মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাযায় কেন অস্থায়ী ভাসমান বন্দর বানাচ্ছে?
https://parstoday.ir/bn/news/west_asia-i135992-মার্কিন_যুক্তরাষ্ট্র_গাযায়_কেন_অস্থায়ী_ভাসমান_বন্দর_বানাচ্ছে
শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে  মহৎ উদ্দেশ্যে এই ভাসমান বন্দর নির্মাণ করতে চায় কি মার্কিন সরকার?  গাযায় যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্বাস্তু ও দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন ক্ষুধার্ত গাজা-বাসীদের কাছে মানবিক ত্রাণ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় রসদ পত্র সরবরাহের জন্যই মার্কিন সরকার এ বন্দর বসাতে চায়?
(last modified 2026-04-22T13:03:21+00:00 )
মার্চ ২৫, ২০২৪ ১৭:০২ Asia/Dhaka
  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাযায় কেন অস্থায়ী ভাসমান বন্দর বানাচ্ছে?

শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে  মহৎ উদ্দেশ্যে এই ভাসমান বন্দর নির্মাণ করতে চায় কি মার্কিন সরকার?  গাযায় যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্বাস্তু ও দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন ক্ষুধার্ত গাজা-বাসীদের কাছে মানবিক ত্রাণ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় রসদ পত্র সরবরাহের জন্যই মার্কিন সরকার এ বন্দর বসাতে চায়?

 না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এইসব মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ধরনের বন্দর নির্মাণ করছে না বরং এর পেছনে রয়েছে  এক মহা-ষড়যন্ত্র এবং ভয়ঙ্কর নোংরা ও অশুভ উদ্দেশ্য। আর সেটা হচ্ছে এ ধরনের কাজ করে মানবতা-বিরোধী যুদ্ধাপরাধী গণহত্যাকারী ইসরাইলকে তার যাবতীয় অপরাধ, দুষ্কর্ম ও গণহত্যায় সর্বাত্মক সাহায্য, সহায়তা ও সমর্থন দান করে মার্কিন সরকার বিশ্বে যে দুর্নাম ও ধিক্কার পেয়েছে তা থেকে অব্যাহতি পেতে র‍্যাম্বো ও ম্যাক গাইভার স্টাইলে হলিউডের ফিল্মী হিরোর মতো হিরো সেজে জেটি ও বন্দর নির্মাণ করে গাযায় কিছু ত্রাণ সামগ্রী ও সাহায্য পাঠিয়ে বিশ্ব জুড়ে সস্তা বাহবা ও সুনাম কুড়ানো এবং বিশ্ববাসীর আই ওয়াশ করানো।

 প্রথমেই বলে রাখা দরকার যে অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ উদ্যোগের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।  কারণ, এতে করে গাজাবাসী দের দু:খ-কষ্ট, যাতনা -যন্ত্রণা, দুর্দশা-দুর্ভোগ ও চলমান হাজারো সমস্যার তেমন কিছুই সমাধান হবে না। বরং এ ধরনের জেটি ও বন্দর নির্মাণ না করে মিসর-গাযা সীমান্ত খুলে দিয়ে খাদ্য সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় রসদ পত্র সড়ক পথে গাযায় আসতে দিলে তাতে ইসরাইলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত গাযাবাসীদের সবচেয়ে বেশি উপকার হত এবং এটা হলে গাযায় প্রয়োজনীয় খাদ্য,ঔষধ-পথ্য ও ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ ও বণ্টন প্রধানত: মুসলিম দেশগুলোর তত্ত্বাবধানে থাকত। কিন্তু মার্কিন ও পশ্চিমা সরকারগুলো এবং ইসরাইল সেটা চায় না। তাই সব সময় ইসরাইল মার্কিন ও পশ্চিমাদের সমর্থন ও সবুজ সংকেত পেয়ে মিসর-গাযা সীমান্ত খুলে না দিয়ে উল্টো হামলা চালিয়ে খাদ্য, ঔষধ ও ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাতে দিচ্ছে না।

আর মার্কিন সরকারের তত্ত্বাবধানে নির্মিত জেটি ও বন্দরে যে যৎ কিঞ্চিৎ ত্রাণ সামগ্রী ও সাহায্য গাযায় পাঠানো হবে তা পুরোটাই মার্কিন কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং তা হবে পুরোপুরি ইসরাইলের স্বার্থানুকূলে। এভাবে ত্রাণ সামগ্রী ও সাহায্য পৌঁছানোর বিষয়টি মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকলে ত্রাণ সামগ্রী ও সাহায্য বিতরণকে কেন্দ্র করে গাজাবাসীদের মধ্যে বিভেদ, দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ বাঁধাতে পারবে বেশি করে ওয়াশিংটন ও তেলআবিব।  খাদ্য ও ত্রাণ সামগ্রী বণ্টন নিজের হাতে রেখে গাজাবাসী ও হামাসের মধ্যে বিভাজন, ব্যবধান ও দূরত্ব সৃষ্টির ইন্ধন যোগাবে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , ইসরাইল ও পশ্চিমারা। আর এ ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  ও পশ্চিমারা গাযার উপকূলে জেটি ও বন্দর নির্মাণ করে ঘাঁটি বানিয়ে গাযায় হামাসের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের ইতি টানা বা তা খর্ব করারও চেষ্টা করবে বা এটা হবে গাযায় হামাসের শাসনের পতন ঘটানোর পূর্ব-প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ। কারণ ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানোর বাহানায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাযার সামুদ্রিক সৈকত ও উপকূলীয় অঞ্চলে ডেরা বেঁধে ও ঘাঁটি গেড়ে গাযায় নিজের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত ও গাযার সমুদ্রোপকূল নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে। আর এটা করে যুদ্ধে  শ্রান্ত-ক্লান্ত ব্যর্থ ইসরাইলকে গাযায় আগ্রাসন ও যুদ্ধে আরও ব্যাপক ভাবে সামরিক ও গোয়েন্দা সাহায্য ও সহায়তা দান করতে পারবে মার্কিন সরকার। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা দেশগুলো এবং ইসরাইলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কেবল একটাই। আর তা হল হামাস ও  ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলন সহ ফিলিস্তিনীদের বিশেষ করে গাজাবাসীদের সমূলে নিধন ও উচ্ছেদ।

আর ত্রাণ সামগ্রী ও সাহায্য দেওয়ার বাহানায় গাজাবাসীদেরকে গাযার সমুদ্রোপকূলে উক্ত বন্দরের দিকে নিয়ে আসা যাতে করে উত্তর ও পূর্ব গাযা যা ইসরাইলের সীমান্ত সংলগ্ন তা যেন জনশূন্য হয়ে যায় এবং এটা করতে পারলে গাযা সীমান্ত সংলগ্ন ইসরাইলের শহর ও জনপদ সমূহের নিরাপত্তাও তখন সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এই বন্দরের আশে পাশে গাজাবাসীদের আনা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে পরবর্তী পর্যায় ও ধাপে গাযাবাসীদের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেবে বা পাঠানোর উদ্যোগ নেবে মার্কিন ও পশ্চিমা দেশগুলো। অর্থাৎ মার্কিন সরকার কর্তৃক গাযায় এ বন্দর নির্মাণ ভবিষ্যতে গাযাকে জনশূন্য করা সংক্রান্ত ইসরাইলী- মার্কিন গোপন মহাপরিকল্পনার অংশও হতে পারে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে আগ্রহী কতিপয় আরব সরকারও চায় গাযা জনশূন্য হয়ে যাক যাতে চিরতরে হামাসসহ ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতি ঘটে।

গাজা-সংলগ্ন সাগরে রয়েছে তেল ও গ্যাসের খনি 

গাযার সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে গ্যাসের খনি রয়েছে এবং গাযার যে স্থানে উক্ত জেটি ও বন্দর নির্মাণ করতে যাচ্ছে মার্কিন সরকার সেখানেই গ্যাসের খনি অবস্থিত। আর সাহায্য ও ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করার নামে গাযায় সমুদ্র বন্দর যা আসলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছাড়া আর কিছুই নয় তা নির্মাণ করে গাযার গ্যাস খনি দখল ও করায়ত্ত করার চেষ্টা করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর এ কারণেই মিসর- গাযা সীমান্ত পথে গাযায় খাদ্য ও ত্রাণ সামগ্রী পাঠাতে বাঁধা দিচ্ছে ইসরাইল।

 " গাযায় শিগগিরই ত্রাণসামগ্রী, খাদ্য ও ওষুধ প্রেরণ অতি জরুরি "- এ ধরনের জিগির তুলে ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহের নামে গ্যাস ক্ষেত্র  দখলের জন্য বন্দর নির্মাণ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ত্রাণসামগ্রী, খাদ্য ও ঔষধ ইত্যাদি সরবরাহের জন্য মিসর-গাযা সীমান্ত খুলে দিলেই গাযা উপকূলে সমুদ্র বন্দর নির্মাণের আর কোন যৌক্তিকতা থাকে না। আর এমতাবস্থায় গাযার তেল-গ্যাস লুণ্ঠনেরও মোক্ষম সুযোগ বিদ্যমান থাকবে না ওয়াশিংটনের জন্য। যেহেতু গাযা এলাকা ইসরাইল ও মার্কিন আধিপত্যবাদের মোকাবেলায় প্রতিরোধ ও চ্যালেঞ্জকারী, এ ছাড়াও  অত্র অঞ্চলে লেবানন ও সিরিয়ার  প্রতিরোধ আন্দোলন সক্রিয়, প্রবল ও সফল এবং ইসরাইল পর্যদুস্ত ও ব্যর্থ  তাই মার্কিন সরকার নিজেই গাযায় এই বন্দর নির্মাণ করে ১০০০ সৈন্য মোতায়েন করার পাঁয়তারা করছে। 

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধে মার্কিন-মদদপুষ্ট আসাদ বিরোধীরা পরাজিত হলে সিরিয়ার তেল সমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলে সংখ্যালঘু কুর্দিদের রক্ষার নামে সেখানে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে ও তা দখল করে নিয়ে সেখান থেকে তেল চুরি করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  ও পশ্চিমা দেশগুলোর তেল ও গ্যাস খুবই প্রয়োজন। নাকে তেল-গ্যাসের গন্ধ গেলেই পশ্চিমাদের বিশেষ করে মার্কিন সরকারের মাথাই খারাপ হয়ে যায়। আর ইউক্রেন - রাশিয়া যুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রুশ তেল ও গ্যাসের সরবরাহ তলানিতে চলে যাওয়ায় পশ্চিমাদের কাছে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেল গ্যাসের অভাব বোধ অনেক প্রকট হয়ে ওঠে। আর এই সুযোগে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জেটি ও বন্দর নির্মাণ করে গাযার গ্যাস ক্ষেত্র নিজের কন্ট্রোলে নিতে পারে তাহলে তা হবে ওয়াশিংটনের জন্য খুবই লোভনীয় লাভজনক প্রোজেক্ট !! 

 গাজা-সংলগ্ন এই অঞ্চল তথা পশ্চিম এশিয়া তিন মহাদেশের (এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের) মিলন-স্থল  হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের ওপর সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলো আধিপত্য ও কর্তৃত্ব কায়েম করতে ও তা ধরে রাখতে চায়। আর সে লক্ষ্যেই তাদের দরকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে জেটি ও বন্দর এবং গাযা হচ্ছে সেই কাঙ্ক্ষিত উপযুক্ত জায়গা। 

অতএব বহু কারণে এবং জঘন্য সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ  বাস্তবায়নের লক্ষ্যে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাযায় জেটি ও বন্দর নির্মাণ করতে চাচ্ছে। যদিও তা এখন অস্থায়ী বলা হচ্ছে আসলে ধীরে ধীরে সবাইকে বুঝিয়ে দেয়া হবে  যে এ ধরনের জেটি বা বন্দর  আসলে অস্থায়ী নয় বরং তা স্থায়ী। 

 এ জেটি ও বন্দর গাজাবাসী দের স্বার্থের অনুকূল নয়। তাই ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো ( হামাস ও জিহাদে ইসলামী ) এ ধরনের জেটি ও বন্দর নির্মাণের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন যে সব জঘন্য সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে তা ব্যর্থ ও ভণ্ডুল করার চেষ্টা করবে। মুসলিম বিশ্বেরও উচিত জঘন্য এ মার্কিন পদক্ষেপ ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন হতে না দেয়া এবং মিসর-গাযা সীমান্ত উন্মুক্ত করে সেখান দিয়ে মার্কিন-নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবমুক্ত হয়ে গাযায় ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা চালানো।# 

পার্সটুডের অতিথি-লেখক: মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান, লেখক, বিশ্লেষক ও গবেষক

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।