মিনাবের স্কুল থেকে কুহেস্তাকের বিয়ের অনুষ্ঠান: নিরীহ মানুষই মার্কিনীদের শিকার
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i162746-মিনাবের_স্কুল_থেকে_কুহেস্তাকের_বিয়ের_অনুষ্ঠান_নিরীহ_মানুষই_মার্কিনীদের_শিকার
পার্সটুডে: মঙ্গলবার রাতে দক্ষিণ ইরানের সিরিক জেলার বন্দর কুহেস্তাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন সেনাবাহিনী হামলা চালায়। এতে কয়েক ডজন মানুষ শহীদ ও আহত হন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
(last modified 2026-09-03T14:59:53+00:00 )
সেপ্টেম্বর ০৩, ২০২৬ ১৭:২০ Asia/Dhaka
  • মিনাবের স্কুল
    মিনাবের স্কুল

পার্সটুডে: মঙ্গলবার রাতে দক্ষিণ ইরানের সিরিক জেলার বন্দর কুহেস্তাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন সেনাবাহিনী হামলা চালায়। এতে কয়েক ডজন মানুষ শহীদ ও আহত হন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।

পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার বছর বয়সী একটি শিশুও শহীদ হয়েছে। বিয়ের আনন্দের অনুষ্ঠান মুহূর্তেই পরিণত হয় অপরাধের দৃশ্যে। এটি শুধু একটি সামরিক হামলা নয়; এটি বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ। কুহেস্তাকের মানুষ কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন না। তারা বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলেন। শিশুরা ছিল পরিবারের সদস্যদের পাশে। যুক্তরাষ্ট্র সেই বেসামরিক সমাবেশকেই লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন বোমা এমন পরিবারগুলোর ওপর নেমে এসেছে, যাদের যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা ছিল না।

কুহেস্তাক সেই ধারাবাহিকতারই অংশ, যার আগের দৃষ্টান্ত দেখা গেছে মিনাব ও লামার্দে। মিনাবে একটি স্কুল লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। লামার্দে একটি ক্রীড়া হল লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। আর এখন কুহেস্তাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে। এসব হামলার একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রতিবারই শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ। সেই শিশুরা, যাদের স্কুলে থাকার কথা। সেই পরিবারগুলো, যাদের একসঙ্গে থাকার কথা। সেই মানুষগুলো, যাদের আনন্দ-উৎসব করার কথা, বোমার ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রাণ দেওয়ার নয়।

এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সংসদ মজলিসের স্পিকার মোহাম্মদবাকের কালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে “মহাশয়তান” বলে অভিহিত করেছেন। আজ এই শব্দটি শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়; যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডই এর অর্থ স্পষ্ট করেছে। মহাশয়তান সেই শক্তি, যে নিজের সীমান্ত থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে যুদ্ধ শুরু করে, অথচ এরপর বিশ্বকে মানবাধিকারের বক্তৃতা দেয়।

ওয়াশিংটন বহু বছর ধরে মানবাধিকারকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, দেশগুলোকে হুমকি দিয়েছে এবং অন্যদের নৈতিকতার পাঠ পড়িয়েছে। অথচ সেই একই যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানে বাড়িঘর, স্কুল, ক্রীড়া হল এবং বিয়ের অনুষ্ঠানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করছে।

মানবাধিকার ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। রাজনৈতিক বিবৃতির সংখ্যা দিয়ে নৈতিক মর্যাদা তৈরি হয় না। যে সরকার নিজেকে মানবাধিকারের রক্ষক হিসেবে দাবি করে, তাকে সবার আগে নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। ইরানি শিশুদের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার-সংক্রান্ত দাবির জন্য একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষার ফলাফল মানুষ দেখছে।

কুহেস্তাকের ঘটনা যুদ্ধের আরেকটি বাস্তবতাও সামনে এনেছে। বিপদ শুধু বোমাবর্ষণ নয়; আরও বড় বিপদ হলো বোমাবর্ষণকে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করা। বিপদ হলো শিশুদের মৃত্যু যেন প্রতিদিনের সাধারণ সংবাদে পরিণত হয়। বেসামরিক মানুষের হত্যাকাণ্ড যেন যুদ্ধের অসংখ্য খবরের ভিড়ে হারিয়ে যায়। আর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—বিশ্ব যেন এসব অপরাধ দেখতে দেখতে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

তবে দায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়। ইউরোপের নীরবতাও এই নৈতিক সংকটের অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনায় ইউরোপীয় সরকারগুলো বিবৃতি দেয়, মানবাধিকারের কথা বলে এবং আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু যখন ইরানি নারী ও শিশুরা মার্কিন হামলার শিকার হয়, তখন তাদের প্রতিবাদের আওয়াজ শোনা যায় না।

এই নীরবতারও একটি রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রের ক্ষেত্রে ইউরোপের ভাষা যেন ভিন্ন। অন্যান্য ক্ষেত্রে যে ইউরোপ মানবাধিকারকে মৌলিক নীতি হিসেবে তুলে ধরে, ইরানি বেসামরিক মানুষের মৃত্যুতে সেই ইউরোপ নীরব থাকে। এই দ্বিচারিতা মানবাধিকারের মর্যাদা রক্ষা করার পরিবর্তে পশ্চিমা বিশ্বের দ্বৈত নীতির অসারতাই আরও স্পষ্ট করে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও চিরকাল নীরবতার আড়ালে থাকতে পারে না। বেসামরিক মানুষের জীবন যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখনই জাতিসংঘের প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতির জন্যই নিরাপত্তা পরিষদ রয়েছে। আর মানবাধিকার সংস্থাগুলো গড়ে উঠেছে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য। শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় নীরবতা এসব প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।

কুহেস্তাক শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি একটি দলিল। এমন এক যুদ্ধের দলিল, যা যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেছে এবং যার মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমন এক শিশুর দলিল, যে আর কখনো বাড়ি ফিরবে না। এমন এক পরিবারের দলিল, যাদের বিয়ের আনন্দ শোকের অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আর এমন এক বিশ্বের দলিল, যে মানবাধিকার রক্ষার দাবি করে, অথচ বেসামরিক মানুষের হত্যাকাণ্ডের সামনে নীরব থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র এই অপরাধকে যুদ্ধের অসংখ্য খবরের ভিড়ে আড়াল করতে পারে। ইউরোপ নীরব থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অস্পষ্ট বিবৃতি দিতে পারে। কিন্তু ইতিহাস নীরব থাকে না।

কুহেস্তাকের ঘটনাকে রাজনৈতিক বিবৃতি দিয়ে আড়াল করা যাবে না। এই অপরাধ ইরানের মানুষের স্মৃতিতে এবং ইতিহাসের বিচারে থেকে যাবে। কুহেস্তাকে যুক্তরাষ্ট্র আবারও “মহাশয়তান”-এর প্রকৃত চেহারা তুলে ধরেছে।#

পার্সটুডে/এনএম/৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।