সুরা তওবার নানা আলোচ্য বিষয়
সুরা তওবায় রয়েছে ১২৯টি আয়াত ও ১৬টি রুকু। বিশ্বনবী (সা.)’র ইন্তেকালের প্রায় এক বছর আগে নাজিল হয়েছিল এই সুরা।
সুরা তওবা কুরআনের নবম সুরা। তবে মূল ধারাক্রম অনুযায়ী এ সুরা কুরআনের ১১৩ নম্বর সুরা। এ সুরার অনেক নাম থাকলেও এতে তওবার প্রসঙ্গটি বার বার এসেছে বলে সুরা তওবা নামেই বেশি পরিচিতি পেয়েছে। মদীনায় অবতীর্ণ এ সুরার অন্যতম প্রধান বা মূল আলোচ্য বিষয় হলো মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য ও তৎপরতা। ইসলামের বিরুদ্ধে সমগ্র জাজিরাতুল আরব উপদ্বীপের কাফির ও মুশরিকদের সর্বশেষ প্রতিরোধও ব্যর্থ হওয়ায় শত্রুদের অনেকেই মুসলমান সেজে সুযোগ বুঝে ইসলামের ক্ষতি করার ভয়াবহ ষড়যন্ত্র করছিল। আর এই প্রেক্ষাপটেই নাজিল হয়েছিল সুরা তওবা।
সুরা তওবার শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হল : হযরত আলী (আ.)-এর ফজিলত, মুশরিকদের অপছন্দ করা, যে মুশরিকরা চুক্তি ভঙ্গ করে না তাদের সঙ্গে চুক্তি বজায় রাখা, তারা আশ্রয় চাইলে তা দেয়া, সব মুমিন একে অপরের ভাই, কাফির নেতাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা, কা’বাঘরের তত্ত্বাবধান করা মুশরিকদের কাজ নয়, হযরত আলী (আ.), আব্বাস ও তালহার বিতর্কের মীমাংসা, হুনায়ন যুদ্ধের ঘটনা, অহংকারের কুফল, মুশরিকরা নাপাক, হযরত মাহদী (আ.) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী এবং যাকাত না দেয়ার নিন্দা। এ ছাড়াও সব সময়ই বারো মাসে বছর হওয়া, নিষিদ্ধ মাস চারটি, তাবুক যুদ্ধের ইতিহাস, হিজরতের সময় রাসূল (সা.)-এর সওর গুহায় অবস্থান, হযরত আলী (আ.) বিশ্বনবী (সা.)’র প্রতিনিধি, খারিজিদের সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী, মুনাফিকদের বর্ণনা, আল্লাহর সন্তুষ্টি সর্বপ্রধান বিষয়, সাহাবীদের ঘটনা, মুনাফিক ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে না এবং আবদুল্লাহ বিন উবাই-এর জানাযার নামায।
সুরা তওবার আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মরুবাসীদের কেউ কট্টর কাফির ও অনেকে ঈমানদার, আওস ও খাযরাজ প্রভৃতি গোত্রের ঘটনা, সম্মানিত মসজিদের ঘটনা, মসজিদে কোবার প্রশংসা, মুমিনদের জীবন আল্লাহ বেহেশতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন, কা’ব বিন মালিক প্রমুখের তওবা, সত্যবাদী কারা, ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনের আদেশ এবং মহানবী (সা.)-এর প্রশংসা।
কয়েকটি হাদিসে বলা হয়েছে যে, বিসমিল্লাহ-তে যেহেতু রহমত ও নিরাপত্তা রয়েছে, আর এ সুরায় কাফিরদের প্রতি ক্রোধ ও অভিসম্পাতের আয়াত রয়েছে তাই এ সুরায় বিসমিল্লাহ নেই। আর তাই এ সুরা পাঠ শুরুর সময় তা বলা উচিত নয়।
অষ্টম হিজরিতে মুসলমানরা মক্কা জয় করেছিলেন। এ বিজয়ের পর বিশ্বনবী (সা.) সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। ফলে মক্কার মুশরিকরা আগের মতই এ শহরে জীবন-যাত্রা অব্যাহত রাখে। অর্থাৎ তারা তখনও কুসংস্কার, কুফর ও শিরকে পরিপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানগুলো অব্যাহত রাখে। তাদের কেউ কেউ তখনও কাবা ঘরের চারদিকে উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করতো। এইসব অনুষ্ঠান ছিল মুসলমানদের জন্য অসহ্য বিষয়। তারা এ বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ অবস্থায় সুরা তওবার প্রথম আয়াত নাজিল হয়।
মহানবী (সা.) এ সুরার প্রথম দশটি আয়াত (প্রথম খলিফা) আবুবকরের হাতে দিয়ে কিছু সংখ্যক লোকসহ পাঠান এবং মক্কায় হাজীদের সমাবেশে তা পাঠ করার নির্দেশ দান করেন। তিনি রওনা হয়ে গেলে আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরীল (আ.) মহানবী (সা.)-এর কাছে অবতীর্ণ হলেন এবং বললেন, ‘এটা হয় আপনি নিজে গিয়ে পাঠ করে শুনান অথবা এমন লোককে পাঠান যিনি আপনার থেকে (তথা আপনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি)।’ তিনি আলী (আ.)-কে এই বলে নিজ উটে সওয়ার করে পাঠালেন যে, ‘তুমি আবু বকরের হাত থেকে আয়াতগুলো নিয়ে নিজেই পাঠ করে শোনাবে।’
প্রথম খলিফা ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন যে, তাঁর ব্যাপারে কোন নেতিবাচক আদেশ এসেছে কি? রাসূল (সা.) বললেন, ‘না, তবে এ আদেশ এসেছে যে, এটা হয় আপনি স্বয়ং গিয়ে পাঠ করে শুনান অথবা এমন লোককে প্রেরণ করুন যিনি আপনার থেকে। তাই আলীকে পাঠিয়েছি।’এরপর হযরত আলী (আ.) জামারায়ে উকবা-এর কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে লোক সকল! আমি রাসূলের প্রেরিত,’ এবং নির্ভয়ে আয়াতগুলো পাঠ করে শোনালেন। (তাফসীরে দুররে মানসুর, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২০৯ দ্রষ্টব্য)। এ ব্যাপারে শিয়া-সুন্নী সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন। আল্লামা ইবনে আবিল হাদীদ শারহে নাহজুল বালাগা গ্রন্থে হযরত আলীর মর্যাদা বর্ণনা করতে এ বিষয়টির উল্লেখ করেছেন। তাফসীরে মায়ালিমুত তানযিল, দুররে মানসুর, মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল, সহীহ তিরমিযি, সহীহ নাসায়ী, দারে কুতনী, বায়হাকী প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থেও হাদিসটি উল্লিখিত হয়েছে।
এবারে শুনুন সুরা তওবার প্রথম তিন আয়াত:
১. (হে মুসলমানরা!) সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।
২. অতঃপর তোমরা মুশরিকরা (নিরাপদে) পরিভ্রমণ কর এ দেশে চার মাসকাল, অর্থাৎ তোমাদের আরও চার মাস সময় দেয়া হলো এদেশ ভ্রমণের জন্য। আর জেনে রেখো, তোমরা (যেখানেই যাও ও যতই ফঁন্দি আটো না কেন) আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদিগকে লাঞ্ছিত করে থাকেন।
৩. আর মহান হজ্বের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা করে দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের চুক্তির দায় থেকে মুক্ত এবং তাঁর রসূলও। অবশ্য যদি তোমরা তওবা কর, তবে তা, তোমাদের জন্যে কল্যাণকর, আর যদি বিমুখ হও, তবে জেনে রেখো, আল্লাহকে তোমরা পরাভূত করতে পারবে না। আর কাফেরদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।
প্রথম আয়াতেই মুশরিকদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মুসলমানদের সঙ্গে তাদের যতো চুক্তি ছিল সবই বাতিল করা হলো। তবে তাদের চার মাসের সময় দেয়া হলো নিরাপদে ভ্রমণের জন্য। কিন্তু এরপর পরিস্থিতি বদলে যাবে বলে তাদের সতর্ক করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল। উল্লেখ্য, এটা একতরফা চুক্তি লঙ্ঘন বা বাতিলের পদক্ষেপ ছিল না। কারণ, কাফির মুশরিকরাই চুক্তি ভাঙ্গার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল (যা এই সুরার ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে)। তাই তারা হঠাৎ করে যাতে মুসলমানদের অপ্রস্তুত অবস্থায় তাদের ওপর আঘাত হানতে না পারে সে জন্যই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু ইসলামের নীতি হলো যতক্ষণ শত্রুরা কোনো দ্বিপাক্ষিক- চুক্তি মেনে চলে এবং হামলার চিন্তা না করে ততক্ষণ মুসলমানদেরকেও ওই চুক্তি মেনে চলতে হবে। #