স্মরণীয় ইতিহাস
আজ বিশ্বনবীর (সা) দাদার ওফাত ও সর্বোত্তম পরিবার গঠনের বার্ষিকী
আজ হতে ১৪৮৭ চন্দ্র-বছর আগে হিজরতের ৪৫ বছর আগে (দশ রবিউল আউয়াল) বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)’র দাদা আবদুল মুত্তালিব মক্কায় ইন্তিকাল করেন। এ সময় মহানবী (সা) ছিলেন মাত্র ৮ বছরের শিশু।
কুরাইশ গোত্রের ও এ গোত্রের হাশিমি শাখার প্রধান আবদুল মুত্তালিব ছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ)’র পুত্র হযরত ইসমাইল (আ)’র বংশধর। মহানবীর দাদা ছিলেন একত্ববাদী এবং ইব্রাহিম (আ)’র ধর্মের অনুসারী।
বাগ্মীতা ও মহৎ নানা গুণের জন্য খ্যাত আবদুল মুত্তালিব পবিত্র কাবা ঘরের দেখাশুনার ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতেন। পিতা মহান হাশিমের মৃত্যুর পর এই দায়িত্ব পান তিনি। সততা ও নানা মহৎ গুণের জন্য খ্যাত হাশিম ও তাঁর পূর্বপুরুষদের এক মহতী ধারা এর আগে এই দায়িত্ব পালন করতেন।
বিশ্বনবী (সা)’র বাবা আবদুল্লাহ এবং মা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের মৃত্যুর পর নাতি মুহাম্মাদের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করেছিলেন আবদুল মুত্তালিব।
আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর ৮ বছর আগে ইয়েমেনের ইথিওপীয় খ্রিস্টান গভর্নর আবরাহা পবিত্র কাবা ঘর ধ্বংসের জন্য মক্কার দিকে এক সেনাবাহিনী নিয়ে আসে। আবরাহার সেনারা আবদুল মুত্তালিবের উট-বহর আটক করে এই আশায় যে তাতে তিনি কাবা ঘরের সুরক্ষার জন্য আবরাহার কাছে ধর্না দিবেন। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব কেবল তাঁর উটগুলো ফেরত দেয়ার দাবি জানান। বিস্মিত আবরাহা এর কারণ জানতে চাইলে আবদুল মুত্তালিব অত্যন্ত শান্তভাবে জানান যে, ‘কাবা ঘরের নিজস্ব মালিক রয়েছে, তিনি নিজেই এ ঘর রক্ষা করবেন। আমি কেবল এইসব উটের মালিক।’ উটগুলো ফেরত দিতে রাজি হয় আবরাহা। তবে এই হুমকিও দেয় যে মক্কা দখলের পর এর সবই তাদের দখলে চলে আসবে। এরপর আবদুল মুত্তালিব কাবা ঘরে ফিরে এসে কাবা ঘর রক্ষার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন। এই প্রার্থনার পরপরই মুখে কঙ্কর বা ছোট পাথরের টুকরো নিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে আবির্ভূত হয় আবাবিল পাখি। এইসব পাথরের আঘাতে আবরাহার শক্তিশালী সেনাদল চর্বিত ঘাসের মতই পিষ্ট হয়ে যায়। (এ ঘটনা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয় সুরা ফিল)
বিশ্বনবী (সা)’র জন্ম হয়েছিল এ বছরই। দাদা আবদুল্লাহ মারা যাওয়ার আগ মুহূর্তে আবু তালিবকে শিশু মুহাম্মাদের (সা) অভিভাবক হতে অনুরোধ করেন। সহোদর ভাই আবদুল্লাহর ইয়াতিম শিশু মুহাম্মাদকে (সা) নিজের ছেলের মতই যত্ন করতে হবে বলে তিনি আবু তালিবের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। আবু তালিব সে দায়িত্ব যথাযথভাবেই পালন করেছিলেন।
আজ হতে ১৪৭০ চন্দ্র-বছর আগে হিজরতের ২৮ বছর আগে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও হযরত খাদিজার (সালামুল্লাহি আলাইহা) শুভ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল পবিত্র মক্কায়।
একত্ববাদী হযরত খাদিজা (সা.আ) সততা ও পবিত্রতার জন্য তাহিরা নামে খ্যাত ছিলেন। এই মহীয়সী নারী প্রবাদ-তুল্য বিপুল সম্পদের জন্য ‘আরবের রাণী’ নামেও খ্যাত ছিলেন। বাণিজ্য কাফিলার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল ওই বিপুল সম্পদ। দূরবর্তী আত্মীয় ও ভবিষ্যতের বিশ্বনবী (সা) তাঁর বাণিজ্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু অর্থ-সম্পদহীন ও নিঃস্ব ইয়াতিম মুহাম্মাদ (সা)’র সততা মুগ্ধ করেছিল হযরত খাদিজাকে। ফলে তিনি নিজেই মুহাম্মাদ (সা)’র কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান।
এভাবে এই নব-দম্পতির মাধ্যমে জন্ম নেয় মানব ইতিহাসের সর্বোত্তম পরিবার। তাঁর স্বামী মহান আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পেলে স্ত্রী খাদিজা (সা.আ)ই সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। (তাঁর পরপরই বা মতান্তরে প্রায় একই সময়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন বালক আলী-আ.)
মক্কার নির্যাতিত নও-মুসলিমদের ভরণ-পোষণের জন্য খাদিজা (সা.আ) তাঁর সমস্ত সম্পদ ব্যয় করেন। ফলে মৃত্যুর সময় তাঁর কোনো সম্পদই অবশিষ্ট ছিল না। বেঁচে-থাকা একমাত্র কন্যা ও মানব-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নারী ফাতিমা (সা.আ)’র জন্যও কিছু রেখে যাননি তিনি। উম্মুল মু’মিনিন খাদিজা (সা.আ) ছিলেন ২৫ বছর ধরে বিশ্বনবী (সা)’র একমাত্র স্ত্রী। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন মহানবী (সা) অন্য কাউকে বিয়ে করেননি। সামাজিক নানা প্রয়োজনে জীবনের শেষ দশ বছরে মধ্য-বয়সী মহানবী (সা) জাহিলি যুগের নানা কু-প্রথা দূর করতে কয়েকটি বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তিনি সে সময়ও প্রায়ই তাঁর আহলে বাইতের জননী প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদিজাকে (সা.আ) স্মরণ করতেন ও তাঁর দৃঢ় সাহায্য-সমর্থনসহ অতুলনীয় নানা ত্যাগ আর অবদানের স্মৃতি স্মরণ করে অশ্রুসিক্ত হতেন।
বিয়ের প্রকাশ্য ও গুপ্ত কারণগুলো
বস্তুবাদীরা যারা সব বিষয় ও জিনিসকে বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে তারা হয়তো ভাবতে পারে যে,যেহেতু খাদীজাহ্ ধনাঢ্যা মহিলা ও ব্যবসায়ী ছিলেন সেহেতু তাঁর ব্যবসায়িক কাজ-কর্ম দেখাশোনা করার জন্য অন্য কিছুর চেয়ে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। এ কারণে তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে বিয়ে করেন। আর যেহেতু হযরত মুহাম্মদও খাদীজার মর্যাদাসম্পন্ন জীবন সম্পর্কে অবগত ছিলেন,যদিও তাঁদের মধ্যে বয়সের দিক থেকে কোন মিল ছিল না তারপরও তিনি তাঁর বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন।
কিন্তু ইতিহাস থেকে বোঝা যায় যে,কুরাইশদের শ্রেষ্ঠ সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে তাঁকে যে সব বিষয় উদ্বুদ্ধ করেছিল তা ছিল কতগুলো আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিষয়-কতগুলো বস্তুগত দিক ও বিষয় নয়। এর প্রমাণ হল :
১. যখন হযরত খাদীজাহ্ মাইসারার কাছ থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শাম সফরের বিবরণ জানতে চেয়েছিলেন তখন সে ঐ সফরে যে সব অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিল এবং শামের খ্রিষ্টান পাদ্রীর কাছ থেকে যা শুনেছিল সব কিছু খাদীজার কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করেছিল। খাদীজাহ্ তাঁর নিজের মধ্যে যে তীব্র ভালোবাসা,আকাঙ্ক্ষা ও আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন এর উৎস ছিল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নীতি-নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ। তাই তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে বলেই ফেললেন,“ মাইসারাহ্! যথেষ্ট,মুহাম্মদের প্রতি আমার টান ও আগ্রহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছ। যাও আমি তোমাকে ও তোমার স্ত্রীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দিলাম এবং তোমাকে দু’ শ দিরহাম,দু’ টি ঘোড়া এবং কিছু মূল্যবান পোশাক দিয়ে দিলাম।”
এরপর তিনি মাইসারার কাছ থেকে যা কিছু শুনেছিলেন তা আরবের পণ্ডিত ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেলের কাছে বর্ণনা করলেন। তিনি শোনার পর বললেন,“ এ সব অলৌকিক ঘটনা সংঘটনকারী ব্যক্তি হচ্ছেন আরবীয় নবী।”
২. একদিন খাদীজাহ্ তাঁর ঘরে বসেছিলেন। তাঁর চারপাশ ঘিরে রেখেছিল দাস-দাসীরা। একজন ইয়াহুদী পণ্ডিতও উক্ত মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাক্রমে যুবক মহানবী (সা.) এ ঘরের পাশ দিয়ে গমন করলেন। ঐ পণ্ডিতের দৃষ্টি মহানবীর ওপর পড়লে তৎক্ষণাৎ তিনি হযরত খাদীজাকে বলেন,যাতে করে তিনি তাঁকে কিছুক্ষণের জন্য উক্ত মাহফিলে যোগদান করার জন্য অনুরোধ করেন। মহানবী ইয়াহুদী পণ্ডিতের আবেদনে সাড়া দিলেন এবং মাহফিলে অংশগ্রহণ করলেন। উল্লেখ্য যে,মহানবী (সা.)-এর মধ্যে নবুওয়াতের বিদ্যমান লক্ষণগুলো দেখেই ইয়াহুদী পণ্ডিত তাঁকে মাহফিলে অংশগ্রহণ করার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। এ সময় হযরত খাদীজাহ্ ঐ ইয়াহুদী পণ্ডিতকে লক্ষ্য করে বললেন,“ যদি তাঁর চাচারা আপনার আগ্রহ ও অনুসন্ধানের ব্যাপারে অবগত হন তাহলে তাঁরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন। কারণ তাঁরা ইয়াহুদীদের অনিষ্ট থেকে তাঁদের ভ্রাতুষ্পুত্রের ব্যাপারে শঙ্কিত।” এ কথা শুনে ইয়াহুদী পণ্ডিত বললেন,“ মুহাম্মদের অনিষ্ট সাধন করা কি কারো পক্ষে সম্ভব,অথচ মহান আল্লাহ্ তাঁকে নবুওয়াত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি ও মানব জাতির হেদায়েতের জন্য প্রতিপালিত করেছেন?” খাদীজাহ্ তখন জিজ্ঞেস করলেন,“ আপনি কোথা থেকে জেনেছেন যে,তিনি এ ধরনের মর্যাদার অধিকারী হবেন?” এ প্রশ্ন শুনে তিনি বললেন,“ আমি তাওরাত গ্রন্থে সর্বশেষ নবীর চি হ্ন ও নিদর্শনসমূহ অধ্যয়ন করেছি। তাঁর নিদর্শনাদির মধ্যে এও যে,তাঁর পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করবেন। তাঁর দাদা ও পিতৃব্য তাঁকে সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা করবেন। তিনি কুরাইশদের মধ্য থেকে এমন এক নারীকে বিবাহ করবেন যিনি কুরাইশদের নেত্রী।” এরপর তিনি খাদীজার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,“ ঐ রমণীকে অভিনন্দন যিনি তাঁর স্ত্রী হবার মর্যাদা ও গৌরব অর্জন করবেন।”
৩. খাদীজার চাচা ওয়ারাকাহ্ ছিলেন আরবের অন্যতম পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি নতুন ও পুরাতন নিয়মের বিভিন্ন গ্রন্থাদি সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান ও তথ্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি প্রায়শঃই বলতেন,“ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরাইশদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি মানব জাতির হেদায়েতের জন্য প্রেরিত ও মনোনীত হবেন এবং কুরাইশ বংশীয়া সর্বশ্রেষ্ঠা ধনাঢ্য রমণীদের মধ্য থেকে একজনকে তিনি বিবাহ করবেন।” আর যেহেতু খাদীজাহ্ ছিলেন কুরাইশ রমণীদের মধ্যে সবচেয়ে ধনাঢ্য সেহেতু তিনি প্রায়শ হযরত খাদীজাকে বলতেন,“ এমন একদিন আসবে যে দিন তুমি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের সাথে শুভ পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হবে।”
৪. খাদীজাহ্ (আ.) এক রাতে স্বপ্ন দেখলেন,মক্কা নগরীর ওপর সূর্য ঘুরপাক খেয়ে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসল এবং তাঁর ঘরেই উপস্থিত হলো। তিনি তাঁর এ স্বপ্নের কথা ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেলকে বললেন। তিনি এ স্বপ্নের বিবরণ শুনে বললেন,“ তুমি একজন মহান ব্যক্তিকে বিবাহ করবে যার খ্যাতি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।”
এগুলো হচ্ছে এমন সব ঘটনা যা কোন কোন ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন এবং অনেক ইতিহাস গ্রন্থেও লিপিবদ্ধ হয়েছে। এ সব ঘটনা থেকে মহানবীর প্রতি হযরত খাদীজার আকর্ষণের কারণ স্পষ্ট হয়ে যায়। এ সব ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, যুবক মহানবীর আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও সম্মানের প্রতি হযরত খাদীজার বিশ্বাস ও আস্থা থেকেই প্রধানত মহানবীর প্রতি তাঁর এ আকর্ষণের উৎপত্তি। আর যেহেতু মহানবী (অর্থাৎ কুরাইশদের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বাসী ও সত্যবাদী) খাদীজার ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা ও পরিচালনা করার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত ছিলেন সেহেতু তা খুব সম্ভবত এ বৈবাহিক সম্পর্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রভাবও রাখে নি।
হযরত খাদীজার বিয়ের প্রস্তাব
এটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত বিষয় যে,হযরত খাদীজার পক্ষ থেকেই প্রথমে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল,এমনকি ইবনে হিশামও বর্ণনা করেছেন যে,খাদীজাহ্ স্বয়ং এ বিবাহের ব্যাপারে আগ্রহ প্রদর্শন করেন। তিনি মহানবীকে বলেছিলেন,“ হে পিতৃব্যপুত্র! আমার ও আপনার মধ্যে যে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে এবং আপনার সম্প্রদায়ের মাঝে আপনার যে উচ্চ সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে এবং আপনার বিশ্বস্ততা এবং সত্যবাদিতার কারণে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে আমি গভীরভাবে আগ্রহী। আপনার সত্যবাদিতা আপনা থেকে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।” তখন মহানবী (সা.) তাঁকে জবাব দিয়েছিলেন,“ এ বিষয় সম্পর্কে আমার চাচাদেরকে অবগত করা এবং তাঁদের পরামর্শে এ কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন।”
অধিকাংশ ঐতিহাসিক বিশ্বাস করেন যে,আলীয়ার কন্যা নাফীসাহ্ খাদীজার প্রস্তাব ঠিক এভাবে মহানবীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন :
“মুহাম্মদ! কেন আপনি আপনার জীবনকে প্রদীপসদৃশ উপযুক্ত স্ত্রী অর্থাৎ জীবনসঙ্গিনীর দ্যুতি দ্বারা আলোকিত করছেন না? আপনাকে যদি রূপসী নারী,ধন-দৌলত,সম্মান ও মর্যাদার দিকে আহবান করি,তাহলে কি আপনি সাড়া দেবেন না?” মহানবী বললেন,“ আপনার আসল উদ্দেশ্য কি?” তখন নাফীসাহ্ খাদীজার কথা উত্থাপন করলেন। মহানবী বললেন,“ খাদীজাহ্ কি এতে সম্মত হবেন? কারণ তাঁর জীবনের সাথে আমার জীবনের অনেক পার্থক্য রয়েছে।” নাফীসাহ্ বললেন,“ তাঁকে রাজী করার ভার আমার ওপর। আপনি একটি সময় নির্ধারণ করুন। ঠিক সে সময় তাঁর প্রতিনিধি আমর বিন আসাদ আপনার ও আপনার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করে বিয়ের আক্দ ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন।”
মহানবী (সা.) তাঁর চাচাদের সাথে (বিশেষ করে আবু তালিবের সাথে) বিবাহের ব্যাপারে আলোচনা করলেন। কুরাইশ বংশীয় শীর্ষস্থানীয় ও সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে একটি গৌরবোজ্জ্বল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রথমে হযরত আবু তালিব একটি ভাষণ দেন যার শুরুতে তিনি মহান আল্লাহর প্রশংসা করার পর নিজ ভ্রাতুষ্পুত্রের পরিচিতি সবার সামনে তুলে ধরেন :
“আমার ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহকে যদি সকল কুরাইশ বংশীয় পুরুষের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে তিনি তাদের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যদিও তিনি সব ধরনের সম্পদ থেকে বঞ্চিত;কিন্তু অর্থ-সম্পদ ইত্যাদি ছায়া বৈ আর কিছুই নয় যা ক্ষণস্থায়ী। আর উচ্চ বংশমর্যাদা ও কৌলিন্য হচ্ছে এমন এক বিষয় যা স্থায়ী...।”
হযরত আবু তালিবের ভাষণ শেষ হলে হযরত খাদীজার আত্মীয় ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেল ইবনে আসাদ ভাষণ দিলেন। হযরত আবু তালিবের উক্ত ভাষণের উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশ ও বনি হাশিমের পরিচিতি তুলে ধরা। ওয়ারাকাহ্ ইবনে নওফেল বললেন,“ কোন কুরাইশই আপনাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা অস্বীকার করতে অক্ষম। আমরা আন্তরিকতার সাথে আপনাদের সুমহান মর্যাদার রজ্জুকে আঁকড়ে ধরতে চাই।”
বিবাহের আক্দ সম্পন্ন হলো এবং মোহরানা ৪০০ দীনার নির্ধারণ করা হলো। তবে কোন কোন ঐতিহাসিক বলেছেন,মোহরানা ছিল ২০টি উট।
হযরত খাদীজার বয়স
এটিই প্রসিদ্ধ যে,এ বিয়ের সময় খাদীজার বয়স ছিল ৪০ বছর। তিনি হস্তি সালেরও ১৫ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কোন কোন ঐতিহাসিক তাঁর বয়স এর চেয়েও কম ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। মহানবীর সাথে এ বিয়ের আগে আতীক ইবনে আ’ য়েয এবং আবু হালাহ্ মালেক বিন বান্নাশ আত তামীমী নামক দু’ ব্যক্তির সাথে খাদীজার বিবাহ হয়েছিল,কিন্তু বৈবাহিক জীবনেই উক্ত স্বামীদ্বয় মৃত্যুমুখে পতিত হন।
#
পার্সটুডে/এমএএইচ/২৭