সামরিক ব্যর্থতা থেকে ইরানে অর্থনৈতিক আগ্রাসন: যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হতাশা
-
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট
পার্সটুডে: মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আবারও দাদাগিরিপূর্ণ ভাষায় বিশ্বের দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে হুমকি দিয়ে বলেছেন, কোনো দেশেরই তেহরানকে সমর্থন করা উচিত নয়।
২ সেপ্টেম্বর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে স্কট বেসেন্ট বলেন, সবার প্রতি তাঁর বার্তা হলো-ইরান থেকে দূরে থাকুন এবং কেউ যেন দেশটিকে সমর্থন না করে। তিনি দাবি করেন, সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় “বিমান সংস্থা, নৌপরিবহন কোম্পানি এবং ডিজিটাল সম্পদ” অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বেসেন্ট আরও বলেন, “যে কেউ ইরানকে সহায়তা করবে”, যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গে আলোচনায় যাবে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থনৈতিক যুদ্ধ জোরদারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং তেহরানের সঙ্গে যে-কোনো ধরনের সহযোগিতার বিরুদ্ধে স্কট বেসেন্টের হুমকিমূলক বক্তব্য শুধু ওয়াশিংটনের গভীর কৌশলগত হতাশারই বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে সামরিক মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট ব্যর্থতারও প্রতিফলন। “অর্থনৈতিক বহিষ্কার অভিযান” এবং ইরানকে “অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ” করার স্লোগানে শুরু হওয়া এই পদক্ষেপ মূলত সামরিক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার ক্ষতিপূরণ এবং সামরিক শক্তি দিয়ে যে লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয় নি, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তা অর্জনের প্রচেষ্টা।
পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি চীন ও রাশিয়ার এসব হুমকিকে উপেক্ষা করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনায় সহযোগিতা না করার পেছনে গভীর ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব রয়েছে, যা ওয়াশিংটনের ইচ্ছার অনেক ঊর্ধ্বে। সাম্প্রতিক ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্যও ইঙ্গিত করছে যে চীন ও রাশিয়া শুধু এসব পদক্ষেপ মেনে নেয় নি তা-ই নয়, বরং ধারণা করা হচ্ছে অন্যান্য দেশও যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। ফলে ইরানকে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ওয়াশিংটনের কৌশল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
চীনের ক্ষেত্রে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থ। বেইজিং স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে তার অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত হলে সে নিজের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনেছে। চলতি বছরও চীন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল গ্রহণ করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য কম।
এই পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা এমন একটি সীমারেখা, যা বেইজিংয়ের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি চীনের “টি-পট” রিফাইনারিগুলো-যেগুলোর অধিকাংশই স্বাধীন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল-নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল কেনার কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের মধ্যে চীনের এসব স্বাধীন রিফাইনারি রয়েছে এবং ইরানের তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এসব প্রতিষ্ঠানে যায়।
অন্যদিকে, রাশিয়াও কৌশলগত ও কাঠামোগত কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য নয়। মস্কো নিজেই বহু বছর ধরে ব্যাপক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে এবং কার্যত মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে বিভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করছে। ফলে রাশিয়ার ওপর ওয়াশিংটনের চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার অনেকটাই অকার্যকর। ২০২৫ সালে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত ২০ বছরের কৌশলগত চুক্তি এবং ব্যাপক সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ইঙ্গিত দেয় যে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জোরদারে ক্রেমলিনের দৃঢ় অবস্থান রয়েছে। মস্কো এসব পদক্ষেপকে স্পষ্টভাবে “অবৈধ চাপ” হিসেবে অভিহিত করেছে এবং দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে নিষেধাজ্ঞার ব্যবহার প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই অবজ্ঞার কারণ বুঝতে হলে এর পটভূমি-অর্থাৎ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ব্যর্থতা-বিবেচনায় নিতে হবে। কয়েক মাসের সংঘাত এবং বিপুল আর্থিক ও মানবিক ব্যয়ের পর ওয়াশিংটন উপলব্ধি করেছে যে সামরিক পদক্ষেপ শুধু নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনেই ব্যর্থ হয়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপরও বড় ধরনের ব্যয় চাপিয়েছে।
সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধে ঝুঁকে পড়া মূলত সামরিক ক্ষেত্রে নিজেদের অক্ষমতার পরোক্ষ স্বীকারোক্তি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে যা অর্জন করা যায়নি, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তা অর্জনের চেষ্টা। বেসেন্টের “অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ” ও “সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা” র মতো বক্তব্য শক্তির প্রকাশের চেয়ে সামরিক হাতিয়ারের কার্যকারিতা নিয়ে হতাশা ও অক্ষমতারই বেশি ইঙ্গিত দেয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধও বড় ধরনের কাঠামোগত বাধার মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আগের মতো একচেটিয়া অর্থনৈতিক আধিপত্য আর নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে একতরফা ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রচেষ্টা নানা ঝুঁকিতে পরিপূর্ণ। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে—যে ঝুঁকি গ্রহণে ওয়াশিংটনের আগ্রহ কম। একইভাবে চীন ও রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করাও তাদের বিশেষ আন্তর্জাতিক অবস্থানের কারণে “অত্যন্ত কঠিন” হবে। ফলে ওয়াশিংটন এমন এক কৌশলগত সংকটে পড়েছে, যেখানে কার্যকরভাবে পিছু হটারও সুযোগ নেই, আবার সামনে এগিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনের নিশ্চয়তা নেই।
সবশেষে বলা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক তৎপরতা শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে বরং মার্কিন আধিপত্যের অবক্ষয় এবং ইরানের মোকাবিলায় কৌশলগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর ওয়াশিংটনের হুমকিকে উপেক্ষা করা আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন এবং একতরফা বিশ্বব্যবস্থার অবসানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিদ্যমান বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক যুদ্ধও মোকাবিলা করতে পারে এবং আবারও প্রমাণ করতে পারে-দাদাগিরি ও অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না।#
পার্সটুডে/এনএম/৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।