সভ্যতার মুখোশের আড়ালের বর্বরতা
এআই'র জনক থেকে নাস্তিক বিজ্ঞানী: এপস্টেইন কেলেঙ্কারিতে কারা জড়িত ছিলেন?
-
স্টিফেন হকিং ও জেফ্রি এপস্টেইন
পার্সটুডে: বিজ্ঞান ও জ্ঞানের অগ্রগতির সাথে জড়িয়ে থাকেন কিছু নাম, যাদের থেকে পৃথিবীর উন্নতির আশা করা হয়। কিন্তু জেফ্রি এপস্টেইন নামের এক মার্কিন কোটিপতির কেলেঙ্কারি সেই বিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে। তার অনৈতিক ও নৃশংস কর্মকাণ্ডের তদন্তে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তাতে বেশ কিছু বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীর নাম জড়িয়েছে। এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে তার অতিথি বা সংস্পর্শে আসা কিছু বিজ্ঞানীর তালিকা ও তাদের ভূমিকা নিয়ে এই প্রতিবেদন।
১. মারভিন মিনস্কি: যাকে বলা হয় ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জনক’
মারভিন মিনস্কি আমেরিকার এমআইটি (MIT) বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ। বিজ্ঞান জগতে তার সম্মান অনেক।
এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা একাধিক নারী বলেছেন, এপস্টেইন বা তার সহযোগীরা তাদের বাধ্য করেছিলেন মিনস্কির সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে। এপস্টেইনের বিমানে চড়ে মিনস্কি তার দ্বীপেও গিয়েছিলেন বলে নথিতে আছে।
মিনস্কি ২০১৬ সালে মারা যান, তাই তার বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তার নাম এই কেলেঙ্কারির সাথে জড়িয়ে গেছে।
২. জোই ইটো: এমআইটির মিডিয়া ল্যাবের প্রাক্তন প্রধান
জোই ইটো ছিলেন এমআইটির বিখ্যাত ‘মিডিয়া ল্যাব’-এর পরিচালক। প্রযুক্তি ও গবেষণা জগতে তার প্রভাব ছিল অনেক।
এপস্টেইনের সাথে যোগসূত্র: ইটো এপস্টেইনের কাছ থেকে তার মিডিয়া ল্যাবের জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার অনুদান নিয়েছিলেন। তিনি এপস্টেইনকে এমআইটির সম্মানজনক অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ জানান, যা এপস্টেইনের জন্য একরকম সম্মাননা ও ‘বৈধতা’ তৈরি করে দিয়েছিল।
এই সম্পর্ক ফাঁস হওয়ার পর ইটোকে এমআইটির মিডিয়া ল্যাবের প্রধান হিসেবে পদত্যাগ করতে হয়।
৩. মার্টিন নোভাক: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক
মার্টিন নোভাক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও জীববিজ্ঞানের একজন খ্যাতনামা অধ্যাপক।
নোভাক এপস্টেইনের কাছ থেকে তার গবেষণা কেন্দ্রের জন্যও বড় অঙ্কের অনুদান পেয়েছিলেন। বিনিময়ে, তিনি এপস্টেইনকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ব্যক্তিগত অফিস দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। এভাবেই একজন অপরাধী বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার পায়।
৪. স্টিফেন হকিং: বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী
বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং-এর নাম এই তালিকায় আসা বহু মানুষের জন্য ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
প্রথমে অনেকে বিশ্বাসই করতে চাননি। কিন্তু পরে তার এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে উপস্থিত থাকার ছবি প্রকাশ পায়। তখন প্রশ্ন ওঠে—যার বিরুদ্ধে তখনই নানা নৈতিক কেলেঙ্কারির গুঞ্জন ছিল, সেই ব্যক্তির দ্বীপে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী কেন যাবেন?
এই বিষয়টি শুধু একটি অপরাধ মামলার প্রশ্ন নয়। এটি প্রমাণ করে এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক কতটা গভীর ও বিস্তৃত ছিল। এমনকি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী একজন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীকেও এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।
৫. লরেন্স ক্রাউস: জনপ্রিয় পদার্থবিজ্ঞানী ও লেখক
লরেন্স ক্রাউসও একজন নামকরা পদার্থবিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞান বিষয়ক জনপ্রিয় লেখক। ক্রাউস এপস্টেইনের দ্বীপে বহুবার গিয়েছেন বলে জানা যায়। তার সঙ্গে এপস্টেইনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এবং এপস্টেইন তার কিছু গবেষণা প্রকল্পেরও অর্থ দিয়েছিলেন।
৬. স্টিভেন পিঙ্কার: হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী
স্টিভেন পিঙ্কার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী এবং ভাষা ও মস্তিষ্ক বিষয়ে গবেষক।
পিঙ্কারের নামও এপস্টেইনের নথিপত্র ও ফ্লাইট লগে এসেছে। তিনি এপস্টেইনের দ্বীপে গিয়েছিলেন। পিঙ্কার নিজে বলেছেন, তিনি এপস্টেইনের কোনো অনৈতিক কাজে জড়িত ছিলেন না এবং শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক আলোচনার জন্যই সেখানে গিয়েছিলেন।
সভ্যতার মুখোশের আড়ালের বর্বরতা
এই কেলেঙ্কারি শুধু কয়েকজন ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাহিনী নয়। এটি দেখিয়ে দেয় কিভাবে অর্থ, ক্ষমতা এবং মর্যাদা এমনকি বিজ্ঞান ও শিক্ষার মহৎ জগতকেও প্রভাবিত করতে পারে। এপস্টেইন তার অর্থ ব্যবহার করে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছিল, যার মাধ্যমে তিনি তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিলেন। অনেক বিজ্ঞানী হয়তো তার দ্বীপে গিয়েছিলেন শুধু গবেষণার জন্য অর্থ বা সম্মাননা পাওয়ার আশায়, কিন্তু এই কাজ অজান্তেই এপস্টেইনের অপকর্মকে এক ধরনের বৈধতা দিয়েছে।
এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচার যে কোনো ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ—তা বিজ্ঞান হোক, রাজনীতি হোক বা ব্যবসা হোক।#