ভারত কীভাবে তার কর্মীদেরকে কূটনীতির নতুন অস্ত্রে পরিণত করছে?
-
• ভারত কীভাবে তার কর্মীদেরকে কূটনীতির নতুন অস্ত্রে পরিণত করছে?
পার্সটুডে - ভারত তার কর্মীবাহিনীকে কূটনীতির নতুন অস্ত্রে পরিণত করছে। পার্সটুডের জানিয়েছে, অর্থনীতির উন্নয়নে জনশক্তির ঘাটতি এবং পশ্চিমা বিশ্বে অভিবাসন-বিরোধী চাপের কারণে নয়াদিল্লি ভারতীয় শ্রমিকদের অভিবাসনকে একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া থেকে একটি উদ্দেশ্যমূলক কৌশলে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছে।
যদিও অনেক উন্নত অর্থনীতির পশ্চিমা ব্লকে, বিশেষ করে ইউরোপ এবং জাপানে, শ্রমিক ঘাটতি এবং বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তখন বিশ্বের বৃহত্তম তরুণ জনসংখ্যার অধিকারী ভারত এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যা অভিবাসন, অর্থনীতি এবং কূটনীতির ভবিষ্যত গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। বিশ্বব্যাপী, শ্রমিক ঘাটতি ২০২৩ সালে ৫০ লাখ থেকে বেড়ে ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ কোটিতে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলিতে ভারতীয় শ্রমিকদের চাহিদা রয়েছে। জার্মানি ভারতীয় শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা করেছে, জাপান প্রতি বছর ৫০,০০০ ভারতীয় কর্মী গ্রহণ করবে এবং ব্রিটেন ভারতীয় কর্মীদের তিন বছর পর্যন্ত বিমার খরচ মওকুফ করে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়াও ভারতীয় স্নাতকধারীদের গবেষণা ক্ষেত্রে দুই বছর কাজ করার অনুমতি দিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী শ্রম ঘাটতি এবং পশ্চিমা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান অভিবাসন-বিরোধী নীতির মুখোমুখি হয়ে, ভারত একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে: আর তা হলো শ্রমকে অর্থনৈতিক কূটনীতির হাতিয়ারে পরিণত করা। ২৫ বছরের কম বয়সী ৬০ কোটিরও বেশি মানুষের অধিকারী নয়াদিল্লি এই মানব মূলধনকে জনসংখ্যাগত সুবিধা থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত মাধ্যমে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে।
এই প্রসঙ্গে, "সুবিধাজনক ও সমৃদ্ধ বিদেশী অভিবাসন বিল ২০২৫" প্রকাশ ভারতের নীতিগত পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। বিলটির লক্ষ্য শ্রম অভিবাসন নীতিগুলিকে পুনর্গঠন করা, শ্রমিক প্রেরণ ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং অভিবাসীদের পুনঃএকত্রীকরণের জন্য একটি বিস্তৃত কাঠামো প্রদান করা। ভারত আর শ্রমিকদের নিষ্ক্রিয় রপ্তানিকারক নয় বরং এই প্রক্রিয়াটিকে একটি উদ্দেশ্যমূলক এবং লাভজনক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করার চেষ্টা করে।
এছাড়াও, ভারতীয় অভিবাসীদের প্রত্যাবর্তন বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ও স্টার্ট-আপগুলির জন্য সহায়তা থেকে বোঝা যায় যে ভারত তার মানব পুঁজি বজায় রাখতে এবং শক্তিশালী করতে চায়। এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে ভারতের স্থানকে দৃঢ় করতে পারে এবং এটিকে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় করে তুলতে পারে।
একই সময়ে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জোরদার করতে এবং কৌশলগত প্রযুক্তিতে ভারতের স্বনির্ভরতা বৃদ্ধির জন্য বেসরকারি খাতে গবেষণা, উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনকে সমর্থন করার জন্য ১.১৩ বিলিয়ন ডলারের তহবিল চালু করেছেন। এই তহবিল ঝুঁকিপূর্ণ এবং উদ্ভাবনী কর্মসূচিতে বিনিয়োগ সহজতর করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে; এটি এমন প্রকল্প যা সাধারণত অর্থের ঐতিহ্যবাহী উৎস থেকে উপকৃত হয় না।
আগে, ভারতীয় স্নাতকরা বিদেশে পড়াশোনা করার পর, বিদেশী রেমিট্যান্স পাঠিয়ে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির একটি অংশ পূরণ করতেন। কিন্তু এখন, ১৯৮৩ সালের অভিবাসন আইন সংশোধন করে, মোদী সরকার অভিবাসন পথকে মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখসহ একটি নিয়মিত চক্রে পরিণত করতে চায়; এমন একটি চক্র যা কেবল বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে সহজতর করতে তাই নয় একইসাথে অর্জিত দক্ষতার প্রত্যাবর্তন এবং ব্যবহারকেও এজেন্ডায় রেখেছে।
ভারত সরকার ভাষা, সাংস্কৃতিক এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ কোর্স আয়োজনের মাধ্যমে কর্মীদের দক্ষতা উন্নত করার এবং গন্তব্য দেশগুলি থেকে আরও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করছে। এই পদক্ষেপগুলি সরকারের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে পারে এবং অভিবাসন চুক্তিগুলির পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে পারে।
তবে, এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে অভিবাসন-বিরোধী পদক্ষেপ, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের দক্ষ ভিসার মূল্য বৃদ্ধি, ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন-বিরোধী মনোভাব বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষ ভিসার (H-1B) উপর $100,000 ফি আরোপ করেছেন, যা ভারতীয় দক্ষ শ্রমিকদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা তৈরি করেছে। অন্যদিকে, তরুণ ভারতীয়দের স্থায়ীভাবে অভিবাসনের আকাঙ্ক্ষা কর্মীবাহিনীর কার্যকর প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। ভারতে মজুরি বৈষম্য এবং চাকরির অভাবও শ্রমিকদের দেশে ফিরে আসা কঠিন করে তুলেছে।
তবে, পরিসংখ্যান দেখায় যে ভারতীয় অভিবাসীদের দেশে ফিরে আসার প্রবণতা বাড়ছে। ২০২১ সালে ৫.৪ মিলিয়ন থেকে, ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ৯.৩ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। ভারত সরকার ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করে, স্টার্ট-আপগুলিকে সমর্থন করে এবং সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি করে বৃত্তাকার অভিবাসনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।#
পার্সটুডে/এমআরএইচ/১১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।