কেন ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সাবমেরিন বিধ্বংসী বিমান কিনতে চাইছে?
-
মার্কিন সাবমেরিন বিধ্বংসী বিমান
পার্সটুডে-পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরে সামুদ্রিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই ইসরায়েলি সূত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বোয়িংয়ের তৈরি ‘পি-৮ পোসেইডন’ সামুদ্রিক টহল ও সাবমেরিনবিধ্বংসী বিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে।
‘জেরুজালেম পোস্ট’-এর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানায়, ইসরায়েলি নৌবাহিনী পি-৮ পোসেইডন কেনার বিষয়টি বিবেচনা করছে। বিমানটির প্রধান কাজ হলো সাবমেরিন শনাক্ত ও মোকাবিলা করা। আগামী দশকের জন্য ইসরায়েলি নৌবাহিনীর কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং এর সম্ভাব্য খরচ ও সামরিক প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
কয়েক সপ্তাহ আগে ইসরায়েলি নৌবাহিনীর কমান্ডার ইয়াল হারেল বোয়িংয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে পি-৮ কেনার বিষয়টি আলোচনায় আসে। একই সময়ে ইসরায়েল জার্মানি থেকে তার ষষ্ঠ সাবমেরিন ‘ড্রাগন’ গ্রহণ করেছে এবং পানির নিচের নৌবহর আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে।
বোয়িং ৭৩৭-এর আধুনিক সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি পি-৮ পোসেইডনকে বিশ্বের অন্যতম উন্নত সাবমেরিনবিধ্বংসী বিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রায় ২,২০০ কিলোমিটার অপারেশনাল রেঞ্জ ও আকাশে জ্বালানি নেওয়ার সক্ষমতার কারণে এটি ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় দীর্ঘ সময় টহল দিতে পারে।
বিমানটিতে রয়েছে সামুদ্রিক অনুসন্ধান রাডার, সোনোবয়, ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড সেন্সরসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি। এটি এমকে-৫৪ লাইটওয়েট টর্পেডো, হারপুন অ্যান্টি-শিপ মিসাইলসহ বিভিন্ন অস্ত্র বহন করতে পারে। পাশাপাশি এটি সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ, সমুদ্রপৃষ্ঠের লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে অভিযান এবং গোয়েন্দা, নজরদারি ও শনাক্তকরণে ব্যবহার করা যায়।
সম্ভাব্যভাবে পি-৮ ইসরায়েলকে তুরস্ক ও মিসরের ক্রমবর্ধমান সাবমেরিন সক্ষমতা মোকাবিলায় আকাশভিত্তিক নজরদারির একটি নতুন স্তর দেবে। বিশেষ করে তুরস্কের সাবমেরিন বহর নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তুরস্কের বর্তমানে ১৪টি সক্রিয় সাবমেরিন রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা ১৮টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন সাবমেরিনগুলোর কিছুতে এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন (AIP) প্রযুক্তি থাকবে, যা দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থানের সক্ষমতা বাড়ায়।
অন্যদিকে ইসরায়েলের কাছে বর্তমানে ছয়টি সাবমেরিন রয়েছে এবং দেশটির নৌবাহিনী মূলত উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ও গ্যাসক্ষেত্র সুরক্ষায় গুরুত্ব দেয়। ফলে ইসরায়েলি সামরিক পরিকল্পনাকারীরা পানির নিচের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে বিমানভিত্তিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখছেন।
তবে পি-৮ কেনার ক্ষেত্রে ব্যয় একটি বড় বাধা। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট নথি অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর নতুন অর্ডারে প্রতিটি পি-৮-এর গড় মূল্য প্রায় ৩৫২ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৯২ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে ইসরায়েল সাবমেরিন ও বিমানবাহিনীসহ একাধিক বড় সামরিক প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করছে। ফলে এই বিমান কেনা দেশটির জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
কৌশলগতভাবে পি-৮ ইসরায়েলের সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং গ্রিস ও সাইপ্রাসের মতো আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সাবমেরিনকেন্দ্রিক সামরিক প্রতিযোগিতাও বাড়তে পারে এবং তুরস্ক পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, পি-৮ পোসেইডন কেনার আলোচনা ইসরায়েলি নৌবাহিনীর উপকূলকেন্দ্রিক সক্ষমতা থেকে আরও বিস্তৃত সামুদ্রিক নজরদারি ও দূরপাল্লার সক্ষমতার দিকে যাওয়ার পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে উচ্চ ব্যয়, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন এবং ভবিষ্যতে তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্কের গতিপথের ওপর।#
পার্সটুডে/এনএম /২৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।