বিরোধীদের উদ্দেশে রিজিজুর বার্তা
‘ভারত বাংলাদেশ বা ফ্রান্স নয়, সরকার বদলাবে নির্বাচনের মাধ্যমেই’
-
কিরেন রিজিজু
ভারতে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মতো পরিস্থিতি তৈরির ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন কেন্দ্রীয় সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তাঁর দাবি, ভারতবিরোধী গোষ্ঠী ও কয়েকজন রাজনীতিক তরুণদের উসকে দিয়ে রাস্তায় সহিংসতা ছড়ানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে ভারতে সরকার পরিবর্তন হলে তা নির্বাচনের মাধ্যমেই হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে রিজিজু বাংলাদেশে সহিংসতা এবং ফ্রান্সে দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনার সঙ্গে ভারতের পরিস্থিতির তুলনা করেন। তাঁর অভিযোগ, একই ধরনের পরিস্থিতি ভারতে তৈরির ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। তবে ষড়যন্ত্রকারীরা ভুলে গিয়েছিলেন, ভারত বাংলাদেশ বা ফ্রান্স নয়।
রিজিজু লেখেন, ভারতে সরকার পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব, তবে তা নির্বাচনের মাধ্যমে হতে হবে; জর্জ সোরোসের মতো কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের মাধ্যমে নয়। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বিরোধীদের আন্দোলন ও সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেন।
মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোস ও তাঁর সংস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে। তবে রিজিজুর সাম্প্রতিক অভিযোগের পক্ষে তাঁর পোস্টে বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।
নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিসহ নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে বিরোধীদের প্রতিবাদের মধ্যেই রিজিজুর এই বক্তব্য সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কর্মসূচি নিয়ে বিরোধীদের একাংশের আপত্তি রয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং এতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর রিজিজুর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের সঙ্গে ভারতের তুলনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভারত বাংলাদেশ নয়, ফ্রান্সও নয়। বিরোধীরা সহিংসতায় বিশ্বাস করে না; তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে চায়।
থারুরের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তাঁর মতে, বিষয়টি ক্ষমতার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র নয়; বরং সাংবিধানিক অধিকার ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
কংগ্রেসের আরেক নেতা পবন খেরাও ভারত ও ইউরোপের বিক্ষোভের মধ্যে তুলনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হচ্ছে এবং মুসলমানদের সহিংস হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চলছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
দিল্লির আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা নেহা বোরার
রিজিজু তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের পাশাপাশি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) নেত্রী নেহা বোরার একটি বিতর্কিত ভিডিওও শেয়ার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর এক সাক্ষাৎকারে নেহা বোরা দিল্লির আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্দোলনের তুলনা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশের আন্দোলন গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের দাবিতে শুরু হয়েছিল। ভারতের তরুণদের আন্দোলনও গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তিনি দাবি করেন।
নেহা বোরা আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে, শিক্ষার বেসরকারিকরণ বাড়ছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গেরুয়াকরণ চলছে। এসব বিষয়ও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে বাংলাদেশের আন্দোলন, ফ্রান্সের বিক্ষোভ এবং ভারতের শিক্ষার্থী বা বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের পটভূমি এক নয়। প্রতিটি আন্দোলনের কারণ, অংশগ্রহণকারী, দাবিদাওয়া ও ঘটনাপ্রবাহ আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নির্বাচন ও আন্দোলনের অধিকার
রিজিজুর বক্তব্যে ভারতের রাজনৈতিক বিতর্কে দুটি ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিজেপির পক্ষ থেকে আন্দোলনের পেছনে ষড়যন্ত্র ও বাইরের প্রভাবের অভিযোগ তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস ও বিরোধীদের বক্তব্য, তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, ভোটাধিকার এবং সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা।
একদিকে সরকার পরিবর্তনের সাংবিধানিক পথ হিসেবে নির্বাচনের ওপর জোর দিচ্ছেন রিজিজু, অন্যদিকে বিরোধীরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা।#
পার্সটুডে/এমএআর/১৮