মানবতাকে প্রাধান্য না দেয়ায় সৌদি রাজার নিন্দা
https://parstoday.ir/bn/news/world-i12985-মানবতাকে_প্রাধান্য_না_দেয়ায়_সৌদি_রাজার_নিন্দা
ওয়াহাবি মতবাদে বিশ্বাসী সৌদি সরকারকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-দেয়া তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম প্রধান গড-ফাদার বলে মনে করা হয়।
(last modified 2026-07-21T05:57:31+00:00 )
জুন ২৫, ২০১৬ ১৬:৩৬ Asia/Dhaka
  • সৌদি রাজা সালমান (মাঝখানে), ডানপাশে বাহরাইনি রাজা ও বায়ে কুয়েতি রাজা
    সৌদি রাজা সালমান (মাঝখানে), ডানপাশে বাহরাইনি রাজা ও বায়ে কুয়েতি রাজা

ওয়াহাবি মতবাদে বিশ্বাসী সৌদি সরকারকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-দেয়া তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম প্রধান গড-ফাদার বলে মনে করা হয়।

সিরিয়ায় লেলিয়ে দেয়া ওয়াহাবি-তাকফিরি সন্ত্রাসীদের কারণে গৃহহারা ও দেশ-ছাড়া হয়েছে লাখ লাখ সিরিয় নাগরিক। এইসব শরণার্থীর অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে ইউরোপে। সেখানে তারা নানা ধরনের বঞ্চনা ও ঘৃণারও শিকার হচ্ছে। আর এ অবস্থায় সৌদি রাজা বিশ্বের সরলমনা মুসলমানদের বোকা বানিয়ে সস্তা খ্যাতি অর্জনের আশায় মাঝে-মধ্যেই নানা ‘চমক-লাগানো’ পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

সম্প্রতি সৌদি রাজা সালমান বিন আবদুল আজিজ ইউরোপের নানা দেশে ২০০টি ‘মসজিদ’ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন। আর এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সৌদি রাজার কাছে খোলা চিঠি দিয়েছেন সিরিয় মানবাধিকার কর্মী হাওরা জাকিরি। নারী এবং শিশুসহ সিরিয় শরণার্থীদের কথা স্মরণে রেখে তিনি জানিয়েছেন বিক্ষুব্ধ ওই প্রতিক্রিয়া। সিরিয়ার এক বালিকা শরণার্থী সৌদি রাজার কাছে এক চিঠি পাঠিয়েছেন। ওই চিঠিতে সে লিখেছে:

প্রিয় রাজা সালমান: জার্মানিতে আমার সমধর্মী মুসলমানদের জন্য ২০০টি মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দেয়ায় আপনাকে জানাচ্ছি ধন্যবাদ। ইবাদত বা প্রার্থনার একটি জায়গা পাওয়া হবে খুবই চমৎকার ব্যাপার। কিন্তু আমি মনে করি না যে আপনি আপনার সুন্দর ওই মসজিদগুলোতে অনুপযুক্ত পোশাক পরা লোকদের গ্রহণ করবেন, কিংবা রাতের বেলায় সেখানে তাদের ঘুমাতে দেবেন। কারণ, মসজিদে না ঘুমানোর মাধ্যমে আল্লাহর ঘরকে শ্রদ্ধা করা সবারই উচিত। আমার দেশবাসীরা শরণার্থী হতে গিয়ে পথে যাদের হারিয়েছে তাদের জন্য শোকও প্রকাশ করতে পারছে না। কারণ, মৃতদের জন্য কান্না আপনার ধর্ম তথা ওয়াহাবি মতবাদে নিষিদ্ধ। এই মতবাদ মৃত ব্যক্তির আত্মাদের জন্য আল্লাহর রহমতে বিশ্বাসী নয়।

আপনার বিলাসবহুল মসজিদগুলো ভাষা শিক্ষার ক্লাস, খাবার অথবা চাকরির প্রস্তাব দেবে না তাদের। সিরিয় জনগণের জন্য আপনার এই মসজিদগুলো কোনো কাজেই আসবে না। কেন আপনি লাখ-লাখ ইট, পাথর ও কাঠ কেনার কাজে মিলিয়ন মিলিয়ন অর্থ দিতে চাইছেন যা দিয়ে বানানো হবে কিছু ভবন আর সেসবের নাম দেবেন ‘মসজিদ’? অথচ কেন আপনার দেশে আরব শরণার্থীদের স্বাগত জানাচ্ছেন না? সৌদি আরব কী জার্মানির চেয়েও সিরিয়ার বেশি কাছে নয়? আপনি যদি তাদের সৌদি আরবে ঢুকতে দিতেন তাহলে তাদের অনেককেই বাবা-মা অথবা শিশু সন্তানদের মৃত্যু দেখতে হত না, যারা মারা গেছে ট্রাকে অথবা সাগরে ডুবে। বস্তুত আপনি যদি আমার দেশে তাকফিরি যোদ্ধাদের না পাঠাতেন তাহলে এই সিরিয়রা আপন ঘর-বাড়িই ছাড়ত না।

মাননীয় রাজা,

একজন মুসলমান হিসেবে আমাকে এটা শেখানো হয়েছে যে আল্লাহ চান আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই ভ্রাতৃত্বের চেতনা নিয়ে ও ইয়াতিমদের যত্ন নেই এবং আশ্রয় দেই গৃহহারাদের, খাদ্য দেই দরিদ্রদের ও সবচেয়ে গুরুত্ব দেই মানবতাকে। আমি জানি না কোন্ দেবতার উপাসনা আপনি করাতে চান আপনার মসজিদগুলোতে? কিন্তু আমি মনে করি না যে আমাদের আল্লাহ ও আপনার দেবতা অভিন্ন। আপনার দেবতা প্রার্থনাকেই বেশি গুরুত্ব দেন মানবতাকে নয়। আমি জানি, আল্লাহ মুসলমানদের বলেছেন, যে মুসলমানদের কল্যাণের কথা চিন্তা না করেই সকালে জাগল ঘুম থেকে সে সত্যিকারের মুসলমানই নয়।

আমি এক সিরিয় বালিকা। আমার সেরা স্মৃতিগুলো জড়িয়ে আছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কাছে জাইনাবিয়া মহল্লার সড়কগুলোতে। এ এলাকায় আমার ছিল ইরাকি, আফগান ও অন্য অনেক দেশের বন্ধু। কেনো তা-কি আপনি জানেন? কারণ, সিরিয়া ছিল বিশ্বের একমাত্র আরব দেশ যেখানে শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া হত। যদিও সিরিয়া খুব ধনী দেশ নয় তবুও আমরা আমাদের ভূমি ও হৃদয়গুলোকে খুলে দিয়েছিলাম তাদের জন্য যারা ছুটে এসেছিল সাদ্দাম, তালিবান ও অন্যান্য আগ্রাসীদের হাত থেকে বাঁচতে। অন্যদিকে সৌদি, বাহরাইনি, কুয়েতি ও তেল-সমৃদ্ধ অন্য অনেক দেশের সরকার তাদের সম্পদ ব্যয় করেছে অস্ত্র কেনা, প্রাসাদ বানানো ও বিলাস-বহুল মসজিদ বানানোর কাজে। আর তারা দরিদ্র মুসলমানদের কথা না ভেবেই বিলাসী জীবন-যাপন করছে।

এখন আমি বসবাস করছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে থাকায় ইসলামের নামে মানবতা ধ্বংসকারী রাজা- আপনার ও অন্য সব রাজার সমালোচনা করার মত যথেষ্ট স্বাধীনতা আমি পেয়েছি। অবশ্য আমার শৈশবের সব সাথীরা আমার মত সৌভাগ্যবান নয়। তাদের বেশিরভাগই হয় মারা গেছে অথবা বসবাস করছে এমন সব শরণার্থী শিবিরে এই আশায় যে একদিন কোনো এক অমুসলিম নেতা এসে উপলব্ধি করবে তাদের ব্যথা-বেদনা ও তাদের দেবে আশ্রয় যেভাবে আশ্রয় দিচ্ছে জার্মানি।

মহামান্য রাজা, আপনি ধারণ করেছেন দুই পবিত্র মসজিদের অভিভাবক হওয়ার (স্বঘোষিত) উপাধি, যদিও আপনি ধ্বংস করেছেন মক্কা ও মদিনার বেশিরভাগ ঐতিহাসিক স্থাপনা আল্লাহর ঘরের জৌলুস বাড়ানোর অজুহাত দেখিয়ে। আপনি হাজার হাজার মসজিদ ও (ওয়াহাবি) আলেমের খরচ যোগাচ্ছেন, কিন্তু মানবতার সেবা করা আপনার কর্মসূচিতে নেই। সৌদি সরকার বিশ্বে মানবাধিকার লঙ্ঘনে সবার শীর্ষে রয়েছে।

আমার দেশবাসী সিরিয় নাগরিকরা আপনার বানানো মসজিদগুলোতে ইবাদত করতে পারেন না, কারণ, আপনি উপাসনা করেন ভবনের দেবতার আর সিরিয়রা ইবাদত করে এক আল্লাহর যিনি রাজকীয় বা বিলাসবহুল প্রাসাদে আবদ্ধ নন। আল্লাহ চান মানুষেরা থাকবে মুক্ত ও সুখী। আর আপনার দেবতা চান কেবল মসজিদের সংখ্যা বাড়াতে যদিও মানুষেরা থাকুক ক্ষুধার্ত,  শীতে কাতর বা শীতল ও বেদনার্ত।

জার্মানিতে ২০০ মসজিদ নির্মাণের যে প্রস্তাব আপনি দিয়েছেন সিরিয় নাগরিকদের পক্ষ থেকে আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি। এর পরিবর্তে আমরা ভ্রাতৃত্বের চেতনা ছড়ানোর জন্য কাজ করব সেই ভূমিতে যেখানে আমরা আশ্রয়ের আবেদন জানিয়েছি। #

পার্সটুডে/মু. আ. হুসাইন/২৫