রেডিও তেহরানের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
রেডিও তেহরানে দুই দশক
সূচনা পর্ব: ঢাকা ভার্সিটি থেকে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে কলেজে শিক্ষকতা করছিলাম। ক'বছর শিক্ষকতার পর অধ্যক্ষের দায়িত্বভার কাঁধে চলে এলো। সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার সুবাদে শিক্ষকতাকালেও বিদেশি কালচারাল সেন্টারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ইরানিয়ান কালচারাল সেন্টারেও যাওয়া আসা ছিল। সেন্টারের সঙ্গে যেসব সাংবাদিক ও সাহিত্যিক অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হতেন তাঁদের কাতারে ক্ষুদ্র আমার নামটিও ছিল।
এরকমই এক অনুষ্ঠানের পর কথা হচ্ছিলো সে সময়কার প্রথিতযশা সাংবাদিক মাসুদ মজুমদার ভাইয়ের সঙ্গে। সাথে ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক মরহুম গিয়াস কামাল চৌধুরীও। কিছু কিছু মানুষ আছে কোনো কারণ ছাড়াই তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা এসে যায়। গিয়াস কামাল চৌধুরী এবং মাসুদ ভাই ছিলেন তেমনি দু'জন ব্যক্তিত্ব। সম্ভবত তাঁদের জ্ঞান, প্রজ্ঞার সঙ্গে বিনয়ের মিশেল আমার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। আমিও ছিলাম তাঁদের স্নেহধন্য অথচ প্রিয় অনুজ। ড. আব্দুল ওয়াহেদ ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ববর্গের সম্মিলনের হৃদয়সূতো। শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে অগ্রজ-অনুজ নির্বিশেষে দেশজুড়ে প্রায় সকল মেধাবি প্রতিভাগুলোর সঙ্গে নিবীড়ভাবে সংযুক্ত ছিলেন তিনি। আলাপ প্রসঙ্গে মাসুদ ভাই বললেন: রেডিও তেহরানের জন্য একজন ভালো জার্নালিস্ট দরকার।
ড. ওয়াহেদ: কী রকম?
মাসুদ মজুমদার: ইংরেজি-বাংলা অনুবাদসহ সুকণ্ঠের অধিকারী হলে ভালো হয়।
ড. ওয়াহেদ আমার দিকে তাকিয়ে মজা করে বললেন: এরকম যোগ্যতার অধিকারী তো আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।
মাসুদ মজুমদার আমার দিকে তাকিয়ে রসিকতা করে বললেন: প্রিন্সিপ্যাল স্যার কি যাবেন নাকি!
আমি কোনো জবাব দিলাম না।
মাসুদ ভাই বললেন: ভেবে দেখুন, একটু দ্রুত জানাবেন। আপনি রাজি হলে তো আর কথাই নেই।
পরদিন ওয়াহেদ ভাইয়ের অফিসে যাবার আমন্ত্রণ পেলাম। বিশাল হৃদয়ের এই মানুষটি ছিলেন অন্য রকম অতিথি পরায়ন। রেডিও তেহরান সম্পর্কে আরও জানলাম। উনিও আমাকে ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিলেন।
ছোটোবেলা থেকেই সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা করতাম। কলেজের গুরুদায়িত্ব পালনের পথটি খুব মসৃণ ছিল না। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও ছিল। এই সত্যটি কেউ স্বীকার করুক বা না করুক অপ্রিয় হলেও শতভাগ ধ্রুব। মনে মনে এই সোনার কণ্টকাকীর্ণ চেয়ার ছেড়ে পালাবার পথও খুঁজছিলাম। আমার আব্বা সে সময় ঢাকায় ছিলেন আমার ভাইয়ের বাসায়। আমি সকাল এবং রাতে তাঁর সাথে দেখা করতে যেতাম কিন্তু দেখা হতো না। সকালে তিনি মোরাকাবায় লম্বা সময় কাটাতেন। রাতে আমার ফেরার আগেই তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন। এভাবে সপ্তাখানেক যাবার পর বন্ধ পেলাম এবং পুরোটা সময় আব্বার সঙ্গে কাটানোর জন্য বাসায় গেলাম। মজার ব্যাপার হলো বেশ কিছুদিন আগে বিটিভি-তে নিউজ প্রেজেন্টেশনের জন্য অডিশন দিয়েছিলাম। সেকথা ভুলেও গিয়েছিলাম প্রায়। অনেকদিন পর আমার বাসার ঠিকানায় বিটিভি থেকে একটা চিঠি এলো। ওই চিঠি নিয়েই গেলাম আব্বার কাছে। আমার আব্বা ছিলেন শিক্ষক। খুবই স্বল্পভাষী এবং দূরদর্শী। আব্বাকে চিঠির কথা এবং রেডিও তেহরানের কথা সব বললাম বিস্তারিত। তিনি খুব সংক্ষেপে জবাব দিলেন: দেখো বাবা! আমি আজ এক সপ্তা এখানে অথচ তোমার ব্যস্ততার কারণে কথা বলারও সুযোগ হয় নি বা হচ্ছে না। সুতরাং তোমার ইরানে থাকা আর ঢাকায় থাকা আমার কাছে সমান-কোনো পার্থক্য নেই। ইরান একটা ইসলামি দেশ। সেখানকার কাজটাও তোমার উপযোগী। এখন অধ্যক্ষের বিশাল দায়িত্ব ছেড়ে যেতে যদি তোমার খারাপ না লাগে তাহলে রেডিও তেহরানই তোমার জন্য ভালো হবে বলে আমি মনে করি।
দু হাজার এক সালের কথা। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা-কণ্ঠস্বর, রিপোর্ট তৈরি, ইংরেজি পত্রিকা থেকে বাংলায় প্রতিবেদন তৈরি ইত্যাদি-বিচিত্র কর্মপর্ব শেষ হলো। বিভিন্ন পত্রিকায় করা আমার কিছু প্রতিবেদনও পাঠাতে হলো। কিছুদিন পর আমি রেডিও তেহরানের ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে যোগদানের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পেলাম।
আব্বার কথায় কলেজ ছেড়ে ইরানে যাবার প্রতিই আগ্রহের আধিক্য প্রকাশ পেয়েছিল। আমি পরদিনই সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান-বর্তমানে শিল্প প্রতিমন্ত্রী-কামাল আহমেদ মজুমদার এম.পি'র সঙ্গে দেখা করে ছুটির আবেদন জানালাম। তিনি ছিলেন তৎকালীন সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী পদাধিকার বলে আমাদের কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান। রেগে গেলেন। বললেন: এতো বড় একটা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যেতে আপনার একটুও খারাপ লাগছে না? এখানে বলে রাখা ভালো ওনার নির্বাচনী এলাকার সকল স্কুল-কলেজের যে-কোনো সমস্যা সমাধানে তিনি আমাকে নির্ভরযোগ্য মনে করতেন এবং একটা কমিটি গঠন করে আমার ওপর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতেন। আমি বুঝতে পেরে বললাম: ভালো না লাগলে আমি চলে আসবো।
কদিন পর আবারও গেলাম। তিনি দয়া করে এক বছরের ছুটি মঞ্জুর করলেন। কলেজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তেরো জুলাই তেহরানের উদ্দেশে জীবনে প্রথমবারের মতো বিমানে উড়লাম। দুবাইতে ট্রানজিট সেরে তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে যখন নামলাম তখন বিকেল। হ্যাঙ্গারে পা রাখতেই মনে হলো বেশ পরিচ্ছন্ন সবকিছু। ইমিগ্রেশন, চেক-আপ, ব্যাগেজ ক্লেইম সব সেরে বেরিয়ে এলাম বাইরে। সহকর্মী সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে তৎকালীন পরিচালক মাহফুজুল হক আমাকে স্বাগত জানাতে এয়ারপোর্টের অ্যারাইভাল লাউঞ্জে অপেক্ষায় ছিলেন। সিরাজ ভাই বেশ সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। আমরা একসঙ্গেই ঢাকায় পরীক্ষাপর্বের কাজগুলো করেছিলাম। সাংবাদিক মাসুদ মজুমদার সিরাজ ভাইয়ের স্ত্রীর দুলাভাই। মাসুদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার শ্রদ্ধা-স্নেহের আদান-প্রদান দীর্ঘদিনের হলেও সিরাজ ভাইকে চেনা হলো পরীক্ষাকালে। তিনি লাগেজগুলো দ্রুত টেনে নিয়ে গাড়িতে রাখলেন। এরপর গাড়ি ছেড়ে গেল সোজা আমার থাকার ঘরের দিকে। ইরানের জাতীয় সম্প্রচার কেন্দ্রের ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বিদেশি সাংবাদিকদের সরকারি বাসভবন। যাবার পথে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বুঝলাম প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইরান-কথাটি যথার্থ। পুরো শহরটাই সাজানো গোছানো। রাস্তায় কোনো ধুলোবালি নেই। আকাশটাও স্পষ্ট নীল মানে একেবারেই দূষণমুক্ত। কবিমন সুন্দরের পিয়াসী। দীর্ঘ মরু-তৃষ্ণার্ত মনে যেন বৃষ্টির ফোঁটার শিকরের মতো সিক্ত একটা আমেজ বুলিয়ে গেল। রূপই তো আকর্ষণ করে আগে। গুণের বিচার তো তারপরেই করতে হয়। আমার নান্দনিক মন ওই রূপের মধুবনের ফুলে ফুলে মৌমাছির মতো বসে গেল।
ইরান-পর্ব:
পরিচালকের সঙ্গে কূশল বিনিময় হলো। সুদর্শন। খুবই কম কথা বলেন। আমি তো তারও চেয়ে কম। সুতরাং খুব একটা জমলো না। কথাবার্তা জমানোর মতো প্রসঙ্গও ওঠে নি। অভ্যর্থনা-আপ্যায়ন পর্ব শেষে যে যার বাসায় চলে গেল। আমি থেকে গেলাম আমার অপর এক কলিগ-সোহেল ভাই-এর সঙ্গে। সেই সোহেল ভাই এখন ড. সোহেল আহম্মেদ। এই ফ্ল্যাটে চারজন-আমিসহ-ব্যাচেলরের থাকার আয়োজন করা হয়েছিল। কমপ্লেক্সের বাকি কোয়ার্টারগুলোতে সহকর্মীরা ফ্যামিলি নিয়েই থাকে। আমার বাকি দুই কলিগ-সাইদ এবং মুজাহিদ-তখনও অফিসে। আমাকে আমার থাকার রুমটা দেখিয়ে দিলো সোহেল ভাই। জামা-কাপড়ে লেগে থাকা ক্লান্তিগুলো ঝেড়ে ফেলে বিশ্রাম নিলাম।
ইরানে সন্ধ্যা হয় বেশ দেরিতে মানে এখানকার রাতের তুলনায় দিন খানিকটা বড়। অন্যভাবে বলা যায় আঁধারের চেয়ে আলোর পরিমাণটা বেশি। অভিলাষী মন ঘরে বন্দী ছিলো না কখনই। এখন কী করে থাকে। ঢাকাতেই সিরাজ ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল আমার। পরিচয়ের খেসারত তো দিতেই হবে। যে-কোনো নতুন জায়গায় গেলে আশপাশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটা স্বভাব আমার বেশ পুরোণো। এখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার ক্লান্ত সূর্যের অস্তবেলার আকাশ দেখার ইচ্ছে পূরণ করার পাশাপাশি প্রাচীন স্বভাব চর্চারও ইচ্ছে জাগলো মনে। সিরাজ ভাইকে নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। পদ্মা-মেঘনার মতো পাশাপাশি হাঁটছি, ঘুরছি, ফিরছি। মাঝে মাঝে সিরাজ ভাইয়ের ইরান-প্রীতি আর ভালোবাসার আবেগিভাষ্য কবিতার মতো আমাকে বিদ্ধ করলো। সেই আবেগের ধোঁয়াশায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিলাম। আঁধার নেমে এলো। কী সুন্দর আলো জ্বলে উঠলো। সেই আলো অজান্তেই জুড়ে বসলো বিবাগী অন্তর। আ হা! মাঝে মাঝে আত্মহারা হয়ে পড়ার আনন্দটাই অন্যরকম। এই আনন্দ অলৌকিক। বিধাতা সবাইকে দেন না। যাদের দেন তাদের প্রতি তাঁর করুণা অপার।
রাতেই বাকি দুই কলিগ-মুজাহিদ,সাইদ-এর সঙ্গে পরিচয় হলো। একটা আনন্দমুখর পরিবেশ তৈরি হলো। প্রবাসের প্রথম রাত্রি অতিথির মর্যাদায় কেটে গেল। পরদিন সকালে কমপ্লেক্সে লাল রঙের ফিতার মতো রঙীন দাগ দেওয়া ট্যাক্সি এলো। আমার কাছে পালকির মতো মনে হলো। তারপর এলো মিনিবাস। এই বাসেই আমরা উঠলাম। অফিসের পথেই পড়লো পরিচালকের বাসা। একসঙ্গে ওঠা হলো, ফেরার সময় নামাও হলো। বিমানবন্দরের মতো চেক-আপ সেরে ঢুকতে হলো ইরানের জাতীয় সম্প্রচার কেন্দ্রের প্রধান কমপ্লেক্সে। এখন সেই চেক-আপের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। আসার পথেই সিরাজ ভাই অফিসের চারপাশ সম্পর্কে কবিতার চিত্রকল্পের মতো একটা আবৃত্তি করলেন যেন। আমি সেই চিত্রকল্পের সঙ্গে মেলাচ্ছিলাম চারদিক। অফিসে প্রথম দিন পরিচয়পর্বেই সীমিত থাকলো। অনেক নিয়ম-কানুনের সিঁড়ি ভাঙতে হলো। খুব দ্রুতই হয়ে গেল সব। অবশেষে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করলাম। অফিসে ঢোকার কার্ড পেলাম, খাবারের কার্ড পেলাম এবং ইরানে বসবাসের অনুমতি-রেসিডেন্স পারমিট-পেয়ে গেলাম। যেখানেই গিয়েছিলাম-এখনও মনে পড়ে-খুবই সম্মান এবং মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছিলাম। ইরানিদের আতিথেয়তার মায়াজালে আটকে গেলাম এবং এক বছরের ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পরও ওই জাল থেকে মুক্ত হতে পারলাম না। তখনকার জালটি ছিল মায়ার। আজও কই মাছের মতোই জালে আটকে আছি। আজকের জালটি বেড়াজাল।
বাল্য বিয়ের মতো খুব দ্রুতই ফার্সি ভাষায় কাজ করতে বাধ্য হলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে ফেললাম রেডিওর প্রধান কাজ হলো ইরানের সুমিষ্ট বাণী আপনাপন ভাষায় পৃথিবীর সকল প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া। কাজ করতে করতে ইরানকে তুলে ধরাই যেন আনমনে জীবনের ব্রত হয়ে দাঁড়ালো। আজ বলতে দ্বিধা নেই পৃথিবীর বাংলাভাষী মানুষ যে সকল অঞ্চলে বসবাস করে, তারা যে এখন ইরানের পক্ষে কথা বলছে, ইরানকে ভালোবাসছে, আধিপত্যবাদী বিশ্বের মোকাবেলায় ইরানের নীতির পক্ষে সোচ্চার হচ্ছে, সবই রেডিও তেহরান বাংলা বিভাগের অবদান। কূটনৈতিক মিশনগুলো কিংবা কালচারাল সেন্টারগুলোর পাশাপাশি রেডিও তেহরানেরও এই শিরোস্ত্রাণ অবশ্য প্রাপ্য। ইরানে বাংলা ভাষার একমাত্র মিডিয়া রেডিও তেহরান সেই চিঠি-যুগে শ্রোতাদের ওপর রেডিও'র অবিশ্বাস্য রকমের প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। হাজার হাজার চিঠিপত্রের কথা এখনও মনে পড়ে। আজো স্মৃতির ক্যানভাসে জ্বলজ্বলে সেসব চিঠির কথা। বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের ভূমিকার প্রশংসার কথা। রেডিও তেহরান বাংলার পক্ষে শত শত শ্রোতাক্লাবের তৎপরতার কথা। দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্রগুলোতে রেডিও তেহরানের সংবাদ ছাপানোর কথা। বুদ্ধিজীবী মহলেও অকপটে রেডিও তেহরানের নামোচ্চারণের কথা।
ছোট ছোট স্পুল বা রিলে ক্যাসেটের কালো ফিতার মতো চৌম্বক ফিতায় রেকর্ড করার যুগের কথা বলছি। সেই ফিতার পরতে পরতে ছিলো আমাদের অন্তরের বাণী। হৃদয়ের আঠায় জুড়ে জুড়ে এডিট করে আমরা ইরানের নাম, ঐশ্বর্য প্রবাহিত করেছি লক্ষ-কোটি মানুষের হৃদ-কাননে। সেই কাননে এখন ফুল ফুটেছে। তারা সুগন্ধি ছড়াচ্ছে। হাজারও ইরান-প্রেমি মানুষ এখন ভ্রমরের মতো সেই কাননে গিয়ে জড়ো হচ্ছে। ফিতার চৌম্বক প্রলেপ কত আগেই হয়েছে তিরোহিত। এসেছে ডিজিটাল যুগ। প্রযুক্তির কল্যাণে অনলাইনেও আমরা এখন সরব। একদিন হয়তো ট্রানজিস্টর রেডিওর মিটারব্যান্ড, ফ্রিকোয়েন্সি কিংবা বেতার-তরঙ্গগুলো তাদের অস্তিত্ব হারাবে। কিন্তু তারা ডিজিটাল বিশ্বের অন্তরমূলে ঠিকই গড়ে নেবে আপন নিবাস।
রেডিও তেহরানের বয়স এখন চার দশক মানে চল্লিশ বছর। সময়ের সঙ্গে তালে তালে আধুনিক প্রযুক্তিকে ধারন করে রেডিও তেহরান ঠিকই এগিয়ে যাবে আপন গতিতে। যেমনিভাবে ধাপে ধাপে এগিয়েছে অতীতেও।
সময় আর স্রোত নিত্য বহমান। ভাঙা-গড়ার নীরব সাক্ষী তারা। আমরা মানে রেডিও তেহরানও এই গতিময়তার সঙ্গী। একসময়কার আইআরআইবি এখন পার্সটুডে বাংলা। নামের পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই কিন্তু কাজে আমাদের গতি অনিবারই রয়ে গেছে। ১৯৮২ সালের ১৭ এপ্রিল যে রেডিওটি মাত্র ত্রিশ মিনিটের অনুষ্ঠান প্রচার করতো, সেই রেডিও এখন দেড় ঘণ্টার লাইভ অনুষ্ঠান প্রচার করছে। কেবল কি বেতার তরঙ্গে? না। তার পাশাপাশি ওয়েব-সাইটসহ সকল স্যোশাল মিডিয়ায়। রেডিও এককালে ছিল শোনার বিষয়, ওয়েব-সাইট আর স্যোশাল মিডিয়ার কল্যাণে রেডিও এখন দেখারও বিষয় হয়ে গেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লব পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত বাংলা রেডিও এখন মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র বিশ্বের বস্তুনিষ্ঠ খবরের গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই ক্রমোত্তরণ আমাকে আনন্দিত করে, আবেগে আপ্লুত করে বৈ কি।
কী নেই রেডিও তেহরানে! মানব জীবনের নিত্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ই রয়েছে। বিশ্বের ঘটনাবলি এবং তার বিশ্লেষণসহ ধর্ম-রাজনীতি, কুরআন-হাদিস, সাহিত্য-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস-ঐতিহ্য, জীবন পদ্ধতি, মনোদৈহিক স্বাস্থ্যের কথা, সভ্যতার ইতিকথা প্রভৃতি সবই রয়েছে রেডিও তেহরানে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু থেকে সকল বয়সের জনগোষ্ঠির জন্য রয়েছে যথোপযুক্ত অনুষ্ঠানমালা। রয়েছে পরমাণু সক্ষমতা, ন্যানো টেকনোলজিসহ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তিতে ইরানের অবিশ্বাস্য উন্নয়নের বয়ান। সময়ের সঙ্গে থেকেই ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি মেলে তৈরি করা হয় এইসব অনুষ্ঠান। রেডিওর অনুষ্ঠান শুনলেই প্রামাণ্য হয়ে উঠবে আমার এই দাবি। রেডিও তেহরান বাংলা বিভাগের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।#
নাসির মাহমুদ। সিনিয়র সাংবাদিক। বাংলা বিভাগ। রেডিও তেহরান।
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৬