৃতীয় মির" মতো উপাধি পেতেন। কেউ কেউ তো নিজের লেখায় "মির-ইমাদ আল-হাসানি" নাম দিয়েই স্বাক্ষর করতেন—এটাই বলে দেয় পরবর্তী ক্যালিগ্রাফারদের ওপর তার নামের প্রভাব কতটা গভীর ছিল।

মির-ইমাদ কাজভিনের সবচেয়ে বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার হয়ে থাকলেও, শহরের ক্যালিগ্রাফি ঐতিহ্যের শিকড় আরও অনেক গভীরে।

মির্জা মোহাম্মদ-হোসেন এমাদ-অল-কেতাব কাজভিনি এবং মির্জা মোহাম্মদ-আলি খিয়ারজি কাজভিনি—যাকে পাখির আকৃতিতে আরবি শব্দ "বিসমিল্লাহ" লেখা প্রথম ক্যালিগ্রাফারদের একজন বলে মনে করা হয়—তারাও শহরের বিখ্যাত মানুষদের মধ্যে পড়েন।

এদের সাথে আছেন আব্দোল-মজিদ তালেকানি, শিকাস্তা নাস্তালিক লিপির গুরু, যিনি মির-ইমাদের একশ বছরেরও বেশি পরে বেঁচে ছিলেন, আর মালেক-মোহাম্মদ কাজভিনি, যিনি কাজার শাসক ফাতহ-আলি শাহের সময়ে সাজানো-গোছানো ক্যালিগ্রাফিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।

প্রবীণ ক্যালিগ্রাফার আহমাদ পিলেচি কাজভিনি—যিনি নিজে ১৯৭৫ সালে সৈয়দ আলি রাফিয়ি ও আবুল-হাসান মোহাসসেস-মোস্তাশারির কাছে শেখা শুরু করেন—তার মতে ইরানের অন্য কোনো শহর দাবি করতে পারে না যে তাদের এই শিল্পের তিনটি প্রধান ধারায় তিনজন করে বিখ্যাত মানুষ আছে, যেমনটা কাজভিনের আছে: নাস্তালিকে মির-ইমাদ, শিকাস্তা নাস্তালিকে তালেকানি, আর সাজানো-গোছানো ক্যালিগ্রাফিতে মালেক-মোহাম্মদ।

তিনি বলেন, "এই কারণেই মানুষ সাথে সাথেই কাজভিনকে ক্যালিগ্রাফি শিল্পের রাজধানী মনে করে।"

আজও বেঁচে আছে এই ঐতিহ্য

কাজভিনের ক্যালিগ্রাফি ঐতিহ্য আজও টিকে আছে—প্রতিষ্ঠান, গুরু আর তরুণ প্রজন্মের ক্রমাগত আগ্রহের মধ্য দিয়ে।

কাজভিন ক্যালিগ্রাফি সমিতি প্রশিক্ষণ কোর্স, প্রদর্শনী আর গবেষণা সভার আয়োজন করে, যা পুরনো পদ্ধতিগুলোকে জীবিত রাখছে।

দেশজুড়ে যত তরুণ এই শিল্প শিখছে, তার সংখ্যার দিক দিয়েও এই শহর সবার আগে আছে। অনেকেই স্কুলজীবনেই এর সাথে পরিচিত হয়, যখন ক্যালিগ্রাফি অনুশীলন সাধারণ সাংস্কৃতিক শিক্ষার একটা অংশ হিসেবে ধরা হয়।

শহরের মসজিদ, মাদ্রাসা আর পুরনো সরাইখানাগুলো ক্লাসরুমের বাইরেও এই ঐতিহ্যকে আরও শক্ত করে। এদের দেয়াল আর খিলানে ক্যালিগ্রাফির লেখা খোদাই করা আছে, যা তরুণ শিল্পীদের নিজ শহরে হাঁটতে হাঁটতেই আসল পুরনো লেখা দেখে শেখার সুযোগ দেয়।

সুন্দর লেখাকে এত গুরুত্ব দেওয়ার শিকড় আছে অনেক বড় একটা ইরানি ও ইসলামি ঐতিহ্যে। হযরত আলী (আ.)-এর একটা কথায় সুন্দর হাতের লেখাকে "জীবিকার একটা চাবি" বলা হয়েছে—যা দেখায় লেখার দক্ষতা আর নিয়মানুবর্তিতাকে মানুষ কতদিন ধরে কতটা মূল্য দিয়ে এসেছে।

আজও কাজভিনে এই মূল্যায়ন স্পষ্ট দেখা যায়, যেখানে ক্যালিগ্রাফি এখনো শেখানো হয়, চর্চা করা হয় আর প্রদর্শন করা হয়। পুরনো কৌশলগুলো নতুন ধরনের সাথে পাশাপাশি চলছে, যা শহরের এই ঐতিহ্যকে সক্রিয় রাখছে এবং নিশ্চিত করছে যে ক্যালিগ্রাফি কাজভিনের সাংস্কৃতিক জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েই থাকবে।#

পার্সটুডে/এমএএআর/১৫