ইসরায়েল কি লোহিত সাগরে মিশরকে কৌশলগতভাবে ঘিরে ফেলছে?
https://parstoday.ir/bn/news/world-i156476-ইসরায়েল_কি_লোহিত_সাগরে_মিশরকে_কৌশলগতভাবে_ঘিরে_ফেলছে
পার্সটুডে: আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রভাব ও হস্তক্ষেপ বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় সোমালিয়ায় নিজের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে মিশর।
(last modified 2026-02-17T14:37:08+00:00 )
জানুয়ারি ২৬, ২০২৬ ২০:৩৯ Asia/Dhaka
  • ইসরায়েল কি লোহিত সাগরে মিশরকে কৌশলগতভাবে ঘিরে ফেলছে?

পার্সটুডে: আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রভাব ও হস্তক্ষেপ বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় সোমালিয়ায় নিজের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে মিশর।

পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অঞ্চলে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের জবাবে মিশর সোমালিয়া ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে সামরিক ও নিরাপত্তা কার্যক্রম বিস্তৃত করছে।

ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল তথাকথিত সোমালিল্যান্ড-কে স্বীকৃতি দেওয়ার পর কায়রো তার তৎপরতা বাড়ায়। মিশরের নিরাপত্তা মহলের মতে, এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মিশরের কৌশলগত স্বার্থের জন্য সরাসরি হুমকি।

ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, মিশর সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মাহমুদ-এর সরকারের প্রতি সমর্থন জোরদার করছে, যাতে সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় থাকে এবং আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে তেল আবিবের তৎপরতা থেকে উদ্ভূত সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধ করা যায়।

মিশরীয় কর্মকর্তারা মনে করেন, ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া মূলত বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও লোহিত সাগরের কাছাকাছি একটি কৌশলগত অবস্থান তৈরি করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ- যে অঞ্চল মিশরের সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মুখোমুখি অবস্থান একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ, যা লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব এবং পূর্ব আফ্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ময়দানে পরিণত হয়েছে এবং এখানে ক্ষমতার ভারসাম্যে যেকোনো পরিবর্তন মিশরের জাতীয় নিরাপত্তা ও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর কৌশলগত স্বার্থের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

দশকের পর দশক ধরে মিশর আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলকে নিজের কৌশলগত গভীরতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক নৌপথ নিয়ন্ত্রণ এবং সুয়েজ খাল রক্ষা করা কায়রোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সোমালিয়া, জিবুতি বা ইরিত্রিয়ার উপকূলে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর উপস্থিতি মিসরের সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং এটিকে মিশর, সুদান ও ইয়েমেনের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া এই প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সোমালিল্যান্ড উত্তর সোমালিয়ার একটি কৌশলগত অঞ্চল, যেখান থেকে বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর ওপর নজর রাখা যায়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তেল আবিব কয়েকটি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে: প্রথমত, এমন একটি অঞ্চলে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা যা মিশরের সামুদ্রিক নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে; দ্বিতীয়ত, জ্বালানি পরিবহন রুটের কাছে একটি নতুন অংশীদার তৈরি করা; তৃতীয়ত, পূর্ব আফ্রিকায় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা তৎপরতার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা এবং শেষ পর্যন্ত গাজা উপত্যকার বাসিন্দাদের স্থানান্তরের জন্য সম্ভাব্য একটি স্থান তৈরি করা।

মিশর এই পদক্ষেপকে নিজের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে। কায়রোর আশঙ্কা, সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের উপস্থিতি সামরিক বা গোয়েন্দা ঘাঁটি স্থাপনের পথ তৈরি করতে পারে, যা লোহিত সাগরে মিশরের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করবে এবং কার্যত ইসরায়েলের মাধ্যমে দেশটিকে কৌশলগতভাবে ঘিরে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি করবে। এ ছাড়া, ইথিওপিয়ার সঙ্গে নাহদা বাঁধ (গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম) নিয়ে চলমান সংকটে মিশর এমনিতেই চাপের মুখে রয়েছে। পূর্ব আফ্রিকায় ইসরায়েলের প্রভাব বৃদ্ধি এই শক্তির ভারসাম্যকে কায়রোর বিপক্ষে নিয়ে যেতে পারে, কারণ তেল আবিবের সঙ্গে ইথিওপিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিশর সোমালিয়া, জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করেছে, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায়। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত এই প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে এবং কায়রোকে অঞ্চলে নিজের উপস্থিতি বাড়াতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা এবং বন্দর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে।

এই মুখোমুখি অবস্থানের প্রভাব বহুমুখী হতে পারে। প্রথমত, আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে অস্ত্র ও নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে—যে অঞ্চল আগে থেকেই অস্থিতিশীলতা, সন্ত্রাসবাদ ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জর্জরিত। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বহিরাগত শক্তিগুলোর উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে, যা এই কৌশলগত অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

সব মিলিয়ে প্রমাণ মিলছে যে, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর একটি সাধারণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি পূর্ব আফ্রিকা ও লোহিত সাগর অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। এই বাস্তবতা অনুধাবন করে মিশরও অঞ্চলে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে এবং ইসরায়েলের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব ইঙ্গিত বলছে, আগামী বছরগুলোতে আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল কায়রো ও তেল আবিবের মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান মঞ্চে পরিণত হবে।#

পার্সটুডে/এমএআর/২৬