অক্টোবর ১৫, ২০২২ ২১:১৫ Asia/Dhaka

শ্রোতাবন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। "গল্প ও প্রবাদের গল্পের" এই ধারাবাহিকে আজ আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রবাদের গল্প। প্রবাদটি হলো: নেকড়ের ধুনারি

ধুনারি বা ধুনকার মানে তো জানেন নিশ্চয়ই! যারা তুলা ধুনে লেপ-তোষক ইত্যাদি তৈরি করে তাদের বলে ধুনকার। অবশ্য 'ধুনারি'ও বলা হয় কোথাও কোথাও। আজকাল তো একেবারে প্রস্তুত করা লেপ তোষক প্যাকিং করা পাওয়া যায় বাজার ঘাটে। বহু কোম্পানি এখন বাজারে রেডিমেড বা প্রস্তুতকরা লেপ তোষক সরবরাহ করে। আগেকার দিনে এই সুযোগ ছিল না। সে সময় মানুষেরা কিছু পশম, তুলা আর কাপড় কিনে লেপ তোষক যারা বানায় মানে ধুনকারের কাছে দিয়ে আসতো। ধুনকার ওই কাপড় আর পশম-তুলা দিয়ে লেপ তোষক তৈরি করে দিতো।

ইরানে ধুনকারদের 'হাল্লাজ' বলা হয়। হাল্লাজরা তুলা ধুনার জন্য ব্যবহৃত কামান দিয়ে পশম বা তুলাগুলোকে ভালো করে ধুনে নরম করে ফেলতো যাতে কোনোরকম শক্ত গিঁট আর না থাকে। তুলা ধুনা হয়ে গেলে সেগুলোকে কাপড় দিয়ে তৈরি অনেকটা ব্যাগের মতো বস্তার ভেতরে ঢুকাতো এবং সুঁই সূতো দিয়ে সেলাই করতো। এই পেশাকে বাংলায় 'ধুনারি' বলা হয়। আমাদের এই গল্পের ধুনকার মানে হাল্লাজ কাজের উদ্দেশে গেল অন্য এক গ্রামে। সেখানে যাবার পর আমাদের আজকের আসরের গল্পের সূচনা হলো।

হাল্লাজ কাজের উদ্দেশে গ্রামে যাওয়ার জন্য তার পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিলো। কাঠের তৈরি তুলা ধুনার কামানকে বলা হয় ধুনট। সে তার ধুনটও সঙ্গে নিয়ে রওনা হলো। সময়টা ছিল শীতকাল এবং আবহাওয়া ছিল ঠাণ্ডা। রাস্তাঘাট ছিল সাদা বরফে আচ্ছাদিত। ধুনারির কোনো বাহন মানে ঘোড়া-গাধা কিছু ছিল না। সে কারণে পায়ে হেঁটেই রওনা দিতে হলো তাকে। যেতে যেতে তার গ্রাম থেকে বেশ খানিকটা দূরেই চলে গেলে সে। হঠাৎ তার নজরে পড়লো ক্ষুধার্ত একটি নেকড়ে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। হাল্লাজের কাছে তো তেমন কোনো অস্ত্র ছিল না যা দিয়ে সে নেকড়েটাকে প্রতিহত করতে পারে। সুতরাং কীভাবে সে নিজেকে রক্ষা করবে-এ নিয়ে ভাবনায় পড়ে গেল। উপায়ন্তর না দেখে ধুনারি একটি গাছে আত্মরক্ষার কথা ভাবলো যাতে নেকড়ে তার নাগাল না পায়। কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন না হলে যা হয়! যদ্দুর তার দৃষ্টি গেল শুধু বরফ আর বরফই নজরে পড়লো। একটা শুকনো গাছও তার চোখে পড়লো না।

হাল্লাজ বুঝে গেল বাঁচার আর কোনো উপায় নেই, মৃত্যু অবধারিত। মনে মনে বললো: ইস্! যদি একটা শক্ত লাঠি হাতে থাকতো! তাহলে তো নেকড়ের ওপর হামলা চালানো যেত। সঙ্গে সঙ্গে তার নজর গেল তুলা ধুনার ধুনটের ওপর। প্রথম প্রথম ভাবলো ওই ধুনট দিয়ে নেকড়ের ওপর হামলা করবে। ধুনটটাকে তাই এহাত ওহাত করলো কয়েকবার। করে বুঝলো এটা দিয়ে কাজ হবেনা। নেকড়ের মোকাবেলায় এই ধুনট একেবারেই দুর্বল। হামলা করার উপযোগী নয়। অপরদিকে ধুনারি চাচ্ছিলো না তার কাজের সরঞ্জামটিকে নেকড়ের সঙ্গে মোকাবেলা করার কাজে ব্যবহার করে নষ্ট করে ফেলতে। তাই ধুনট দিয়ে নেকড়ের ওপর হামলা করার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে চাইলো। কিন্তু নেকড়ে ততক্ষণে তার কয়েক কদম দূরত্বে চলে এলো।

উপায়ন্তর না দেখে হাল্লাজ তাড়াতাড়ি তার ধুনটকে উপরে তুলে নেকড়ের মাথায় আঘাত করার কথা ভাবলো। ঠিক তখনই ধনুকে তার হাত লেগে অদ্ভুত একটা শব্দ হলো। এরকম অপরিচিত শব্দ শুনে নেকড়ে থমকে গেল এবং কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। হাল্লাজ বুঝে গেল নেকড়ে তার ধুনটের শব্দ শুনে ভয় পেয়েছে। দেরি না করে সে বসে গেল মাটিতে এবং শুরু করে দিলো ধুনট বাজানো। নেকড়ে ভয় পেল এবং আরেকটু পিছিয়ে গেল। হাল্লাজ এবার একটু বিরতি দিলো। কিন্তু নেকড়েটা ছিল ভীষণ ক্ষুধার্ত। তাই ধুনটের শব্দ বন্ধ হয়ে যেতেই আবারও সে হাল্লাজের দিকে এগুতে শুরু করলো। হাল্লাজ আবারও তার ধুনট বাাজতে শুরু করলো। এভাবে কয়েক ঘণ্টা ধরে চললো। যখনই হাল্লাজ ক্লান্ত হয়ে ধুনট বাজানো বন্ধ করে দিতো তখনই নেকড়ে এগিয়ে যেত তার দিকে।

হাল্লাজ যখনই তার ধুনট বাজাতো ওই ধুনটের বাং বাং শব্দ শুনে নেকড়ে দূরে সরে যেত। হাল্লাজের তো আর করার মতো কিছুই ছিল না। তাই এ কাজই সে করলো দীর্ঘ সময় ধরে। এভাবে ধুনটের শব্দ শুনতে শুনতে নেকড়েও ক্লান্ত হয়ে গেল এবং একটা সময় চলে গেল। নেকড়ে চলে যাবার পর হাল্লাজ তার প্রাণ রক্ষায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো। এবার আর দূরের গ্রামের দিকে কাজের উদ্দেশে না গিয়ে উল্টো বাড়ির দিকে রওনা হয়ে গেল। তার স্ত্রী তো অপেক্ষায় ছিল হাল্লাজ অবশ্যই বাজার-ঘাট করে বাসায় ফিরবে। সে হাল্লাজকে বললো: কেমন আছো তুমি! কাজকর্মের কী খবর? কারও কাজ করেছো, নাকি করো নি?

স্ত্রীর কথা শুনে হাল্লাজ বললো: হাল্লাজি মানে ধুনারির কাজ করেছি। অনেক লম্বা সময় ধরেই করেছি। কিন্তু কোনো পারিশ্রমিক নেই নি। খালি হাতে ফিরেছি। স্ত্রী বললো: কেন? কার কাজ করেছো যে তোমাকে পারিশ্রমিক দিলো না? হাল্লাজ বললো: নেকড়ের ধুনারি করেছি। নেকড়ের না তোষক ছিলো, না ছিল লেপ। এরপর পুরো ঘটনা বৌকে খুলে বললো হাল্লাজ। প্রাণে বেঁচে ফিরে আসতে পারায় সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো। এই ঘটনার পর থেকে যখনই কেউ অনেক কাজকর্ম করেও কোনো পারিশ্রমিক না পায় তার সম্পর্কে বলা হয়: নেকড়ের ধুনারি।#

ফার্সি গল্পের রূপান্তর: নাসির মাহমুদ

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/১৫