সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের নৌ অবরোধ; কারণ ও পরিণতি
-
• ইয়েমেন সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি
পার্সটুডে- ইয়েমেন সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র অবরোধের বিরুদ্ধে অবরোধের সমীকরণের ভিত্তিতে সৌদি আরবের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছেন।
সৌদি আরবও পাল্টা ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে সৌদি আরবের উপর নৌ অবরোধ ঘোষণার নিন্দা জানিয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রিয়াদ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তার জাহাজগুলোকে রক্ষা করার জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
পশ্চিমা সমর্থনে সৌদি সরকারের চাপিয়ে দেয়া বছরের পর বছর অবরোধ সহ্য করার পর, ইয়েমেনীয়রা অবশেষে সৌদিদের বিরোধিতায় ‘অবরোধের বিরুদ্ধে অবরোধ’-এর এক নতুন নীতি ঘোষণা করেছে। এই অঞ্চলে ইয়েমেনীয় প্রতিরোধের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশিত ছিল।
সানা ‘অবরোধের বিরুদ্ধে অবরোধ’ নীতি সক্রিয় করার ঘোষণা দেওয়ায়, সৌদি জাহাজ চলাচলের জন্য বাব আল-মান্দাব প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে রিয়াদের উদ্বেগ বেড়েছে। রিয়াদ এই হুমকিকে গুরুতর বলে মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে, এই কৌশলগত পথটি বন্ধ করার জন্য সানার প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এই পথটি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আনসারুল্লাহর নতুন প্রতিরোধ নীতির কাঠামোর মধ্যে বাব আল-মান্দাব কৌশলের ব্যবহার শীঘ্রই বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। এমন একটি নীতি, যা অনুযায়ী সৌদি আরব যদি মানবিক দাবি উপেক্ষা করে, তবে রিয়াদের বিরুদ্ধে “সর্বাত্মক যুদ্ধের” বিকল্পটি সামনে আসবে।
এই সমীকরণের কাঠামোর মধ্যে, ২০১৫ সালের মার্চে ইয়েমেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো সৌদি বন্দরগুলোতে সৌদি তেল ট্যাঙ্কার প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সম্ভাবনাও উত্থাপিত হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, এই ধরনের পরিস্থিতি বাস্তবায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারেরও বেশি হয়ে যেতে পারে, কারণ এটি ইয়ানবু বন্দরে “পূর্ব-পশ্চিম” পাইপলাইনের মাধ্যমে সৌদি আরবের দৈনিক ৭০ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি তেল রপ্তানি ব্যাহত করবে, যা দেশটির তেল রাজস্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানবে। এদিকে, মাত্র কয়েক দিনের জন্য তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিলেও তা জ্বালানি সরবরাহ সংকট এবং বিশ্ববাজারে তীব্র ওঠানামাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, এমন এক সময়ে যখন ইরানের ওপর মার্কিন হামলার কারণে হরমুজ প্রণালীর অব্যাহত অবরোধের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে। এই উত্তেজনার পরিণতি শুধু ইয়ানবু বন্দরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং জেদ্দা বন্দরও বিঘ্নিত হবে, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ কেন্দ্র এবং হরমুজ প্রণালীর বিকল্প পথ হিসেবে গড়ে উঠেছে। যেহেতু সৌদি আরবের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি জেদ্দার মাধ্যমে হয় এবং কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে পণ্য পরিবহনে এই বন্দরটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই এটি বন্ধ হয়ে গেলে এই অঞ্চলের সরবরাহ শৃঙ্খল, উৎপাদন এবং বিনিয়োগ খাত সংকটে পড়তে পারে।
“বন্দরের বদলে বন্দর” নীতির ভিত্তিতে, ইয়ানবু ও জেদ্দা বন্দর বন্ধ করে দেওয়া নৌ অবরোধের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে। যে কোনো দেশ ইয়েমেনের অবরোধে বা সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে অংশগ্রহণ করলে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালীতে অবস্থিত তাদের বন্দরগামী জাহাজগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে পারে; এই পদক্ষেপকে ইয়েমেন তার আত্মরক্ষার অধিকারের অংশ হিসেবে দেখে। সুতরাং, এটা প্রতীয়মান হয় যে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের যুদ্ধ এখন আর কেবল দুই দেশের সীমান্তে একটি সামরিক সংঘাত নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তার সমীকরণ এবং কৌশলগত করিডোর নিয়ে একটি সংঘাতে পরিণত হয়েছে। যেহেতু ইয়েমেন সেদেশের ওপর চলমান সৌদি অবরোধের জবাবে নতুন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে, তাই লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালীতে যেকোনো উত্তেজনা বৃদ্ধি সৌদি আরবের বাইরেও বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সুতরাং, এটা বলা উচিত যে ইয়েমেনের ঘোষিত হুমকি অর্থাৎ সৌদি নৌ অবরোধ, কেবল একটি গণমাধ্যম যুদ্ধের অংশ নয়, বরং এটি সৌদি জোট কর্তৃক ইয়েমেনের ওপর বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ ও অবরোধের ফলে ক্ষমতার ভারসাম্যে যে পরিবর্তন এসেছে তারই একটি প্রতিফলন, এবং এটি এখন আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক-বহির্ভূত পক্ষগুলোর হিসাব-নিকাশ পুনর্বিবেচনার কারণ হতে পারে।#
পার্সটুডে/এমআরএইচ/২১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।