একপেশে ও খণ্ডিত দৃষ্টিতে ঐতিহাসিক ঘটনা মূল্যায়নের নিন্দা
প্রাচীন পারস্য সম্পর্কে রুবিওর মন্তব্যের নিন্দা জানালেন ইরানি শিক্ষাবিদরা
-
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বক্তব্য রাখছেন
পার্সটুডে: ইরানের একদল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ প্রাচীন পারস্যের রাজা প্রথম জেরক্সেস এবং এথেন্স ধ্বংস সম্পর্কে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, পশ্চিমা রাজনীতিকরা প্রাচীন ইতিহাসের বেছে বেছে কিছু অংশ তুলে ধরছেন।
ইরানের স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি (আইএসএনএ)-তে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে শিক্ষাবিদরা হাখামানেশিয় বা আখেমেনীয় সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের পক্ষে অবস্থান নেন। একই সঙ্গে ইরানি সভ্যতা সম্পর্কে পক্ষপাতদুষ্ট ও উসকানিমূলক মন্তব্যের জবাব দিতে তাঁরা বিশ্বের শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদদের প্রতি আহ্বান জানান।
গত ৭ অক্টোবর এথেন্সে দেয়া এক ভাষণে রুবিও খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালে পারস্যের এথেন্স আক্রমণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি পশ্চিমা সভ্যতা গঠনে ভূমিকা রাখা সংঘাতগুলোর উদাহরণ হিসেবে রাজা জেরক্সেসের শাসনামলে অ্যাক্রোপলিস ও এর উপাসনালয়গুলো ধ্বংসের ঘটনা তুলে ধরেন।
ইরানি শিক্ষাবিদরা বলেন, এ ধরনের বর্ণনায় বৃহত্তর ঐতিহাসিক পরিস্থিতি এবং প্রাচীন গ্রিক ও মেসিডোনীয় বাহিনীর সংঘটিত অন্যান্য ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা উপেক্ষা করা হয়েছে।
বিবৃতিতে ইরানের সাম্রাজ্যিক ঐতিহ্যের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মহান সাইরাসের শাসনামল থেকে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আখেমেনীয় সাম্রাজ্যকে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যার বৈশিষ্ট্য ছিল শাসনব্যবস্থার বিশেষ ধরন, ধর্মীয় সহনশীলতা, স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উপাসনালয় পুনর্নির্মাণ।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাইরাস (কুরুশ), প্রথম দারিয়ুস ও প্রথম জেরক্সেসসহ পারস্যের শাসকেরা এমন এক সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাফল্য বিদেশি পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। বিশেষ করে গ্রিক ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা এ সভ্যতার প্রতি আগ্রহী ছিলেন।
ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদরা প্রাচীন পারস্যের শাসনব্যবস্থা যে শুধু সামরিক বিজয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না, বরং তা ছিল আরও জটিল ও বহুমাত্রিক—এমন প্রমাণ হিসেবে গ্রিক সাহিত্য ও ঐতিহাসিক বিবরণ উল্লেখ করেছেন। তাঁরা সাইরাস এবং তাঁর নেতৃত্বের ধরন সম্পর্কে কয়েকজন গ্রিক লেখকের প্রকাশিত প্রশংসার কথাও তুলে ধরেছেন।
বিবৃতিতে পশ্চিমা রাজনীতিকদের প্রাচীন সংঘাতের ইতিহাসগুলো বিশেষ কিছু ঘটনাকে বেছে বেছে উপস্থাপন করাকে সমালোচনা করা হয়েছে। রুবিও যখন পারস্যের হাতে এথেন্স ধ্বংসের ঘটনা তুলে ধরেছেন, তখন ইরানি শিক্ষাবিদরা আয়োনীয় বিদ্রোহের সময় সার্দিস নগরী পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা এবং পরবর্তীকালে মেসিডোনীয় বিদ্রোহী আলেকজান্ডারের অভিযানের সময় পার্সেপোলিস ধ্বংসের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
তাঁদের মতে, পারস্য ও গ্রিক সভ্যতার ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে যেকোনো আলোচনায় এসব ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
ইরানি শিক্ষাবিদ ও লেখকেরা প্রাচীন পারস্যের সাম্রাজ্যিক অভিযানগুলোর সঙ্গে সমসাময়িক ইরানের তুলনা করার বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ঐতিহাসিক ঘটনাকে ব্যবহার করে ইরানকে পশ্চিমা সভ্যতা বা ইউরোপীয় মূল্যবোধের জন্য জাত-শত্রু বা হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে ইরানের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব মুছে ফেলা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অঞ্চলটির প্রাচীন ইতিহাসকে আরও ন্যায়নিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতির ইরানি শিক্ষাবিদ ও লেখকেরা ঐতিহাসিক ঘটনার ভুল ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে ইরানি বুদ্ধিজীবীদের প্রতি সংহতি প্রকাশের জন্য বিশ্বের শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের আমন্ত্রণ জানান।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ইরান বিশ্বের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে গৌরবময় সভ্যতাগুলোর একটি গড়ে তুলেছে। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইতিহাসের প্রতি ন্যায্যতা বজায় রাখার গুরুত্বও এতে তুলে ধরা হয়।
ইরানি শিক্ষাবিদরা আরও বলেছেন, দীর্ঘ ইতিহাসে ইরান কখনো যুদ্ধ শুরু করেনি। একই সঙ্গে তাঁরা বহিরাগত হুমকির বিরুদ্ধে নিজেদের দেশ রক্ষায় ইরানিদের দৃঢ় সংকল্পের কথাও তুলে ধরেছেন। #
পার্স টুডে/এমএএইচ/১৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।