ইরানের ইসলামী বিপ্লবের শান্তিকামী এবং অহিংস চরিত্র
https://parstoday.ir/bn/radio/iran-i32681-ইরানের_ইসলামী_বিপ্লবের_শান্তিকামী_এবং_অহিংস_চরিত্র
কোনো একটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের মত নানা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনকেই বলা হয় বিপ্লব। কোনো বিপ্লবে জনগণের সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ, শান্তিপূর্ণ প্রকৃতি ও দীর্ঘকাল টিকে থাকা বা স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করে সেই বিপ্লবের সাফল্য। আর এসব দিক থেকে বিপ্লবগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লব হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বিপ্লব।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৭ ১৪:৪২ Asia/Dhaka
  • ইরানের ইসলামী বিপ্লবের শান্তিকামী এবং অহিংস চরিত্র

কোনো একটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের মত নানা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনকেই বলা হয় বিপ্লব। কোনো বিপ্লবে জনগণের সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ, শান্তিপূর্ণ প্রকৃতি ও দীর্ঘকাল টিকে থাকা বা স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করে সেই বিপ্লবের সাফল্য। আর এসব দিক থেকে বিপ্লবগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লব হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বিপ্লব।

আমরা যদি বিপ্লবগুলোর ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে, বিগত এক হাজার বছরের বড় বড় বিপ্লব বা পরিবর্তনগুলো ঘটানো হয়েছে লাখ লাখ বা কোটি কোটি মানুষকে হত্যা করে। যেমন, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, আলজেরিয়ার বিপ্লব ও কিউবার বিপ্লবের কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়। ফরাসি ও রুশ বিপ্লবে নিহতদের বেশিরভাগই ছিল বেসামরিক ও নিরপরাধ জনগণ।

কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লবে এমনটি ঘটেনি। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী সরকার কেবল হত্যা বা গণহত্যায় জড়িত কয়েক শত ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

বড় ধরনের পরিবর্তন ক্ষমতাসীন সরকার, দল ও নানা গোষ্ঠীর বাধার শিকার হয়ে থাকে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের প্রতি বেশিরভাগ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকায় ১৯৭৯ সালের শুরুর দিকে এ বিপ্লব প্রায় বিনা যুদ্ধেই জয়ী হয়েছে। কিন্তু এর আগে কয়েক দশকে এবং ইসলামী বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয়ের কিছু আগেও ইসলাম-বিরোধী স্বৈরতান্ত্রিক শাহ সরকার জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের কারণে।

ইঙ্গ-মার্কিন ও ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠীর মদদপুষ্ট শাহ সরকার তার গুপ্ত ঘাতক-বাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনী স’ভাকে’র মাধ্যমে বহু বিপ্লবী নাগরিক এবং নেতাকে হত্যা করলেও ইরানের ইসলামী নেতৃবৃন্দ ও জনগণ সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িত হয়নি। কারণ, সশস্ত্র বাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো সংঘাতে লিপ্ত হয়নি। অবশ্য সশস্ত্র বাহিনীর অল্প কিছু সদস্য ও কর্মকর্তা হত্যাযজ্ঞে জড়িত ছিল বলে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর তাদেরকে বিচারের আওতায় এনে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

ইরানের ইসলামী নেতৃবৃন্দ ও তাদের অনুসারী জনগণ গণ-বিক্ষোভের উত্তাল দিনগুলোতে শাহের অনুগত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ভাই বলে আহ্বান করেছে এবং তাদেরকে জনগণের কাতারে শামিল হতে বলেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সৈন্যদের উপহার দিয়েছে ফুল। ফলে তারা প্রতিবাদী ও প্রতিবাদ মিছিলের ওপর গুলি না চালিয়ে নিজেরাই যোগ দিয়েছে শাহ-বিরোধী বিক্ষোভ মিছিলে!  কারণ, পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের অনেক সদস্যও শাহ-বিরোধী বিক্ষোভে যোগ দিতেন।

অথচ স্যামুয়েল হান্টিংটন ও আর্থার বাওয়ের-এর মত চিন্তাবিদরা মনে করেন সহিংসতা বিপ্লবের অপরিহার্য অংশ ও মাধ্যম। অথচ ইরানের ইসলামী বিপ্লবে সহিংসতার মাত্রা ছিল খুবই কম। গত এক হাজার বছরের বিপ্লবগুলোর ইতিহাসে এতো কম সহিংসতা নজিরবিহীন। 

আসলে ইরানের ইসলামী বিপ্লব প্রকৃত ইসলামের শান্তিকামী প্রকৃতির অনুসারী বলেই এ বিপ্লবের সমর্থক বা কর্মীদের মাধ্যমে সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।

শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ইসলামের এক বড় লক্ষ্য। তাই ইসলামী বিপ্লবও এই লক্ষ্যের অনুসারী।  ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা ও সমসাময়িক যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম খোমেনী (র) তার দেশের ওপর আগ্রাসন চালাতে আগ্রহী বিশ্বের সব শক্তিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে, বিশ্বনবী (সা)’র নেতৃত্ব ও বিধানের আলোকে আমরা ইরানে আগ্রাসন চালাতে-আসা সব আগ্রাসীর সঙ্গেই লড়াই করব। কিন্তু এই মহান ইমাম শান্তিপূর্ণ উপায়ে সব সমস্যা সমাধানের নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন।  কারণ, ইসলাম দয়া আর ক্ষমাশীলতার ধর্ম। আর তার যোগ্য নেতৃত্বের কারণেই যথাসম্ভব কম সহিংসতা ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হয়। যা কিছু রক্তপাত ঘটেছে তা জালিম  শাহ সরকার ও তার সহযোগী আগ্রাসী ঘাতকদের কারণেই হয়েছে বা তাদের মোকাবেলা করতে গিয়েই ঘটেছে।

ইমাম খোমেনী (রহ.)

ইরানে শাহ-বিরোধী গণ-বিক্ষোভগুলো শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হত। প্রতিবাদী বা বিক্ষোভকারীদের কেউই কখনও অস্ত্র বহন করতেন না। ইমাম খোমেনী (র) জানতেন প্রতিবাদী জনগণের কেউ অস্ত্র বহন করলে এই অজুহাত দেখিয়েই জালিম শাহ সরকার ও তার বিদেশী প্রভুদের নিয়ন্ত্রিত সেনারা জনগণের ওপর ব্যাপক গণহত্যা চালাবে। 

ইমাম বলেছিলেন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক কর্মকর্তার অপকর্মের কারণে গোটা পুলিশ বা সশস্ত্র বাহিনীকে দোষী ভাবা ঠিক হবে না। সশস্ত্র বাহিনী ইরানি জাতিরই অংশ এবং ইরানি জাতিও সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগী।

শাহ-বিরোধী গণ-বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী জনগণ যখন পুলিশ বা সশস্ত্র বাহিনীর মুখোমুখি হতেন তখন তারা শ্লোগান দিতেন, খোমেনীর বক্তব্য অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের ভাই। উচ্চ-পদস্থ কোনো সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে পুলিশ বা সেনারা যখন গুলি ছুঁড়তো তখন প্রতিবাদীরা শ্লোগান দিয়ে বলতেন: সেনাবাহিনীর ভাইয়েরা কেনো ভাইকে খুন করছেন?–এসব শ্লোগানের ফলে জনগণের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক জোরদার হত এবং তারা তখন গুলি চালানোর নির্দেশ অমান্য করতো। তারা এটাও বুঝতে পারতো যে জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনী ভাই-ভাই আর তাদের অভিন্ন শত্রু হল শাহ ও মার্কিন সরকার। শাহের পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ইসলামী নীতিমালারও গভীর প্রভাব ছিল। ফলে সশস্ত্র বাহিনীর অনেকেই পালিয়ে গিয়ে প্রতিবাদী জনগণের সঙ্গে যোগ দিতেন। ইরানে নিযুক্ত সর্বশেষ মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম সুলিভানও তার এক প্রতিবেদনে বিপ্লব ও জনগণের প্রতি সশস্ত্র বাহিনীর শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টি তুলে ধরে বলেছিলেন, শাহের সেনাদের ওপর ধর্মের প্রভাব থাকায় তাদেরকে দিয়ে জনগণ ও বিপ্লবকে ঠেকানো সম্ভব নয়।#

পার্সটুডে/মু. আ. হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৯