ওয়াইসির কড়া বার্তা: মুসলিমরা আর নেতা বানাবে না, নিজেরাই নেতৃত্ব দেবে
-
আসাদউদ্দিন ওয়াইসি
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি মুসলিম তরুণদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি নেহেরু-গান্ধী ও যাদব পরিবারের নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন, যা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
রামপুরে এক জনসভায় ওয়াইসি বলেন, "আমরা আর কোনো নেহেরু, গান্ধী বা কোনো যাদবকে আমাদের নেতা বানাবো না। আমাদের সারিতে দাঁড়ানো তরুণ-তরুণীরাই নেতা হবে।" তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো মুসলিমদের ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করেছে, কিন্তু মুসলিম তরুণদের নিজস্ব নেতৃত্ব গড়ে তোলার পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়নি। তাঁর দাবি, মুসলিম তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার মেধা ও সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু তাঁরা প্রয়োজনীয় সুযোগ ও প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছেন না।
এআইএমআইএম প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তরুণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে চায় বলে উল্লেখ করেন ওয়াইসি। তিনি বলেন, তরুণদের দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বঞ্চিত মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেওয়াও দলের লক্ষ্য।
মুসলিমদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "এখন এক নতুন চিন্তাভাবনার জন্ম হয়েছে—মুসলিমরা আর অন্যের জন্য নেতা বানানো বন্ধ করে নিজেরাই নেতা হতে চায়। আমরা আর অন্যের সভার কার্পেট পাততে চাই না; আমরা নিজেদের প্রাপ্য অধিকার ও ভাগ নিয়ে কথা বলতে চাই।"
সমাজবাদী পার্টির সমালোচনা ও আজমগড় প্রশ্ন
জনসভায় সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও দলটির প্রধান অখিলেশ যাদবের সমালোচনা করেন ওয়াইসি। তাঁর অভিযোগ, মুসলিমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমাজবাদী পার্টিকে সমর্থন দিয়ে এলেও শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। আজমগড় জেলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, শিবলি কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পায়নি। এর বিপরীতে তিনি যাদব পরিবারের নির্বাচনী এলাকা সাফাইয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষা ও ক্রীড়াবিষয়ক অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করেন এবং প্রশ্ন করেন, "আপনারা আজমগড়কে আসলে কী দিয়েছেন?"
বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া
ওয়াইসির এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সমাজবাদী পার্টির মুখপাত্র আব্বাস হায়দার বলেন, ওয়াইসি দেশের যেকোনো জায়গায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে স্বাধীন, তবে উত্তর প্রদেশের ভোটাররা রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং রাজ্যের জন্য কী ভালো তা নির্ধারণে সক্ষম। তিনি পিটিআইকে বলেন, "এ ধরনের বক্তব্য নতুন নয়" এবং ওয়াইসির বিরুদ্ধে "বিভাজনমূলক রাজনৈতিক এজেন্ডা" অনুসরণের অভিযোগ করেন।
হায়দার বলেন, "উত্তর প্রদেশের জনগণ এমন নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছে যা সমাজকে একত্রিত করে, এমন শক্তির দিকে নয় যা সাম্প্রদায়িক বা অন্য কোনো ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করে।" তিনি জানান, অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বে সমাজবাদী পার্টি পিডিএ (পিছড়া, দলিত, আল্পসংখ্যক), সামাজিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, সমতা ও সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়গুলো উত্থাপন করে আসছে।
কংগ্রেস মুখপাত্র সুরেন্দ্র রাজপুত পিটিআই ভিডিওকে বলেন, তার দল তাদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে না যারা জওহরলাল নেহেরু ও মহাত্মা গান্ধীর ঐতিহ্যকে সম্মান করে না। তিনি ওয়াইসির বিরুদ্ধে মৌলানা আবুল কালাম আজাদকে সমালোচনা করার অভিযোগও করেন এবং বলেন, এমন নেতাদের দেশপ্রেমিক বলা যায় না। রাজপুত অভিযোগ করেন, ওয়াইসি তার রাজনৈতিক বক্তৃতায় হুমকিমূলক ভাষা ব্যবহার করেন এবং বারবার ইন্ডিয়া ব্লকের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা চান।
পাটনায় আরজেডি-র রাজ্যসভা সাংসদ মনোজ ঝা বলেন, ওয়াইসি তার রাজনৈতিক মতামত রাখতে স্বাধীন, তবে প্রশ্ন হলো প্রতিনিধিত্ব নিয়ে কথা বলার অধিকার অন্য দলগুলোকে কেন অস্বীকার করা হবে। তিনি বলেন, ভারতের রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্য মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ও বিআর আম্বেদকের মতো নেতাদের স্থান দিয়েছে। মনোজ ঝা বলেন,"ভারত কখনোই এক রঙের ছিল না। চিন্তার কোনো একমাত্রিক পথ কখনোই ছিল না। সেটাই ভারতের বহুত্ববাদী চিন্তা।"
দিল্লিতে কংগ্রেস নেতা উদিত রাজ ওয়াইসির বিরুদ্ধে বিজেপির মতো মেরুকরণমূলক বর্ণনা প্রচারের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, "বিজেপি হিন্দুদের ঠিকাদার হয়ে উঠছে, আর তিনি মুসলিমদের ঠিকাদার হয়ে উঠছেন," এবং যুক্তি দেন যে দুটোই সাম্প্রদায়িক শক্তি।
সংগঠন জোরদার ও নির্বাচনী প্রস্তুতি
২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে উত্তরপ্রদেশে এআইএমআইএমের সাংগঠনিক ভিত্তি বিস্তারের ওপরও গুরুত্ব দেন ওয়াইসি। দলের কর্মী-সমর্থকদের তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করা এবং প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সমর্থন বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। রামপুরের অর্থনৈতিক সংকট ও শিক্ষাক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সমান অধিকার ও যথাযথ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানান।
তিনি মুসলিমদের একটি সাধারণ নাম উল্লেখ করে বলেন, "আবদুল নেতা হবে, এমএলএ হবে, এমপি হবে।" ওয়াইসি দাবি করেন, কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির অনেকেই অসন্তুষ্ট যে নেতৃত্ব নেহেরু-গান্ধী ও যাদব পরিবারের সন্তানদের হাতেই রয়ে গেছে। তিনি তাদের শওকত আলী ও মেহতাব জাহানের মতো নেতাদের গ্রহণ করার চ্যালেঞ্জ জানান। তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এর বিরুদ্ধে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টার অভিযোগও করেন।#
পার্সটুডে/এমএআর/১৮