আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামি বিপ্লবের জনপ্রিয়তার নেপথ্যে
https://parstoday.ir/bn/radio/iran-i32461-আঞ্চলিক_ও_আন্তর্জাতিক_পর্যায়ে_ইসলামি_বিপ্লবের_জনপ্রিয়তার_নেপথ্যে
আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামি বিপ্লব এতো গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা পাবার নেপথ্যে কোন রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, এরকম একটা কৌতূহল অনেকের মাঝেই দেখা যায়। সহজ করে বলতে গেলে এর কারণ আসলে মানবীয় প্রকৃতির সঙ্গে বিপ্লবের মিল, বিপ্লবের প্রগতিশীলতা এবং যৌক্তিকতা। বিশ্ব শক্তিগুলো কিংবা তাদের মিত্ররা প্রত্যাশা করুক বা নাই করুক বিপ্লব কিন্তু তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিশ্বের মজলুম জনগোষ্ঠিকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবেই।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৭ ১৩:০৪ Asia/Dhaka
  • আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামি বিপ্লবের জনপ্রিয়তার নেপথ্যে

আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামি বিপ্লব এতো গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা পাবার নেপথ্যে কোন রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, এরকম একটা কৌতূহল অনেকের মাঝেই দেখা যায়। সহজ করে বলতে গেলে এর কারণ আসলে মানবীয় প্রকৃতির সঙ্গে বিপ্লবের মিল, বিপ্লবের প্রগতিশীলতা এবং যৌক্তিকতা। বিশ্ব শক্তিগুলো কিংবা তাদের মিত্ররা প্রত্যাশা করুক বা নাই করুক বিপ্লব কিন্তু তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিশ্বের মজলুম জনগোষ্ঠিকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবেই।

ইসলামি বিপ্লব ইরানের অভ্যন্তরে অকল্পনীয় প্রভাব ফেলেছে। এই বিপ্লব একটি স্বৈরাচারী শাহী জান্তাকে সরিয়ে জনগণকে স্বাধীনতা ও মুক্তির স্বাদ দিয়েছে। আগে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা নির্বাচনের কোনো অধিকার জনগণের ছিল না। বিপ্লবের পর ইরানের সবোর্চ্চ নেতা থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট, সংসদ সদস্যসহ দেশের আরও বিভিন্ন স্তরের নেতা নির্বাচন জনগণই করে থাকে। এক্ষেত্রে জনগণ স্বাধীন। নেতা নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে জনগণই মূলত প্রশাসন পরিচালনায় অংশ নেয়। স্বৈরাচারী শাহ বিরোধী তুমুল আন্দোলনের সময় বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনি (রহ) যেমনটি বলেছিলেন: গণবিরোধী স্বৈরাচারী শাহের পতনই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য নয় বরং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালো হাত ইরানের ওপর থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়াও এই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য।

এ কারণেই স্বৈরাচারী শাহের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বৃটেন, ইসরাইলসহ আরও যেসব দেশ ইরানের সম্পদ দু’হাতে লুটপাট করছিল তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এ কারণেই স্বার্থবাজ এইসব লুটেরাগোষ্ঠি সেই বিপ্লব বিজয়ের সময় থেকে আজ পর্যন্ত ইরানের ইসলামি শাসন ব্যবস্থা ও বিপ্লবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে।

ইরানসহ বিশ্বের জনগণের জন্য ইসলামি বিপ্লবের সবচেয়ে বড় উপহার হলো  ইসলামি শিক্ষার ভিত্তিতে একটি সরকার ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করা। ইমাম খোমেনি (রহ) বলতেন ইসলাম কেবল ইবাদাত বন্দেগি আর নৈতিক শিক্ষার নামই নয় বরং হুকুমাত পরিচালনাসহ সমাজে গণযোগাযোগ স্থাপন করাও ইসলামি শিক্ষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর ভাষায়: দোয়া ও ইবাদাত হচ্ছে ইসলামি শিক্ষার একটি দরজা মাত্র। ইসলামে রাজনীতি আছে, ইসলামে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপার আছে...ইসলাম হলো আধ্যাত্মিকতার আগে রাজনৈতিক দ্বীন বা ধর্মীয় জীবনব্যবস্থা।

আর এভাবেই জনতার রায়ের মধ্য দিয়ে দ্বীন ও আধ্যাত্মিকতার ভিত্তিতে ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পশ্চিমা জগতে যে সময় পুঁজিবাদি শাসনব্যবস্থার ভিত্তিতে লিবারেল সরকার ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল সে সময় এই ইসলামি শাসনব্যবস্থার নতুন আইডিয়ার সঙ্গে বিশ্ববাসীর পরিচয় ঘটে। বিশ্বের বুকে সে সময় একটা ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে লিবারেল ডেমোক্রাসির বাইরে অন্য কোনো শাসন ব্যবস্থা চলতেই পারে না। বিশেষ করে পশ্চিমাদের কাছে লিবারেল ডেমোক্রাসিই ছিল শ্রেষ্ঠ সরকার ব্যবস্থা। ঠিক এরকম একটা পরিস্থিতিতে ইরানে ইসলামের ভিত্তিতে একটি সরকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠার ঘটনা ছিল তাদের জন্য মারাত্মক অশনি সংকেত।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের সুফল সবচেয়ে বেশি পেয়েছে ইরানের জনগণ। কেননা ইরানের বিপ্লবি জনতার মাধ্যমেই ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। তবে ইরানের বাইরেও বিভিন্ন দেশের মানুষ ইরানের বিপ্লবের প্রভাবে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। যে-কোনো আন্দোলনের পূর্ব শর্ত হলো বা পটভূমি হলো গণজাগরণ ও গণসচেতনতা। এ কারণে ইমাম খোমেনি (রহ) সবসময় তাঁর সহচর ও সঙ্গিদের মাধ্যমে ইরানের জনগণকে তাদের ওপর জেঁকে বসে থাকা স্বৈরাচারী শাহের স্বরূপ এবং তার বিদেশি মিত্র ও পৃষ্ঠপোষকদের চিনে রাখা মানে তাদের ব্যাপারে সচেতন বা হুঁশিয়ার থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

ইরানি জনগণের এই সচেতনতা ও হুঁশিয়ারি ব্যাপক দ্রুততার সঙ্গে অন্যান্য দেশের স্বৈরাচারসহ তাদের বিদেশি মিত্রের ব্যাপারেও নিজ নিজ দেশের জনগণকে সচেতন করে তুলেছিল। ইরানি জনগণের এই জাগরণ উপনিবেশসহ বিভিন্ন দেশের স্বৈরাচারি শাসকদের জুলুমের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে সাহস জুগিয়েছে এবং সেই মিছিলের আওয়াজ শুনে আপামর জনতাও ব্যাপকভাবে জেগে ওঠে। এভাবেই বিভিন্ন দেশের জনগণ বিপ্লবের জুলুম অত্যাচার বিরোধী শ্লোগানকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছিল। বিশ্বের বুকে যেসব বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল সেসব বিপ্লবের সঙ্গে ইরানের বিপ্লবের মৌলিক পার্থক্য হলো ইরানের বিপ্লব ছিল সম্পূর্ণরূপে ইসলামি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। যার কারণে এ বিপ্লব ছিল মজলুম জনগণের বিপ্লব।

আরেকটি মৌলিক পার্থক্যের কথা বলা যায়। সেটা হলো আধ্যাত্মিকতা। অন্যান্য বিপ্লবের সঙ্গে ইরানের বিপ্লব ছিল এদিক থেবে একেবারেই আলাদা। ইরানের জনগণের অভ্যুত্থান ছিল আল্লাহর উদ্দেশ্যে। এই বিপ্লবের ভিত্তি ছিল ইসলামের প্রগতিশীল শিক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামি বিপ্লবের মহান রূপকার ও নেতা ইমাম খোমেনি (রহ) ছিলেন একজন আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। আল্লাহর দেওয়া আদেশ ও নিষেধের অনুসারী ছিলেন তিনি। তিনি জনগণকে বলতেন,আল্লাহর আদেশ নিষেধ পালন করার মধ্যেই রয়েছে বিপ্লবের তথা ইহকালীন সাফল্য ও পরকালীন মুক্তি। ইসলামের এই অনন্য সাধারণ আদর্শটা সমকালীন বিশ্বের জন্য ছিল অন্যতম দৃষ্টি আকর্ষণকারী। তার কারণ হলো তৎকালীন বিশ্বে ধর্মহীন বস্তুবাদ ও পুঁজিবাদের ব্যাপক প্রচার ছিল। হঠাৎ করে ইসলামি বিপ্লবের মতো একটি অবস্তুবাদি বিপ্লব বিশ্বদৃষ্টিকে অপলক বিস্ময়ের মাঝে ফেলে দেয়।

এই কারণে ইসলামি বিপ্লব কেবল মুসলিম বিশ্বেই নয় বরং অমুসলিম দেশগুলোতেও সাড়া ফেলেছিল। অমুসলিম দেশের যেসব জনতা পশ্চিমাদের ধর্মহীন পার্থিব মোহের দিকে ঝুঁকতে পারছিল না বা ধর্মহীনতার চর্চাকে মেনে নিতে পারছিল না তারা ব্যাপকভাবে ইরানের বিপ্লবকে সমর্থন দিতে থাকে। কারণ তারা আত্মিক ও আধ্যাত্মিকতার ছায়াতলে প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছিল। আর এভাবেই ইরানের ইসলামি বিপ্লব মুসলমান ও অমুসলমানদের ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। এই বিপ্লব ধর্মহীন পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা থেকে ধর্মপ্রিয় বিশ্ববাসীর মুখ ফিরিয়ে নিতে সহযোগিতা করেছিল। কেননা ইসলামি বিপ্লব পুনরায় মানুষকে দ্বীন ও আধ্যাত্মিকতার দিকে ফিরে আনার আহ্বান জানিয়েছিল। তো ইসলামি বিপ্লব বিশ্বের সকল মজলুম মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলুক, ধর্মহীনতার বেলেল্লাপনা থেকে মানুষকে দ্বীন এবং খোদামুখি করে তুলুক-এই প্রত্যাশা রইলো।

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/৬