গোলান মালভূমিকে বাদ দিয়ে সিরিয়ার মানচিত্র প্রকাশ: পর্দার আড়ালে কী ঘটছে?
পার্সটুডে: আবু মোহাম্মদ আল-জোলানির নেতৃত্বাধীন সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো দেশটির একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে দখলকৃত 'গোলান মালভূমি' দেখানো হয়নি।
ফরাসি দৈনিক ফিগারো একটি প্রতিবেদনে শিরোনাম করে লিখেছে, 'প্রথমবারের মতো, 'সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে যাতে দখলকৃত গোলান নেই'। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপটি ঘটেছে ঠিক সেই সময়ে যখন দামেস্ক 'সিজার' নামক আইনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
ফিগারো'র বরাত দিয়ে পার্সটুডে লিখেছে, ফিগারো এই মামলার ঐতিহাসিক পটভূমি স্মরণ করে জোর দিয়ে বলেছে যে, দামেস্ক কখনই ১৯৬৭ সালের জুন যুদ্ধের সময় ইসরাল কর্তৃক গোলান মালভূমি দখল এবং ১৯৮১ সালে একতরফাভাবে সেটি সংযুক্ত করার বিষয়টি স্বীকৃতি দেয়নি। জাতিসংঘও তাদের ৪৯৭ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে এই সংযুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আল-জোলানির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নীতি বা অবস্থানের কোনো পরিবর্তনের ঘোষণা না দিলেও, এই পরোক্ষ পদক্ষেপের মাধ্যমে ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর দাবি বিবেচনায় নিয়েছে। ফিগারোর মতে, এটি নতুন সিরীয় শাসকদের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রতি দামেস্কের সুরে সম্ভাব্য পরিবর্তনের একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত।
ফিগারো এই ঘটনাকে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়, বর্তমান সিরীয় সরকার যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে, যিনি ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত।
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেন। এর মাধ্যমে তিনি কয়েক দশক ধরে চলে আসা যুক্তরাষ্ট্রের সতর্ক কূটনৈতিক ঐকমত্য ভেঙে দেন।
গোলান অঞ্চলকে বিবেচনায় না নিয়ে সিরিয়ার সরকারি মানচিত্র প্রকাশের ঘটনায় সিরীয় বিভিন্ন মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে এবং তারা এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে।
‘সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক কোয়ালিশন’ কঠোর ভাষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপকে নিন্দা জানিয়ে এটিকে একটি বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ বলে আখ্যা দিয়েছে। সংগঠনটির মতে, এটি সিরিয়ার একটি মৌলিক জাতীয় নীতির লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এই জোট জোর দিয়ে বলেছে, ভূমি, জনগণ ও পরিচয়ের দিক থেকে গোলান মালভূমি সিরিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা গণমাধ্যম—কোনো ক্ষেত্রেই কোনো পক্ষের অধিকার নেই ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে উপেক্ষা করা বা এটিকে বাস্তবতা কিংবা গৌণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরার।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঘটনাটিকে কেবল একটি কারিগরি ভুল হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটি জাতীয় প্রতীকের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক পদক্ষেপ, যা দেশের ইতিহাসের অত্যন্ত সংবেদনশীল এক পর্যায়ে সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তথাকথিত প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত কয়েক দশক ধরে ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর আচরণ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আদর্শিক হোক বা রাজনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই এই শাসকগোষ্ঠী বরাবরই সম্প্রসারণবাদী নীতি ও অন্য ভূখণ্ডে সামরিক আগ্রাসনের পথে হেঁটেছে।#
পার্সটুডে/এমএআর/২৩